জুলাই অভ্যুত্থানের অর্জন, বর্জন ও বিসর্জন

প্রকাশ : 05 Aug 2026
জুলাই অভ্যুত্থানের অর্জন, বর্জন ও বিসর্জন

সায়ন্থ সাখাওয়াত:


বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে জুলাই অভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এটি শুধু একটি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ঘটনা নয়; বরং এটি ছিল বৈষম্য, ক্ষমতার অপব্যবহার, জবাবদিহির সংকট এবং নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা থেকে উৎসারিত এক সামাজিক-রাজনৈতিক জাগরণ। এই অভ্যুত্থানের পেছনে কাজ করেছিল এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন, যেখানে নাগরিকের মর্যাদা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত হবে।


দীর্ঘ দেড় দশকের আন্দোলন-সংগ্রাম এবং রাষ্ট্র মেরামতের রূপরেখা তুলে ধরে দেশবাসীর মনে এই স্বপ্ন জাগিয়েছে প্রধানত বিএনপি। গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিএনপির নেতাকর্মীরা শুধু জেল-জুলুমের শিকারই হননি, অনেকে জীবনও দিয়েছেন। বহু নেতাকর্মী গুম ও হত্যার শিকার হয়েছেন। এসব দমন-পীড়নে তৎকালীন সরকার রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করেছে। তাই বিএনপি চেয়েছিল, রাষ্ট্রীয় বাহিনী যেন কোনো সরকার অন্যায়ভাবে ব্যবহার করতে না পারে। একইভাবে বিচার বিভাগেও ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। এমনও বিচারপতি ছিলেন, যিনি নিজেকে শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ বলে মন্তব্য করেছিলেন। এই বাস্তবতা থেকে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবিও বিএনপি জোরালোভাবে তুলে ধরেছিল।


দেশের প্রায় সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে তৎকালীন সরকার নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ারে পরিণত করেছিল। বিএনপি এসব প্রতিষ্ঠানের সংস্কারের দাবি জানায়। সরকারি দল বিরোধী দলকে কোণঠাসা করতে করতে গণতন্ত্রকেই নির্বাসনে পাঠিয়েছিল। তাই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটি কার্যকর ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথাও বিএনপি তুলে ধরে। টেকসই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় সব বিষয়েই দলটি তাদের দাবি ও প্রতিশ্রুতি উপস্থাপন করে। শুধু জনসভায় বক্তৃতা দিয়েই তারা থেমে থাকেনি; ‘ভিশন ২০৩০’ প্রকাশ করেছে, রাষ্ট্র মেরামতের ৩১ দফা দিয়েছে এবং তরুণদের সামনে একটি নতুন রাষ্ট্রচিন্তার স্বপ্ন তুলে ধরেছে। ধীরে ধীরে এসব দাবি জনদাবিতে পরিণত হয়।


এরই চূড়ান্ত রূপ ছিল ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান। প্রায় দেড় হাজার মানুষ প্রাণ দিয়েছেন। অসংখ্য মানুষ চোখ হারিয়েছেন। তারা নিজেদের দৃষ্টি বিসর্জন দিয়ে আমাদের একটি নতুন বাংলাদেশ দেখার সুযোগ করে দিয়েছেন। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় প্রশ্ন উঠেছে—জুলাই অভ্যুত্থানের যে আকাঙ্ক্ষা, যে চেতনা এবং যে ঐক্য মানুষকে রাজপথে এনেছিল, আমরা কি সেই অর্জনগুলো ধরে রাখতে পেরেছি, নাকি ধীরে ধীরে সেগুলো বিসর্জন দিচ্ছি?


জুলাই অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক শক্তিগুলো পেছন থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণই ছিল বিজয়ের প্রধান নিয়ামক। শিক্ষার্থী, তরুণ, শ্রমজীবী মানুষ, পেশাজীবী, নারী-পুরুষ—সবাই একটি অভিন্ন আকাঙ্ক্ষায় একত্রিত হয়েছিলেন। সেই আকাঙ্ক্ষা ছিল এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে ব্যক্তি বা দলের ঊর্ধ্বে থাকবে জনগণের স্বার্থ। কেউ ব্যক্তিগত ক্ষমতা, দলীয় আধিপত্য কিংবা রাজনৈতিক লাভের জন্য আন্দোলনে নামেননি; বরং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশাই ছিল তাদের প্রেরণা।


জুলাই অভ্যুত্থানের পেছনের আকাঙ্ক্ষা ছিল বহুমাত্রিক। প্রথমত, এটি ছিল একটি জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি। দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক অকার্যকারিতা এবং বিচার বিভাগের নিরপেক্ষতা নিয়ে যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল, এই অভ্যুত্থান সেই সংকটের বিরুদ্ধে জনমতের বিস্ফোরণ ঘটায়।


দ্বিতীয়ত, আন্দোলনের অন্যতম ভিত্তি ছিল নাগরিক অধিকারের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ, আইনের সমান প্রয়োগ এবং রাষ্ট্রের প্রতি জনগণের আস্থা পুনর্গঠন ছিল এর অন্যতম লক্ষ্য। তৃতীয়ত, এই অভ্যুত্থান নতুন প্রজন্মের রাজনৈতিক আত্মপ্রকাশের প্রতীক। তরুণ সমাজ প্রমাণ করতে চেয়েছিল যে রাষ্ট্র কেবল রাজনৈতিক দলের একচেটিয়া সম্পত্তি নয়; বরং এটি জনগণের সম্মিলিত মালিকানার প্রতিষ্ঠান। তাই জুলাইয়ের চেতনা ব্যক্তি-নির্ভর নয়; বরং প্রতিষ্ঠানভিত্তিক রাষ্ট্র নির্মাণের দর্শনকে ধারণ করে।


এই অভ্যুত্থানের ফলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইতিবাচক পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্র পরিচালনা, নির্বাচনব্যবস্থা, প্রশাসনিক সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, দুর্নীতি দমন, মানবাধিকার এবং নাগরিক স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে জাতীয় আলোচনা শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিন রাজনীতি থেকে বিমুখ হয়ে পড়া তরুণদের একটি অংশ আবার রাজনীতির প্রতি আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছে। যে বিষয়গুলো দীর্ঘদিন উপেক্ষিত ছিল এবং যেগুলো বিএনপি লিখিতভাবে প্রস্তাব করেছিল, সেগুলো জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে। জনগণ উপলব্ধি করতে শুরু করেছে যে সংগঠিত নাগরিক শক্তি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণে প্রভাব ফেলতে পারে। সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, মানুষ নিজেদের অধিকার সম্পর্কে আগের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন হয়েছে এবং জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার দাবি আরও জোরালো হয়েছে।


তবে এই ইতিবাচক অর্জনের পাশাপাশি একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতাও তৈরি হয়েছে। অভ্যুত্থানের পরপরই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন এবং নানা গোষ্ঠীর মধ্যে জুলাই অভ্যুত্থানের কৃতিত্ব দাবি করার প্রতিযোগিতা শুরু হয়। কেউ এটিকে নিজেদের রাজনৈতিক বিজয় হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে, আবার কেউ নিজেদের আদর্শের একচ্ছত্র সাফল্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। ফলে যে আন্দোলনের শক্তি ছিল সর্বজনীনতা ও ঐক্য, সেটি ধীরে ধীরে বিভক্তির দিকে যেতে শুরু করেছে।


জুলাইয়ের চেতনাকে যখন একটি নির্দিষ্ট দল, মত বা গোষ্ঠীর সম্পত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, তখন সেই চেতনার সর্বজনীনতা ক্ষুণ্ন হয়। আন্দোলনে অংশ নেওয়া অসংখ্য সাধারণ মানুষের অবদান আড়ালে পড়ে যায়। ইতিহাসের মালিকানা কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়; এটি জনগণের। কিন্তু যখন ইতিহাসকে রাজনৈতিক পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন আন্দোলনের প্রকৃত উদ্দেশ্য দুর্বল হয়ে পড়ে। এর ফলে আন্দোলনের পক্ষের শক্তিগুলোর মধ্যেই অবিশ্বাস, প্রতিযোগিতা এবং বিভেদ তৈরি হয়, যা ভবিষ্যতের গণতান্ত্রিক যাত্রার জন্য শুভ লক্ষণ নয়।


আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, জুলাইয়ের চেতনার নামে অনেক সময় এমন কর্মকাণ্ড দেখা যায়, যা মূল আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম শিক্ষা ছিল—রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়; এটি জনগণের। কিন্তু যদি রাষ্ট্রের প্রতিটি সিদ্ধান্ত দলীয় আনুগত্যের মানদণ্ডে বিচার করা হয়, অথবা সংস্কারের পরিবর্তে প্রতিশোধের রাজনীতি প্রাধান্য পায়, তাহলে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হবে না। মানুষ শুধু ক্ষমতার পালাবদল চায়নি; তারা চেয়েছিল রাজনৈতিক সংস্কৃতি, প্রশাসনিক আচরণ এবং শাসনব্যবস্থার মৌলিক পরিবর্তন। সেই পরিবর্তন বাস্তবায়িত না হলে অভ্যুত্থানের অর্জন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে যেতে পারে।


জুলাই অভ্যুত্থানের চেতনাকে রক্ষা করতে হলে প্রথমেই প্রয়োজন এই আন্দোলনকে কোনো একক ব্যক্তি বা দলের সম্পত্তি হিসেবে না দেখা। এটি ছিল জনগণের আন্দোলন; তাই এর কৃতিত্বও জনগণের। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে গণতান্ত্রিক সহযোগিতার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে। তৃতীয়ত, সংস্কার প্রক্রিয়াকে ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক না করে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক করতে হবে, যাতে ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রের মৌলিক নীতিগুলো বদলে না যায়। সর্বোপরি, নতুন প্রজন্মের কাছে জুলাইয়ের শিক্ষা পৌঁছে দিতে হবে।


রাষ্ট্র নির্মাণের মূল শক্তি রাজনৈতিক দল, আর রাজনৈতিক দলের শক্তির উৎস জনগণ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সেই জনগণের অংশগ্রহণেই অর্জিত হয়েছে নতুন বাংলাদেশ গড়ার সুযোগ। নতুন বাংলাদেশ গড়ার পথে যা কিছু অন্তরায়, তা বর্জন করতে হবে। তবে কোনোভাবেই জনআকাঙ্ক্ষাকে বিসর্জন দেওয়া যাবে না। একটি টেকসই গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ নির্মাণই হোক আমাদের প্রধান লক্ষ্য।


থিডা স্ককপল (১৯৭৯) তাঁর States and Social Revolutions গ্রন্থে ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়ার বিপ্লব বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে যদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার কাছে পরাজিত হয়, তবে বিপ্লবের ঘোষিত আদর্শ দুর্বল হয়ে পড়ে।


একইভাবে দারোন আজেমোগলু এবং জেমস এ. রবিনসন তাঁদের Why Nations Fail (২০১২) গ্রন্থে যুক্তি দিয়েছেন, টেকসই রাজনৈতিক পরিবর্তন তখনই সম্ভব, যখন রাষ্ট্র অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে সক্ষম হয়। অন্যথায় ক্ষমতার কেবল বাহ্যিক পরিবর্তন ঘটে, কিন্তু শাসনব্যবস্থার মৌলিক চরিত্র অপরিবর্তিত থেকে যায়।


বাংলাদেশে যদিও প্রচলিত অর্থে বিপ্লব হয়নি; হয়েছে গণঅভ্যুত্থান। কিন্তু সেই গণঅভ্যুত্থানও একটি গণআকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন হলো—সেই আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের পথে বাংলাদেশ কতটা এগোচ্ছে? নাকি থিডা স্ককপল, দারোন আজেমোগলু ও জেমস এ. রবিনসনের সতর্কবার্তার দিকেই হাঁটছে জুলাই-পরবর্তী বাংলাদেশ?


-লেখক: চিকিৎসক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

সম্পর্কিত খবর

;