আফসানা আরেফিন:
আমরা এক অদ্ভুত প্যারাডক্স বা আপাত-বিরোধিতার গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে আছি। পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থা, সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম কিউরেট করা জীবন এবং করপোরেট সংস্কৃতির পারফরম্যান্স রিভিউ সবকিছু মিলে আমাদের মগজে একটা মন্ত্র প্রতিনিয়ত ঢুকিয়ে দিচ্ছে: "তোমাকে নিখুঁত হতে হবে।" ঠিক এই তুমুল কোলাহলের বিপরীতে যখন এক ফালি শান্ত অথচ ধারালো জীবন-দর্শন এসে আমাদের কানের কাছে ফিসফিস করে বলে—এটা কেমন দর্শন? কেমন পরামর্শ যে মানুষকে পারফেক্ট হতে নিষেধ করে... তখন চমকে উঠতে হয়। মনস্তত্ত্বের ভাষায় একে বলা চলে একটি 'কগনিটিভ ডিসোনেন্স' বা জ্ঞানীয় অসঙ্গতি। সমাজ যেখানে পারফেকশনের বেদিতে আমাদের প্রতিদিন বলি দিচ্ছে সেখানে নিখুঁত হতে নিষেধ করা কি এক ধরনের পশ্চাদপসরণ? নাকি জীবনকে তার সমস্ত আদিম ও খাঁটি রূপসহ মেনে নেওয়ার এক বৈপ্লবিক ইশতেহার?
আসলে মানুষকে পারফেক্ট হতে নিষেধ করার এই পরামর্শ কোনো আলস্য বা পরাজয়ের গ্লানি নয়। এটি আসলে মানুষের মনস্তাত্ত্বিক, দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিক বাস্তবতার এমন এক গভীর তলদেশ উন্মোচন করে যা আমাদের তথাকথিত সাফল্যের সংজ্ঞাকে আমূল নাড়িয়ে দেয়। বিজ্ঞানকে যদি আমরা পরম সত্যের একটি মানদণ্ড ধরি তবে দেখব প্রকৃতি নিজেই পারফেকশনের কট্টর বিরোধী। থার্মোডাইনামিকসের দ্বিতীয় সূত্র আমাদের বলে ‘এনট্রপি’ বা মহাজাগতিক বিশৃঙ্খলার কথা। এই মহাবিশ্বের অন্তর্নিহিত স্বভাবই হলো শৃঙ্খলা থেকে বিশৃঙ্খলার দিকে যাওয়া। পরম নিখুঁত বা Perfect বলে মহাবিশ্বে কিছু নেই। জীববিজ্ঞানের সবচেয়ে মৌলিক ভিত্তি—ডিএনএ রেপ্লিকেশন কখনোই শতভাগ নিখুঁত নয়। প্রতি এক কোটি বা একশ কোটি অনুলিপি তৈরির সময় একটি করে 'ভুল' বা মিউটেশন ঘটে। যদি প্রকৃতি এই ভুলটুকু না করত, যদি আদিম এককোষী জীবের ডিএনএ অবিকল নিখুঁতভাবে কপি হতে থাকত তবে আজ পৃথিবীতে কোটি কোটি প্রজাতির বৈচিত্র্য আসত না। ডাইনোসরের বিলুপ্তির পর স্তন্যপায়ী প্রাণীর বিকাশ হতো না, আর আজকের এই হোমো স্যাপিয়েন্স বা মানুষের অস্তিত্বই থাকত না। অতএব বিজ্ঞানের অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে দাঁড়িয়ে এই সত্যটি পরম ও ধ্রুব যে: মানুষের পক্ষে পুরোপুরি পারফেক্ট হওয়া সম্ভব নয়।
যদি পারফেক্ট হওয়া অসম্ভবই হয় তবে মানুষের এত আয়োজন, এত বিনিদ্র রাত জেগে পড়ালেখা, এত ল্যাবরেটরি পরীক্ষা, এত শিল্পসৃষ্টির মানে কী? যদি শেষ পর্যন্ত আমরা অপূর্ণই থেকে যাই তবে এই বেঁচে থাকার সার্থকতা কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে জীবনের গভীরতম লড়াইয়ের দর্শনে। সমগ্র জীবন ব্যাপিয়া চেষ্টা করাটাই জীবনের লড়াই।
বিংশ শতাব্দীর ফরাসি অস্তিত্ববাদী দার্শনিক আলবেয়ার কামু তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ 'দ্য মিথ অব সিসিফাস'-এ গ্রিক পুরাণের এক চরিত্রকে টেনে এনেছিলেন। সিসিফাস দেবতা কর্তৃক অভিশপ্ত। তার কাজ হলো একটি বিশালাকার পাথরখণ্ডকে ঠেলে ঠেলে পাহাড়ের চূড়ায় তোলা। কিন্তু চূড়ায় পৌঁছানোর ঠিক আগের মুহূর্তে পাথরটি তার ভারে আবার গড়িয়ে নিচে পড়ে যায়। সিসিফাসকে আবার নিচে নেমে এসে সেই পাথর ঠেলে ওপরে তুলতে হয়। এই অনন্তকাল ধরে চলা নিষ্ফল শ্রমই সিসিফাসের জীবন। কামু প্রশ্ন তুলেছেন সিসিফাস কি তবে অবদমিত, বিষণ্ণ এক চরিত্র? কামুর উত্তর ছিল—না। কামু লিখেছেন: "One must imagine Sisyphus happy." কারণ, পাথরটি চূড়ায় স্থির হলো কি না সেটা সিসিফাসের জয় নয়। পাথরটিকে ওপরে তোলার জন্য তার মাংসপেশির যে টানটান উত্তেজনা, পাহাড়ের পাথুরে মাটির সাথে তার পায়ের যে লড়াই—সেই অবিরত চেষ্টার মধ্যেই সিসিফাস তার অস্তিত্বের সার্থকতা খুঁজে পায়। মানুষের জীবনও এই সিসিফাসের পাথরের মতো। আমরা জানি আমরা কোনোদিন 'পরম নিখুঁত' নামক পাহাড়ের চূড়ায় আমাদের জীবনের পাথরটিকে স্থির করতে পারব না। কিন্তু প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আবার সেই পাথরটিকে ঠেলে ওপরে তোলার যে আদিম জিদ, এটাই বেঁচে থাকার নিয়ম। লড়াইটাই এখানে পুরস্কার, গন্তব্য নয়।
সমাজবিজ্ঞান ও দর্শনের একটি বড় বিতর্ক হলো—তাহলে আমাদের চারপাশের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাগুলো কেন আমাদের নিখুঁত আচরণ দাবি করে? আমাদের ধর্ম এবং রাষ্ট্রীয় আইন তো আমাদের তাই করতে বলে। কিন্তু আমরা যদি ধর্মগ্রন্থগুলোর সূক্ষ্ম টেক্সট বা আইনের দর্শন বিশ্লেষণ করি তবে দেখব এই প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের অবাস্তব পারফেকশন দাবি করে না, বরং মানুষের 'অপূর্ণতা'কে মেনে নিয়েই তাদের কাঠামো দাঁড় করিয়েছে। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে 'তওবা' বা অনুশোচনা, 'কনফেশন' বা পাপস্বীকার এবং 'প্রায়শ্চিত্ত' এর যে ধারণা রয়েছে তা মূলত মানুষের ভুল করার প্রবণতাকেই স্বীকৃতি দেয়। যদি মানুষ অবিকল পারফেক্ট বা দেবদূতের মতো হতো তবে ধর্মের এই বিধানগুলো অর্থহীন হয়ে যেত। ধর্ম মানুষকে 'ঈশ্বর' হতে বলে না, ধর্ম মানুষকে তার ভেতরের পাশবিক প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করতে বলে। অন্যদিকে রাষ্ট্রীয় আইনের মূল কথা হলো ‘Rehabilitation’ বা সংশোধন, কেবল ‘Retribution’ বা প্রতিশোধ নয়। আইন জানে মানুষ অপরাধ করবে, আইন জানে নাগরিকের আচরণে বিচ্যুতি ঘটবে। সেই বিচ্যুতিকে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে থামানো এবং মানুষকে আবার মূলধারায় ফিরিয়ে আনাই আইনের কাজ। আইন এবং ধর্ম আসলে মানুষের জন্য কোনো ডেড-এন্ড বা শেষ সীমানা তৈরি করে না। এগুলো হলো সমুদ্রের লাইটহাউসের মতো। লাইটহাউস জাহাজকে বলে না যে তোমাকে লাইটহাউসের গায়ে এসে ধাক্কা খেতে হবে, বরং সে আলো দেখিয়ে জাহাজকে তার নিজের মতো করে সাগরের বুকে পথ চলতে সাহায্য করে।
আমাদের সমাজ ‘অ্যাচিভমেন্ট’ বা অর্জনমুখী। আমরা ডিগ্রির সার্টিফিকেট, ব্যাংকের ব্যালেন্স বা কোনো ট্রফিকে সাফল্যের শেষ বিন্দু মনে করি। কিন্তু দর্শন আমাদের শেখায় যে পারফেকশনকে যখনই আমরা একটা স্থাবর লক্ষ্য বা অর্জন হিসেবে দেখব তখনই আমরা একটা মানসিক কারাগার তৈরি করব। এই কারণেই বলা হয়েছে: পারফেকশন চর্চার বিষয়, অর্জনের নয়... জাপানি নান্দনিক দর্শনে একটি শব্দ আছে—'ওয়াবি-সাবি' (Wabi-Sabi)। এর অর্থ হলো—অপূর্ণতা, অনিত্যতা এবং অসম্পূর্ণতার মধ্যে সৌন্দর্য খুঁজে পাওয়া। জাপানিরা যখন কোনো মাটির পাত্র তৈরি করে এবং সেটি যদি কোনো কারণে ভেঙে যায় তারা ভাঙা অংশ ফেলে দেয় না, বরং 'কিনৎসুগি' (Kintsugi) নামক এক পদ্ধতিতে সেই ফাটলগুলোকে সোনা দিয়ে জুড়ে দেয়। পাত্রটি তখন আরও বেশি সুন্দর এবং মূল্যবান হয়ে ওঠে কারণ তার ফাটলগুলো তার ইতিহাস ও লড়াইয়ের গল্প বলে।
পারফেকশনকে যদি অর্জনের ট্রফি বানিয়ে দেওয়া হয় তবে মানুষের ভেতরের রূপান্তর বন্ধ হয়ে যায়। একজন লেখক যদি ভাবেন তিনি তাঁর জীবনের 'নিখুঁততম' উপন্যাসটি লিখে ফেলেছেন তবে তাঁর কলম সেখানেই থমকে যাবে। পারফেকশন হলো আসলে একটি কাল্পনিক দিগন্তরেখা। এর কোনো ভৌগোলিক অস্তিত্ব নেই। একে প্রতিদিনের অভ্যাসে, প্রতিদিনের চিন্তায়, প্রতিদিনের শিল্পে 'চর্চা' করতে হয়। একে ছুঁয়ে ফেলার দাবি করা মানেই অহংকারের জন্ম দেওয়া।
জ্ঞানতত্ত্ব বা Epistemology-র একটি বড় শাখা হলো—মানুষ কীভাবে শেখে? মানুষ মূলত শেখে তার ভুলের মাধ্যমেই। যাকে ইংরেজিতে বলা হয় 'Trial and Error'। আমরা যখন এই সত্যটি ভুলে যাই তখনই আমাদের সমাজ হয়ে ওঠে অসহিষ্ণু এবং নিষ্ঠুর। বর্তমান যুগের ‘ক্যানসেল কালচার’ বা কাউকে তার একটা ভুলের জন্য সমাজচ্যুত করার যে উন্মাদনা তা মূলত এই অবাস্তব পারফেকশনিজমেরই বিষাক্ত ফল। কিন্তু বাস্তবতার কঠিন মাটিতে দাঁড়িয়ে আমাদের স্বীকার করতেই হবে: কারণ আমাদের প্রত্যেকেরই ভুল হয়। ভুল হওয়াটা মানুষের কোনো কাঠামোগত ত্রুটি নয়, বরং ভুল হওয়াটাই মানুষের মানুষ হওয়ার সবচেয়ে বড় লাইসেন্স। ভুল আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে আমরা রক্ত-মাংসের তৈরি জীব, আমরা কোনো যান্ত্রিক কোড নই। ভুল আমাদের অন্যের ভুলের প্রতি দয়ালু হতে শেখায়। যখন আমি জানি যে আমার নিজেরও ভুল হয় তখন আমি অন্যের ভুলের দিকে শাস্তি ছুড়ে দেওয়ার আগে শোধরানোর সুযোগ করে দেওয়ার কথা দুবার ভাবব। এই ভুলই আমাদের বিনয়ী করে, আমাদের ভেতরে সহমর্মিতার বীজ বুনে দেয়।
তাহলে "মানুষকে পারফেক্ট হতে নিষেধ করা" এই দর্শনের শেষ কথাটি কী? এটি কি আমাদের সাধারণ বা গড়পড়তা (Mediocre) হয়ে বেঁচে থাকতে বলে? একদমই না। এই দর্শন আমাদের এক মুক্ত আকাশে ডানা মেলতে শেখায় যেখানে নিখুঁত হওয়ার কোনো অদৃশ্য খাঁচা নেই। এটি আমাদের বলে—তুমি লড়বে, তুমি প্রতিদিন নিজেকে ভাঙবে, আবার গড়বে। তোমার জীবনে ব্যর্থতা আসবে, ফাটল ধরবে কিন্তু সেই ফাটলগুলো লুকিয়ে রাখার জন্য তোমাকে মেকি মুখোশ পরতে হবে না। সেই ফাটলগুলো দিয়েই তোমার ভেতরে আলো প্রবেশ করবে। পারফেকশনের এই মরীচিকার পেছনে অন্ধের মতো না ছুটে আসুন আমরা আমাদের অপূর্ণতাকেই উদযাপন করি। মানুষের ভুল করার এই পবিত্র অধিকারকে রক্ষা করেই তৈরি হোক এক নতুন মানবিক সমাজ। যেখানে লড়াইটাই হবে বেঁচে থাকার একমাত্র ইশতেহার। আর প্রতিটি ভুল হবে নতুন করে পথ চেনার একেকটি উজ্জ্বল বাতিঘর।
-লেখক: কবি, সাহিত্যিক, কলামিস্ট ও এমফিল গবেষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
মুক্তার হোসেন নাহিদ:মায়ামির রাতের আকাশে নীল-সাদার সমারোহ। হার্ড রক স্টেডিয়ামে "আর্জেন্টিনা! আর্জেন্টিনা" প্রতিধ্বনি। দুনিয়াজুড়ে পর্দার সামনে কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠেও একই আওয়াজ। ফিফা র্যাংকিংয়ে ১ম স্থ ...
স্টাফ রিপোর্টার: মানসিক স্বাস্থ্যসেবায় পেশাজীবীদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং গবেষণাভিত্তিক চিকিৎসা পদ্ধতির কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে দিনব্যাপী একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।শুক্রবার ...
বিল্লাল বিন কাশেম:বিশ্বকাপ ফুটবল নিঃসন্দেহে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ক্রীড়া আসর। চার বছর পরপর এই প্রতিযোগিতা ঘিরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের মধ্যে আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও আবেগের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশেও এর ব্যত ...
মানিক লাল ঘোষ:একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে ঘিরে যে তথাকথিত 'আদর্শিক আভিজাত্য' ও পরিবর্তনের স্বপ্ন ফেরি করা হয়েছিল, সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আজ সেই অধ্যায়ের মূল্যায়ন করতে গিয়ে বেরিয়ে আসছে দুর্নীতির ...
সব মন্তব্য
No Comments