সম্পত্তিতে সমান অধিকার চায় সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম

প্রকাশ : 24 Aug 2025
সম্পত্তিতে সমান অধিকার চায় সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম

ডেস্ক রিপোর্ট: ২৪ আগস্ট ২০২৫, ৩০ তম নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস। ১৯৯৫ সালের ২৩ আগস্ট ইয়াসমিন ঢাকা থেকে বীরগঞ্জে বাড়ি ফেরার পথে রাতে পুলিশ কর্তৃক ধর্ষিত ও হত্যার শিকার হয়েছিল। পরেরদিন দিনাজপুরে প্রতিবাদ মিছিলে পুলিশ গুলি চালিয়ে হত্যা করে ৭ জন সংগ্রামী মানুষকে। এরপর আন্দোলন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সরকার ও পুলিশ প্রশাসনের কোন অপচেষ্টাই আন্দোলন নস্যাৎ করতে পারেনি। আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালে বিচারে ধর্ষক ও খুনিদের ফাঁসির রায় এবং ২০০৪ সালে তা কার্যকর হয়। ইয়াসমিন ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলন ও বিচারের রায় মানুষের মনে এক প্রতিবাদী চেতনার জন্ম দেয়। এই আন্দোলন এবং হত্যার স্মরণে প্রতিবছর ২৪ আগস্ট পালিত হয় নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস।


নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস (ইয়াসমিন হত্যা দিবস) উপলক্ষে সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম কেন্দ্রীয় কমিটির উদ্যোগে আজ ২৪ আগস্ট ২০২৫, বিকাল ৫ টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশ ও মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সমাবেশে সভাপতিত্ব করেন সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম এর কেন্দ্রীয় প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক শিপ্রা মন্ডল। সমাবেশে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল- বাসদ ঢাকা নগরের ইনচার্জ নিখিল দাস, সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম ঢাকা নগরের দপ্তর সম্পাদক লাবনী আক্তার, মহিলা ফোরাম নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আক্তার, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্ট এর কেন্দ্রীয় সভাপতি মুক্তা বাড়ৈ। সমাবেশ পরিচালনা করেন সমাজতান্ত্রিক মহিলা ফোরাম ঢাকা নগরের সাধারণ সম্পাদক রুখশানা আফরোজ আশা।


সমাবেশে নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের মানুষের মনে এক নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। জনগণের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ শক্তির কাছে ফ্যাসিস্ট শাসক হাসিনা সরকার পরাজিত হয়েছিল; মানুষ ভেবেছিল এখন সকল ক্ষেত্রে গণতন্ত্রের দ্বার উন্মোচিত হবে। জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সারাদেশে নারীদের অংশগ্রহণ ও সম্মুখ সারিতে দাঁড়িয়ে লড়াই ছাড়া গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হওয়া অসম্ভব ছিল। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের পর নারীদেরকে সমস্ত ক্ষেত্রে মাইনাস করার প্রবণতা দেখা গেল, নারীর অধিকার আর নিরাপত্তার চরম অবনতি ঘটল। নারী বিদ্বেষী মনোভাব ছড়িয়ে দেয়া হলো বিভিন্ন সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী থেকে। এ সময়কালে সাইবার নিপীড়ন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৪৪১টি। গত সাত মাসে পারিবারিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৩২২জন আর স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন ১৩৩জন নারী। নারী ও শিশুদের প্রতি সহিংসতার বিরুদ্ধে আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর যে দৃঢ় পদক্ষেপ নেয়ার কথা তা দৃশ্যমান হচ্ছে না। অন্তর্বর্তী সরকারের দিক থেকেও প্রতিকার চেষ্টা বা দায়িত্বশীল আচরণ পরিলক্ষিত হয়নি বলা যায়। বরং কখনো কখনো প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিপীড়কদের পুনর্বাসন দেখা গিয়েছে। নারী বিদ্বেষী মনোভাব এবং কর্মকান্ডের বিরুদ্ধেও এই সরকার উদাসীন।’


নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘এই গণআন্দোলনে সকলের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করেছে নারীরা। অথচ সংসদে নারীর অবস্থানকে পূর্বের মতোই ‘শোপিস’ বা ‘অলঙ্কার’ হিসেবে রেখে দেওয়া হয়েছে। সংরক্ষিত নারী আসনে সরাসরি নির্বাচন নারীর প্রকৃত ক্ষমতায়নকে ত্বরান্বিত করতে পারতো। কিন্তু জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সংরক্ষিত নারী আসনে পূর্বের ন্যায় ক্ষমতাসীন দলের দয়া দাক্ষিণ্য দ্বারা মনোনয়নের পদ্ধতিই বহাল রাখলো। ফলে অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বৈষম্য বিলোপের স্লোগান নারীদের জন্য উপহাসে পরিণত হচ্ছে।’


নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, ‘বাংলাদেশে আইনগত ভাবেই সম্পত্তিতে নারীদের সমঅধিকার নেই। শিক্ষাক্ষেত্রে ছাত্রীদের সংখ্যা বেশি হলেও কর্মক্ষেত্রে সেই সংখ্যা অনেক কম। কর্মজীবি নারীদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং সমকাজে সমমজুরির নিশ্চয়তা নেই। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে বৈষম্যবিরোধী চেতনা তৈরি হয়েছে তার সাথে এই বৈষম্যের বাস্তবতা সাংঘর্ষিক। অবিলম্বে সকল ক্ষেত্রে নারী পুরুষের সমঅধিকার এবং সমকাজে সমমজুরি নিশ্চিতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।’


নেতৃবৃন্দ বলেন, ‘সারাদেশের গণআন্দোলন এবং দিনাজপুরে ৭ জন ভাইয়ের প্রাণের বিনিময়ে ইয়াসমিন হত্যার বিচার হয়েছিল। কিন্তু ইয়াসমিন হত্যার পর কেটে গেছে ৩০ বছর। বিগত এই সময়ে দেশে একদিকে নারী নির্যাতনের সংখ্যা, ধরন ও তীব্রতা বেড়েছে আর অন্যদিকে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সরকারি উদ্যোগ কমে গেছে। দেশের সর্বত্র নারী-শিশু ধর্ষণ, খুনের ঘটনা ঘটে চলেছে, সাথে সাথে সমানতালে চলেছে বিচারহীনতার নজির। অর্থ ও ক্ষমতার বলয়ে থাকলে খুন-ধর্ষণ যেকোন অপরাধ করে পার পেয়ে যায় Ñ এই হচ্ছে বাস্তবতা! নারী নির্যাতন সমাজ বিচ্ছিন্ন কোন বিষয় নয়। যে সমাজে বৈষম্য প্রকট, সে সমাজে নির্যাতন একটি স্বাভাবিক বিষয়ে পরিণত হয়। বৈষম্যহীন সমাজ নির্মাণের সংগ্রাম নারী মুক্তির একমাত্র পথ। পুঁজিবাদী শোষণমূলক ব্যবস্থা বহাল রেখে সমাজে সাম্য প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। পুঁজিবাদী ব্যবস্থা একদিকে নারীকে পণ্যে পরিণত করে অন্যদিকে ভোগবাদী মানসিকতাকে লালন করে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ দিবস এই অন্যায্য সমাজ ব্যবস্থাকে পরিবর্তনের জন্য আমাদের শিক্ষা দিয়ে যায়।’ 


সম্পর্কিত খবর

;