ফরিদপুরের সালথায় ন্যায্যমূল্যের সংকট:পানিতে ভাসছে পেয়াজ

প্রকাশ : 29 Jun 2026
ফরিদপুরের সালথায় ন্যায্যমূল্যের সংকট:পানিতে ভাসছে পেয়াজ

অনিক রায়, ফরিদপুর অফিস: দেশের অন্যতম প্রধান পেঁয়াজ উৎপাদনকারী জেলা ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম হতাশা ও ক্ষোভে উৎপাদিত পেঁয়াজ পানিতে ফেলে দিচ্ছেন কৃষকরা। উৎপাদন ব্যয়ের তুলনায় বাজারমূল্য অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় অনেক কৃষক তাদের কষ্টার্জিত ফসল বিক্রি না করে খাল, পুকুর ও ডোবায় ফেলে দিতে বাধ্য হচ্ছেন। মাঠে মাসের পর মাস শ্রম ও বিনিয়োগের পর উৎপাদিত ফসলের এমন পরিণতি কৃষক সমাজের পাশাপাশি স্থানীয় জনসাধারণের মধ্যেও গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।


সম্প্রতি সালথা উপজেলার খোয়াড় গ্রামে কয়েকজন কৃষককে ডোবার পানিতে পেঁয়াজ ফেলে দিতে দেখা যায়। ঘটনাটি এলাকায় ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। কৃষকদের দাবি, বর্তমান বাজারদরে পেঁয়াজ বিক্রি করলে উৎপাদন খরচের সামান্য অংশও উঠে আসছে না। ফলে আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছেন তারা।


স্থানীয় পেঁয়াজ চাষি দাউদ মাতুব্বর জানান, বর্তমানে প্রতি মণ পেঁয়াজ ৮০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অথচ বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক, ডিজেল ও শ্রমিকের মজুরি মিলিয়ে প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা। এছাড়া মৌসুম শেষে দীর্ঘ সময় ধরে ঘরের চাঙ বা মাচায় সংরক্ষণ করতে হয়। সংরক্ষণের কারণে ওজন কমে যাওয়ায় ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায়। তার ভাষায়, "সব মিলিয়ে পেঁয়াজ চাষ এখন লোকসানের আরেক নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।"


একই গ্রামের কৃষক আবুল মাতুব্বর বলেন, কৃষকের এই দুর্দশার মধ্যেও কার্যকর সরকারি উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়। তিনি বলেন, "কৃষক বাঁচলে দেশ বাঁচবে। দেশের অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার বড় অংশ কৃষির ওপর নির্ভরশীল। উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত না হলে কৃষক একসময় চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হবে।"


শুধু সালথা নয়, ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা, বোয়ালমারী, ভাঙ্গা, সদরপুর ও মধুখালী উপজেলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের পেঁয়াজ চাষিরাও একই সংকটে রয়েছেন। চলতি মৌসুমে উৎপাদন ভালো হলেও বাজারমূল্য কম থাকায় অধিকাংশ কৃষককে লোকসান গুনতে হচ্ছে। অনেকেই ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।


সালথার আরেক কৃষক আহম্মদ মাতুব্বর বলেন, এক বিঘা জমিতে পেঁয়াজ আবাদে আগের তুলনায় ব্যয় অনেক বেড়েছে। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, "এখন এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এক কেজি গরুর মাংসও কেনা যায় না। এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামী বছর পেঁয়াজ চাষ করবো কি না, তা নিয়েই ভাবতে হচ্ছে।"


অন্যদিকে, পাইকারি ব্যবসায়ীদের মতে, চলতি মৌসুমে উৎপাদন বৃদ্ধি এবং বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে পেঁয়াজের দাম কমেছে। ফরিদপুর শহরের পাইকারি ব্যবসায়ী শাহজাহান বেপারি বলেন, "এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা থেকে প্রচুর পেঁয়াজ বাজারে আসছে। ফলে বাজারমূল্য কমে গেছে। তবে কৃষকদের স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর বাজার ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত জরুরি।"


কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বৃদ্ধি, পর্যাপ্ত সংরক্ষণ সুবিধার অভাব এবং বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে প্রতিবছরই পেঁয়াজের বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা দেখা দেয়। দাম বৃদ্ধি পেলে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন, আর দাম কমে গেলে ক্ষতির বোঝা বইতে হয় কৃষকদের। আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থার অভাবে কৃষকরা অনেক সময় বাধ্য হয়ে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করেন অথবা নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় তা ফেলে দেন।


এ বিষয়ে সালথা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. রেজাউল করিম জানান, চলতি মৌসুমে উপজেলায় পেঁয়াজ আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১১ হাজার ৫০০ হেক্টর। তবে কৃষকদের ব্যাপক আগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে ১২ হাজার ৫৮৫ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে। এ বছর উপজেলায় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার ১২৫ মেট্রিক টন পেঁয়াজ উৎপাদিত হয়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, প্রতি কেজি পেঁয়াজ উৎপাদনে গড়ে প্রায় ২৪ টাকা ব্যয় হয়, অর্থাৎ প্রতি মণের উৎপাদন খরচ প্রায় ৯৬০ টাকা।


তিনি আরও বলেন, "বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। কৃষকদের নিয়মিত সংরক্ষণ পদ্ধতি বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। তবে বাজারমূল্য নির্ধারণের বিষয়টি কৃষি বিভাগের আওতাধীন নয়।"


সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন বলেন, "পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে কৃষকরা যে কষ্টে আছেন, তা আমরা অবগত আছি। বিষয়টি জাতীয় পর্যায়ের হলেও আমি ফরিদপুর-২ (সালথা-নগরকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ও মাননীয় পররাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে লিখিতভাবে বিষয়টি তুলে ধরব, যাতে কৃষকদের স্বার্থে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া যায়।"


ফরিদপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক (ডিডি) কৃষিবিদ মো. শাহাদুজ্জামান জানান, পেঁয়াজ সংরক্ষণে কৃষকদের সহায়তা দিতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে জেলায় ১ হাজার ৪৩০টি এয়ারফ্লো মেশিন বিতরণ করা হয়েছে। চলতি বছর ইতোমধ্যে ৭০০টি মেশিন বিতরণ করা হয়েছে এবং আরও প্রায় আড়াই হাজার মেশিন সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তার মতে, সংরক্ষণ সুবিধা সম্প্রসারণ করা গেলে কৃষকরা তাৎক্ষণিকভাবে কম দামে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হবেন না।


স্থানীয় কৃষকদের দাবি, পেঁয়াজের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারিভাবে পেঁয়াজ সংগ্রহ, আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ, সহজ শর্তে কৃষিঋণ প্রদান এবং বাজারে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির বিপরীতে ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার কারণে কৃষকরা ধীরে ধীরে পেঁয়াজ চাষ থেকে সরে যেতে পারেন, যা ভবিষ্যতে দেশের কৃষি অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।

সম্পর্কিত খবর

;