হরমুজ প্রণালি খুলে দিচ্ছে তেহরান

ইরানের ওপর মার্কিন তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

প্রকাশ : 24 Jun 2026
ইরানের ওপর মার্কিন তেল নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র ইরানের তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ৬০ দিনের জন্য সাময়িকভাবে প্রত্যাহার করেছে। সোমবার, ২২ জুন ২০২৬ থেকে আগামী ২১ আগস্ট পর্যন্ত এই ছাড় কার্যকর থাকবে। এর ফলে তেহরান এখন আন্তর্জাতিক বাজারে সরাসরি তেল বিক্রি করতে পারবে এবং ডলারে লেনদেনও করতে পারবে।


মার্কিন অর্থ মন্ত্রণালয়ের অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল, ওএফএসি, সোমবার জেনারেল লাইসেন্স এক্স জারি করে ইরানি অপরিশোধিত তেল, পেট্রোলিয়াম ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের উৎপাদন, সরবরাহ ও বিক্রয়ের অনুমতি দেয়। নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আওতায় ব্যাংকিং, বিমা ও জাহাজ চলাচলও রয়েছে। ২০১৮ সালের পর এই প্রথম ইরান উন্মুক্ত বাজারে সরাসরি তেল বিক্রির সুযোগ পেল। 


অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানান, হরমুজ প্রণালিতে অবাধ ও উন্মুক্ত চলাচলের প্রতিশ্রুতি এবং আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা, আইএইএ-এর পরিদর্শকদের ইরানে প্রবেশের অনুমতি দেওয়ায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, ইরান আইএইএ পরিদর্শকদের দেশে ফিরিয়ে আনতে সম্মত হয়েছে, যা স্থায়ী পরমাণু নিরস্ত্রীকরণের প্রথম ধাপ। 


ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ আব্বাস আরাগচি সামাজিক মাধ্যমে লিখেছেন, “তেল ও পেট্রোকেম রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হয়েছে, অবরোধ উঠেছে, কিছু জব্দ সম্পদ ছাড় করা হয়েছে এবং ইরানের জন্য একটি বড় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা চালু হয়েছে”। প্রাথমিক চুক্তি অনুযায়ী প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলারের জব্দ সম্পদ ছাড় হওয়ার কথা রয়েছে। 


যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান গত ১৭ জুন একটি ১৪ দফা সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করে। এর আওতায় ৬০ দিনের মধ্যে স্থায়ী চুক্তির রূপরেখা চূড়ান্ত করার কথা। সুইজারল্যান্ডের বুরগেনস্টক রিসোর্টে পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় প্রথম দফা আলোচনা হয়। আলোচনায় হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে যোগাযোগ চ্যানেল খোলা এবং লেবাননে যুদ্ধ বন্ধের একটি কাঠামোতেও সম্মত হয়েছে দুই পক্ষ। 


তবে কিছু বিষয়ে এখনো মতপার্থক্য রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরান ভবিষ্যতে অনির্দিষ্টকালের জন্য সর্বোচ্চ পর্যায়ের পরমাণু পরিদর্শনে সম্মত হয়েছে। যদিও ইরান জানিয়েছে, তারা পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা শুরু করেনি এবং আইএইএ পরিদর্শক ফেরানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। ইরানের জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত আলী বাহরাইনি বলেন, জব্দ সম্পদ কীভাবে ব্যবহার হবে, সে সিদ্ধান্ত একমাত্র ইরানই নেবে। 


ইরানের দাবি, চূড়ান্ত চুক্তির খসড়ায় হরমুজ প্রণালি তাৎক্ষণিকভাবে সব বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য খুলে দেওয়া, মার্কিন নৌ অবরোধ তুলে নেওয়া, নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞা না দেওয়া, তেল বিক্রির অনুমতি এবং ২৫ বিলিয়ন ডলারের জব্দ সম্পদ ছাড়ের কথা রয়েছে। বিনিময়ে তেহরান পরমাণু অস্ত্র তৈরি বা সংগ্রহ করবে না এবং চূড়ান্ত চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ ও নতুন পরমাণু স্থাপনা সম্প্রসারণ থেকে বিরত থাকবে। 


নিষেধাজ্ঞা শিথিলের খবরে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। সোমবার ব্রেন্ট ক্রুড ৩ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ৭৭.৭ ডলারে নেমে আসে। বিশ্লেষকরা বলছেন, চীন এই পদক্ষেপের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হতে পারে, কারণ তারা এতদিন ছাড়ে ইরানি তেল কিনছিল। 


তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, চার দশকের বেশি সময় ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা গুছিয়ে তুলতে আইনি, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক জটিলতা রয়েছে। অনেক নিষেধাজ্ঞা তুলতে কংগ্রেসের অনুমোদন ও জাতিসংঘের সমন্বয় লাগবে। 


এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাজ্য জানিয়েছে, ইরান পরমাণু কর্মসূচিতে যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ নিলে তারা নিষেধাজ্ঞা তুলতে প্রস্তুত। 


৬০ দিনের এই সময়সীমার মধ্যে স্থায়ী চুক্তি না হলে নিষেধাজ্ঞা আবার কার্যকর হতে পারে। আলোচনা অব্যাহত রাখতে দুই পক্ষ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও পরমাণু ইস্যুতে দুটি ওয়ার্কিং গ্রুপ গঠনে সম্মত হয়েছে। 


সম্পর্কিত খবর

;