কক্সবাজারে ভ্রমণ ছিল ‘নীরব প্রতিবাদ’, উদ্দেশ্য ছিল ‘চিন্তা করাও’: হাসনাত

প্রকাশ : 07 Aug 2025
কক্সবাজারে  ভ্রমণ ছিল ‘নীরব প্রতিবাদ’, উদ্দেশ্য ছিল ‘চিন্তা করাও’: হাসনাত

স্টাফ রিপোর্টার: জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তির দিনে কক্সবাজারে ব্যক্তিগত সফর করায় শীর্ষ পাঁচ নেতাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দিয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। গতকাল বুধবার ৬ আগস্ট কক্সবাজার সফরের বিষয়ে হাসনাতসহ এনসিপির পাঁচ নেতাকে দলের পক্ষ থেকে নোটিশ দিয়ে ওই সফরের কারণ ও পরিপ্রেক্ষিত সম্পর্কে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দলের দুই শীর্ষ নেতার কাছে সশরীর উপস্থিত হয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।


নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই লিখিত জবাব দিয়েছেন দক্ষিণাঞ্চলের মূখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। নোটিশের জবাব পাওয়ার কথা নিশ্চিত করেছেন এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব (দপ্তর)সালেহ উদ্দিন সিফাত।  আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে নিজের ফেসবুক পেজে কারণ দর্শানোর নোটিশের জবাব পোস্ট করেছেন হাসনাত আবদুল্লাহ।


নোটিশের জবাবে এনসিপি নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ লিখেছেন, ‘৪ আগস্ট সন্ধ্যায় জানতে পারি, আমাদের আন্দোলনের আহত এবং নেতৃত্বদানকারী অনেক ভাই-বোনকে এই অনুষ্ঠান থেকে সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। এটা আমার কাছে শুধু রাজনৈতিক নয়, নৈতিক ব্যর্থতা বলেই মনে হয়েছে। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে এই অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। যেখানে ঐক্যের পরিবর্তে বিভাজনকে, শহীদ ও আহতদের পরিবর্তে কিছু মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর কথা এবং মতামতকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে, সেখানে উপস্থিত থাকার কোনো ইচ্ছা বা প্রয়োজন আমি বোধ করিনি। কাজেই এর পরদিন ঢাকার বাইরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। উদ্দেশ্য ছিল, এই গুরুত্বপূর্ণ সময়টিতে পূর্বে গৃহীত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো বোঝার চেষ্টা করা এবং পরবর্তী করণীয় নিয়ে চিন্তা করা। একই সঙ্গে এটি ছিল একটা অসম্পূর্ণ জুলাই ঘোষণাপত্রের প্রতি আমার নীরব প্রতিবাদ।’


হাসনাত লিখেছেন, ৪ আগস্ট রাতে প্রথমে তিনি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। তাঁকে না পেয়ে পরবর্তী সময়ে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে অবহিত করেন যে তিনি তাঁর স্কুলবন্ধুদের সঙ্গে দুই দিনের জন্য ভ্রমণে যাচ্ছেন। যেহেতু নাসীরুদ্দীন সে সময় দলীয় কার্যালয়ে আহ্বায়কের সঙ্গে ছিলেন, তিনি তাঁকে আহ্বায়ককে বিষয়টি জানাতে অনুরোধ করেন। নাসীরুদ্দীন তাঁকে জানান, তিনি তা করবেন। প্রায় ৩০ মিনিট পর নাসীরুদ্দীন তাঁকে নিশ্চিত করেন, তিনি আহ্বায়ককে বিষয়টি জানিয়েছেন এবং আহ্বায়ক এতে সম্মতি দিয়েছেন। পরে তাঁর সঙ্গে নাসীরুদ্দীন, সস্ত্রীক সারজিস আলম ও তাসনিম জারা-খালেদ সাইফুল্লাহ দম্পতি যুক্ত হন।


নোটিশের জবাবে তিনি লিখেছেন, ‘কিছু গণমাধ্যম ও গোয়েন্দা সংস্থার যোগসাজশে আমাদের প্রতিটি পদক্ষেপকে অপরাধপ্রবণ ও সন্দেহজনক হিসেবে উপস্থাপন করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। এমনকি গুজব ছড়ানো হয়েছে যে আমরা পিটার হাসের সঙ্গে গোপন বৈঠকে যাচ্ছি গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র করতে। অথচ তিনি তখন বাংলাদেশেই ছিলেন না।...নতুন বাংলাদেশেও গোয়েন্দা সংস্থা ও কিছু গণমাধ্যমের এই পুরোনো অপরাধপ্রবণতা আমাকে একই সঙ্গে অবাক এবং ক্ষুব্ধ করে।’


এনসিপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারার বিরুদ্ধে পরিচালিত ‘স্লাট শেমিং’কে (নারীকে হেয় করা) কক্সবাজার সফরের ঘটনার ‘সবচেয়ে দুঃখজনক ও নিন্দনীয়’ দিক বলে উল্লেখ করেছেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেছেন, ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস, এই ন্যক্কারজনক আক্রমণের উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যতে রাজনীতিতে অংশ নিতে আগ্রহী নারীদের নিরুৎসাহিত করা। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরও গোয়েন্দা সংস্থা ও কিছু গণমাধ্যমের যোগসাজশে একজন নারীর বিরুদ্ধে এমন হীন আক্রমণ কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।’


হাসনাত আবদুল্লাহ মনে করেন, এনসিপির পক্ষ থেকে এই গোয়েন্দা সংস্থা ও ‘অসৎ গণমাধ্যমের’ বিরুদ্ধে দৃঢ় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত ছিল। তিনি লেখেন, ‘তার পরিবর্তে দল এমন ভাষায় আমাদের বিরুদ্ধে শোকজ (কারণ দর্শানো) প্রকাশ করেছে, যা মিথ্যা অভিযোগ ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বকে উসকে দিয়েছে। যেকোনো রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে শোকজ করতে হয় গঠনতন্ত্র বা আইনের কোনো নির্দিষ্ট ধারা লঙ্ঘনের কারণে। আমাকে দেওয়া শোকজে এমন কিছুর উল্লেখ নেই, কারণ আমি দলের কোনো আইন লঙ্ঘন করিনি।’


‘বিধিবহির্ভূত’ শোকজ প্রদান এবং অতি উৎসাহী হয়ে তা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা কতটুকু রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক হয়েছে, সে বিষয়ে গভীরভাবে ভাবার অনুরোধ করে হাসনাত লিখেছেন, ‘আমি এনসিপির প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ এবং মনে করি যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও গণতান্ত্রিক সহনশীলতার মাধ্যমেই আমাদের দল রাজনৈতিকভাবে আরও পরিণত হবে।’


এর আগে বিকেল সোয়া পাঁচটায় এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীও তার দেয়া জবাবে বক্তব্য স্পষ্ট করেছিলেন এই বলে যে, “ঘুরতে যাওয়া অপরাধ নয়।” কারণ ইতিহাস কেবল মিটিংয়ে নয়, অনেক সময় নির্জন চিন্তার ঘরে বা সাগরের পাড়েও জন্ম নেয়।

সম্পর্কিত খবর

;