সৈয়দ আমিরুজ্জামান |
ভারতবর্ষের ইতিহাস (১০০০ সন থেকে ১৫২৬ সন) গ্রন্থে রোমিলা থাপার মুখবন্ধে লিখেছেন, 'ভারতীয় ইতিহাসের বিশেষজ্ঞদের জন্য এ বই নয়। ভারতবর্ষ সম্বন্ধে যাদের সাধারণ আগ্রহ ও কৌতুহল আছে, এবং যারা ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের প্রধান ঘটনাবলীর গতিপ্রকৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে ইচ্ছুক, এই বই তাদের জন্যই। প্রথম খণ্ডে ভারতের ইতিহাস শুরু হচ্ছে ইন্দো-আর্য (Indo-Aryan) সভ্যতার বিবরণ দিয়ে। ভারতবর্ষের প্রাগৈতিহাসিক কাল এবং আদিযুগের ইতিহাস নিয়ে এর আগেই একটি মূল্যবান বই পেলিকান সিরিজে বেরিয়ে গেছে—স্টয়ার্ট পিগটের প্রি-হিস্টরিক ইণ্ডিয়া। সুতরাং একই বিষয়ের পুনরাবৃত্তির কোনো প্রয়োজন নেই। বর্তমান খণ্ডে ষোড়শ শতাব্দীতে ইয়োরোপীয়দের আগমন পর্যন্ত এই উপমহাদেশের ইতিহাস বিবৃত হয়েছে। তাই ১৫২৬ খ্রীস্টাব্দকেই শেষ সীমা ধরা হল। অবশ্য উপমহাদেশের ঐতিহাসিক বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে এই তারিখটিকে সীমা ধরা হয়তো যথার্থ হবে না, কারণ তার পূর্ববতী যুগের ঘটনাপ্রবাহের গতিবেগ অব্যাহতভাবে এগিয়ে গেছে পরবতী শতাব্দীগুলিতেও। কিন্তু ১৫২৬ খ্রীস্টাব্দে উত্তর-ভারতে মুঘলদের আগমনের সূচনা এবং তারা (অন্যান্য নানা বিষয়ের সঙ্গে) ভারতে ইয়োরোপের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নির্ধারণে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিল। যারা এই বই-এর পাণ্ডুলিপি পড়ার কষ্ট স্বীকার করে তাদের মতামত জানিয়েছেন তাদের কাছে আমি গভীরভাবে কৃতজ্ঞ। অধ্যাপক এ. এল. ব্যাশাম, শ্রী এ. ঘোষ, শ্রী এস. মাহদি ও আমার পিতৃদেবকে আমি বিশেষভাবে ধন্যবাদ জানাই । মানচিত্রগুলির জন্য আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইণ্ডিয়াকেও আমার ধন্যবাদ।'
প্রখ্যাত ভারতীয় ঐতিহাসিক রোমিলা থাপার – এর জনপ্রিয় ইতিহাসগ্রন্থ ‘এ হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া’ পড়েছি আজ থেকে ৩৭ বছর আগে ১৯৮৬ সালে। ভারতবর্ষ এবং তার ইতিহাস সম্পর্কে পশ্চিমাদের দৃষ্টিভঙ্গীর যে পরিচয় তিনি দিয়েছেন, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।
তিনি বলেছেন যে পশ্চিমারা ভারতকে দেখে এসেছে মহারাজা, সাপুড়ে আর দড়ির খেলার দেশ হিসাবে। তাদের মধ্যে একদল একে বুজরুকির দেশ হিসাবে অবজ্ঞা করেছে, অপর দল নিজ সংস্কৃতির অতি জাগতিকতা থেকে পালাবার জন্য এই অঞ্চলে রহস্যময়তা এবং আধ্যাত্মিকতা খোজার চেষ্টা করেছে। দুই ক্ষেত্রেই ভারতের মানব সমাজের আসল পরিচয় এবং রূপান্তরের কাহিনী আড়ালে থেকে গেছে। রাজ-রাজাদের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ না থেকে তিনি বইটিতে ভারতের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ, তাদের সংস্কৃতি, ধর্ম – ইত্যাদির ইতিহাস লেখার চেষ্টা করেছেন। খ্রীষ্টপূর্ব ১০০০ সালে থেকে ১৫২৬ খ্রীষ্টাব্দ পর্যন্ত সময়কাল বইটির উপজীব্য। ভারতে আর্য সংস্কৃতির প্রভাব দিয়ে শুরু করে হিন্দু ধর্মের বিশ্বাস ও প্রথাগুলোর বিকাশ ও বিবর্তন নিয়ে আলোচনা করেছেন এবং দেখানোর চেষ্টা করেছেন যে, ধর্মগ্রন্থে উল্লিখিত পৌরাণিক কাহিনীগুলোর সাথে ঐতিহাসিক বাস্তবতার মিল খুব বেশী নেই। তাঁর মতে দুটি ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর বিবাদকে অতিরঞ্জিত করে রামায়ন রচিত হয়েছে। বর্ণপ্রথার বিস্তারের আর্থ সামাজিক কারণও তিনি বিশ্লেষণ করেছেন। বর্তমান কালের অনেক ঐতিহাসিক ভারতবর্ষে আর্য আক্রমণের বিষয়ে নতুন মত প্রকাশ করছেন। জানিনা, তার সাথে থাপারের কথাগুলো কিভাবে মিলবে।
বইটিতে লেখিকা ভারতে মুসলমানদের আগমন এবং ভারতীয় বিশ্বাস এবং সংস্কৃতিতে তার প্রভাব নিয়ে একটি বড় অংশ জুড়ে আলোকপাত করেছেন। তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে, গ্রিক, পারস্য বা হুনদের থেকে মুসলমানদের প্রভাবটি ছিল ভিন্ন। ভারতীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি সব সময় চেষ্টা করেছে বাইরের শাসকদের বিশ্বাস ও সংস্কৃতিকে নিজের মধ্যে একটা স্থান দেয়া। তবে এ ক্ষেত্রে সেটি ততোটা সম্ভব হয়নি। তার মতে, এখানে ব্যাপক সংখ্যায় আরব বা তুর্কী আসেনি। ভারতীয় মুসলমানদের অধিকাংশই ছিল ধর্মান্তরিত। তারপরও দুটি বিশ্বাস পৃথক থেকে যায়। তবে মুসলিম শাসনামল হিসাবে পরিচিত সময়টিতে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন স্থানে উভয় ধর্মের মানুষই মিলে মিশে ভাগাভাগি করে থেকেছে বলে তিনি দেখিয়েছেন। ভারতীয় সমাজের প্রভাব এখানকার মুসলমানদের ধর্ম বিশ্বাসেও পড়েছে। তার মতে, সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত উলেমা, যারা ইসলাম ধর্মের ফৌজদারি বিধি বিধান নিয়ে বেশী আগ্রহী ছিল, তাদের সাথে সুফীদের বিরোধই তার প্রমাণ।
ইতিহাসের বিভিন্ন ধাপে ভারতীয় সমাজের অর্থনৈতিক বিকাশ নিয়েও তিনি আলোচনা করেছেন। আলোচনা করেছেন, ভারতের বিভিন্ন এলাকার মানুষের প্রকৃতিগত পার্থক নিয়েও।
চলবে _
-লেখক: মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।
মানিক লাল ঘোষ:মৃত্যু অমোঘ, কিন্তু কিছু মৃত্যু পুরো একটি জনপদকে নাড়িয়ে দিয়ে যায়। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের জামেয়াতুল ফালাহ জাতীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ সাক্ষী হলো তেমনই এক ঐতিহাসিক ও আবেগঘন মুহূর্তের। লাখো ...
মোহাম্মদ বিন কাশেম জুয়েল:রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও জনসেবামূলক খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুশাসন নিশ্চিত করতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ধারাবাহিকভাবে যে কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তারই অংশ হিসেবে বাংলাদে ...
আবু জাফর সূর্য:বাংলাদেশের গণমাধ্যম অঙ্গনে সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া ঘটনাপ্রবাহ আবারও স্পষ্ট করে দিয়েছে—এ দেশে সাংবাদিকতা এখনও এক অনিরাপদ, অনিশ্চিত ও পরস্পরবিরোধী পেশা। বিশেষ করে এখন টিভির বার্তা বিভাগ ...
মানিক লাল ঘোষ:বাংলাদেশে বর্তমানের ভয়াবহ হাম পরিস্থিতি কোনো দৈব দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি একটি ‘মানবসৃষ্ট’ বিপর্যয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক রিপোর্ট স্পষ্টভাবে আঙুল তুলেছে বিগত অন্তর্বর্তীক ...
সব মন্তব্য
No Comments