বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কার্যক্রমের পুনরায় শুরু

প্রকাশ : 10 Feb 2026
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কার্যক্রমের পুনরায় শুরু


বিশেষ প্রতিনিধি : বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের উদ্যোগে দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কার্যক্রম নতুন উদ্যমে পুনরায় শুরু হলো। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং গণগ্রন্থাগার অধিদপ্তরের বাস্তবায়নে পরিচালিত ‘দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি (৩য় সংশোধিত) প্রকল্প’-এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন অনুষ্ঠিত হয়েছে।


সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) বিকাল ৩টায় শাহবাগ সংলগ্ন বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর প্রাঙ্গণে আয়োজিত উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী।


অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মফিদুর রহমান, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের সভাপতি ও প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন ও পরিকল্পনা) এ. কে. এম আবদুল্লাহ খান এবং প্রকল্প পরিচালক ও সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্মসচিব (প্রশাসন) মুঃ বিল্লাল হোসেন খান।


জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে সরকারের অঙ্গীকার


উদ্বোধনী বক্তব্যে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী বলেন, “বই মানুষের চিন্তা ও চেতনার দিগন্ত উন্মোচন করে। প্রযুক্তিনির্ভর এই সময়ে বইয়ের সঙ্গে মানুষের সংযোগ অটুট রাখার জন্য ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরির মতো উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রকল্প গ্রাম ও শহরের বৈষম্য কমিয়ে জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”


তিনি আরও বলেন, সরকার সংস্কৃতি ও পাঠাভ্যাস বিকাশে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে এবং বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মতো প্রতিষ্ঠান এ ক্ষেত্রে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।


৭৬টি লাইব্রেরি গাড়িতে সারাদেশে বইসেবা


‘দেশব্যাপী ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি (৩য় সংশোধিত) প্রকল্প’-এর বাস্তবায়ন সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র সারাদেশে মাঠ পর্যায়ে

৭৬টি ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি গাড়ির মাধ্যমে

৬৪টি জেলার ৩৬৮টি উপজেলায়

৩২০০টি নির্ধারিত স্পটে।


সর্বসাধারণের জন্য নিয়মিত লাইব্রেরি সেবা প্রদান করবে। শিক্ষার্থী, তরুণ, শ্রমজীবী মানুষসহ সকল শ্রেণি-পেশার পাঠক এই কার্যক্রমের আওতায় বই পড়ার সুযোগ পাবেন।


বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের ৪৮ বছরের আলোকিত পথচলা


অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, ১৯৭৮ সালে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের নেতৃত্বে যাত্রা শুরু করা বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র গত ৪৮ বছর ধরে ‘আলোকিত মানুষ গড়ার’ লক্ষ্যে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। পাঠাভ্যাস গড়ে তোলা, মানবিক মূল্যবোধ চর্চা এবং চিন্তাশীল নাগরিক তৈরিতে প্রতিষ্ঠানটি দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে অনন্য ভূমিকা পালন করছে।


অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ বলেন, “ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি শুধু বই বিতরণের একটি কর্মসূচি নয়; এটি মানুষের ভেতরে আলো জ্বালানোর একটি আন্দোলন। এই প্রকল্পের মাধ্যমে আমরা প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের কাছেও বিশ্বসাহিত্যের আলো পৌঁছে দিতে চাই।”


কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামানের শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন


ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কার্যক্রম পুনরায় শুরু হওয়ায় শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির মৌলভীবাজার জেলা সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, আরপি নিউজের সম্পাদক ও বিশিষ্ট কলামিস্ট কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান।


এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, “আলোকিত মানুষ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে অধ্যাপক আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যারের হাত ধরে ১৯৭৮ সালে যাত্রা শুরু করেছিল বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। ৪৮ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানটি স্বাধীন, চিন্তাশীল ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ তৈরির নিরলস সাধনায় নিবেদিত।”


তিনি আরও বলেন, “বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র কোনো গৎবাঁধা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; এটি জ্ঞান, মনন ও সৃজনশীলতার এক সজীব অঙ্গন। বই পড়ার অভ্যাস, জ্ঞানচর্চা ও রুচিশীল সংস্কৃতি বিকাশই এই প্রতিষ্ঠানের মূল লক্ষ্য।”


কমরেড সৈয়দ আমিরুজ্জামান আশা প্রকাশ করে বলেন, “এই ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কার্যক্রম জ্ঞানপিপাসু মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণে ‘আলোকিত মানুষ গড়ার’ আন্দোলনকে আরও বেগবান করবে।”


পাঠাভ্যাস পুনর্জাগরণে নতুন প্রত্যাশা


সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘদিন পর নতুন আকারে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কার্যক্রম শুরু হওয়ায় দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পাঠাভ্যাস পুনর্জাগরণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। বইয়ের সহজলভ্যতা বাড়ার পাশাপাশি এটি তরুণ সমাজকে সৃজনশীল ও মানবিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করবে।

#


ভ্রাম্যমাণ আলোর মহাযাত্রা

— সৈয়দ আমিরুজ্জামান

অন্ধকারের বুকে যখন প্রশ্নহীন রাত,

নীরব গ্রাম, স্তব্ধ পাড়া, বইহীন ইতিহাসপাত—

ঠিক তখনই চাকার শব্দে ভাঙে ঘুমের দেয়াল,

ভ্রাম্যমাণ এক গ্রন্থযান আনে জ্ঞানের আলোজ্বাল।


শাহবাগের প্রাঙ্গণ ছুঁয়ে বিকেলের সোনার রোদ,

জাতীয় জাদুঘরের বুকে আজ ইতিহাসের মোড়।

বইয়ের গন্ধে মিশে আছে মানুষের বিশ্বাস,

জ্ঞানই পারে গড়তে জাতির আত্মার প্রকাশ।


রাষ্ট্রের উদ্যোগ, সংস্কৃতির দীপ্ত শপথ,

গণগ্রন্থাগারের হাতে বাস্তবতার পথ।

তৃতীয় সংশোধনে নতুন প্রাণের স্পর্শ,

পুরোনো স্বপ্ন পায় আজ নবযাত্রার হর্ষ।


উপদেষ্টা কণ্ঠে উচ্চারিত প্রত্যয়ের কথা,

সংস্কৃতির শক্তি গড়ে মানুষের ব্যথা।

সচিবের দৃঢ়তায় প্রশাসনের সুর,

পরিকল্পনার মানচিত্রে আলোর ভবিষ্যৎ দূর।


আর এক প্রাজ্ঞ কণ্ঠ, আলোকিত পথিক,

যাঁর হাতে জন্ম নিয়েছিল এক স্বপ্নলোকিক।

আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ—নামটি শুধু নাম নয়,

মানুষ গড়ার সাধনায় এক জীবন্ত মহাকাব্য হয়।


উনিশশো আটাত্তরে যে প্রদীপ জ্বলে উঠেছিল,

চুয়াল্লিশ নয়—আটচল্লিশ বছর পেরিয়ে আজও জ্বলেছিল।

স্বাধীন চিন্তা, মানবিক মন, প্রশ্ন করার সাহস,

বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র শেখায় সেই অনন্ত অভ্যাস।


এটি কোনো গৎবাঁধা শ্রেণিকক্ষ নয়,

এ এক উন্মুক্ত আঙিনা—মননের বিজয়।

যেখানে বই মানে শুধু পৃষ্ঠা নয়,

বই মানে মানুষ হওয়ার নিরন্তর প্রয়াস রয়।


এখন সে স্বপ্ন চড়ে বসেছে চাকার পিঠে,

ছিয়াত্তরটি গ্রন্থযান ছুটে চলে মাটির নিচে-উপরে-দিগন্তসীমায় মিশে।

চৌষট্টি জেলার পথে পথে,

তিনশো আটষট্টি উপজেলায় বই পৌঁছে দিতে।


তিন হাজার দুইশো স্পটে থামে জ্ঞানের গাড়ি,

শিশু, কিশোর, বৃদ্ধ—সবাই পায় বইয়ের ভারি।

কেউ প্রথম পড়ে কবিতা, কেউ ইতিহাসের ধুলো,

কেউ খুঁজে পায় নিজের ভেতর হারানো আলোঝলমলো।


গ্রামের মাঠে, হাটের পাশে, স্কুলের ফাঁকে,

একটি বই বদলে দেয় জীবনের বাঁকে।

বই পড়ে কেউ শেখে প্রশ্ন করতে,

কেউ শেখে মানুষকে মানুষ ভেবে দেখতে।


এই ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি কেবল সেবা নয়,

এ এক আন্দোলন—মানুষ হওয়ার জয়।

এখানে পাঠ মানে আত্মগঠনের সাধনা,

জ্ঞান মানে মুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়া।


রাষ্ট্র ও সমাজ যখন হাতে হাত রাখে,

তখন ভবিষ্যৎ আর অন্ধকারে থাকে না ঢাকে।

সংস্কৃতি, শিক্ষা আর মানবিক বোধ—

এই তিনে গড়ে ওঠে জাতির শক্ত মেরুদণ্ড।


আজ উদ্বোধনের রিবন কাটা শুধু আনুষ্ঠানিক নয়,

এ এক নতুন ভোরের ঘোষণাময়।

চাকার সঙ্গে ঘুরে চলুক প্রশ্ন আর আলো,

প্রতিটি বই হোক মানুষের আত্মার ভালো।


চলুক এই গ্রন্থযান যুগের পর যুগ,

ভাঙুক অজ্ঞানতার সকল কুয়াশামুগ্ধ যুগ।

আলোকিত মানুষ গড়ার যে স্বপ্ন অমলিন,

তা ছড়িয়ে পড়ুক গ্রাম-শহর-নগর-প্রান্তিক ভূমিন।


বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থাকুক পথের প্রহরী,

ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি হোক আলোর চিরসাথী।

বইয়ের এই যাত্রা থামুক না কখনো,

মানুষ হয়ে ওঠার গল্প চলুক অনন্তলোকে অনবরত।


সম্পর্কিত খবর

;