সালথায় পাটকল চান কৃষক-শ্রমিকরা, আশা কর্মসংস্থান ও ন্যায্য দাম

প্রকাশ : 15 Jun 2026
সালথায় পাটকল চান কৃষক-শ্রমিকরা, আশা কর্মসংস্থান ও ন্যায্য দাম

অনিক রায়, ফরিদপুর অফিস: দেশের অন্যতম পাট উৎপাদনকারী অঞ্চল ফরিদপুরের সালথা উপজেলায় একটি আধুনিক পাটকল প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো হচ্ছে। স্থানীয় কৃষক, ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী মানুষ, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার নাগরিকরা বলছেন, পাটনির্ভর শিল্পায়ন হলে কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দারিদ্র্য হ্রাস এবং আঞ্চলিক অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে।


স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ফরিদপুর জেলা দীর্ঘদিন ধরেই দেশের গুরুত্বপূর্ণ পাট উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। জেলার আবাদযোগ্য জমির বড় অংশে পাট চাষ হয় এবং প্রতিবছর উৎপাদিত পাটের পরিমাণ দুই লাখ টনেরও বেশি। এর মধ্যে সালথা উপজেলা উচ্চমানের পাট উৎপাদনের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত হলেও এখানে এখনো কোনো বৃহৎ পাটভিত্তিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।


কৃষকদের অভিযোগ, উৎপাদিত পাটের অধিকাংশই কাঁচামাল হিসেবে অন্য জেলায় পাঠাতে হয়। ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি, মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য এবং বাজার অস্থিরতার কারণে তারা প্রায়ই কাঙ্ক্ষিত দাম থেকে বঞ্চিত হন। স্থানীয়ভাবে একটি আধুনিক পাটকল স্থাপিত হলে উৎপাদকরা সরাসরি শিল্পকারখানার সঙ্গে যুক্ত হতে পারবেন, যা তাদের ন্যায্য দাম প্রাপ্তি নিশ্চিত করবে।


বিশেষজ্ঞদের মতে, পাটকল প্রতিষ্ঠা শুধু কৃষি খাতকেই শক্তিশালী করবে না। এর প্রভাব পড়বে পরিবহন, গুদামজাতকরণ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসা, আর্থিক সেবা এবং স্থানীয় বাজার ব্যবস্থার ওপরও। একই সঙ্গে নারী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে অংশগ্রহণ বাড়বে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের নতুন দ্বার খুলে দেবে।


সালথায় শ্রমশক্তির সহজলভ্যতাও শিল্প স্থাপনের পক্ষে বড় সুবিধা। স্থানীয়ভাবে পর্যাপ্ত শ্রমিক পাওয়ায় উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম রাখা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একটি পাটকল গড়ে উঠলে হাজারো নারী-পুরুষের প্রত্যক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।


স্থানীয় যুবক ও সমাজকর্মী মো. মুরাদুর রহমান বলেন, “এ অঞ্চলে বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত বেকার যুবক রয়েছেন। একটি পাটকল হলে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং জীবিকার সন্ধানে বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতাও কমে আসবে।”


খোয়াড় গ্রামের কৃষক মিলু শেখের ভাষ্য, “বছরের পর বছর পাট চাষ করেও আমরা অনেক সময় ন্যায্যমূল্য পাই না। এলাকায় পাটকল হলে সরাসরি বিক্রির সুযোগ বাড়বে এবং লোকসানের ঝুঁকি কমবে।” বেকার যুবক হান্নু মোল্যা বলেন, “শিক্ষাজীবন শেষ করেও স্থায়ী কোনো কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছি না। পাটকল হলে আমাদের মতো অসংখ্য তরুণের জন্য নতুন দিগন্ত খুলবে।”


সালথা বাজার বণিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন বাচ্চু মনে করেন, পাটভিত্তিক শিল্প গড়ে উঠলে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে বহুমাত্রিক ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। পরিবহন, গুদামজাতকরণ ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হবে।


সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আছাদ মাতুব্বরের মতে, “সারা দেশে পাট উৎপাদনের জন্য পরিচিত সালথা। অথচ এখানকার কৃষকদের উৎপাদিত পাট প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য অন্য জেলার ওপর নির্ভর করতে হয়। স্থানীয়ভাবে পাটকল হলে সেই নির্ভরতা কমবে এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে নতুন গতি আসবে।”


সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) দবির উদ্দিন বলেন, “পাট বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী ও সম্ভাবনাময় অর্থকরী ফসল। সালথায় ব্যাপক পরিমাণে পাট উৎপাদিত হয়। এখানে পাটভিত্তিক শিল্প হলে কৃষকরা উপকৃত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বাড়বে।”


ফরিদপুর পাট অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মিজানুর রহমান জানান, “সালথায় উৎপাদিত পাটের মান অত্যন্ত ভালো। একটি আধুনিক পাটকল হলে স্থানীয় পর্যায়ে পাট প্রক্রিয়াজাতকরণ সহজ হবে, কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং পাটের বহুমুখী ব্যবহার সম্প্রসারিত হবে।”


ফরিদপুর জেলা প্রশাসক মাজহারুল ইসলাম বলেন, “সালথা দীর্ঘদিন ধরে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাট উৎপাদন এলাকা হিসেবে পরিচিত। এখানে পাটভিত্তিক শিল্প হলে কৃষক, শ্রমিক ও ব্যবসায়ী—সবাই উপকৃত হবেন। সরকারের সংশ্লিষ্ট পর্যায়ে এ ধরনের কোনো উদ্যোগ এলে জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে।”


স্থানীয়দের বিশ্বাস, ফরিদপুর-২ (সালথা-নগরকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ও পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সক্রিয় উদ্যোগ এবং সরকারের নীতিগত সহায়তা পেলে সালথায় একটি আধুনিক পাটকল প্রতিষ্ঠা আর দূরস্বপ্ন থাকবে না। তাদের প্রত্যাশা, সম্ভাবনাময় এই শিল্পায়ন বাস্তবায়িত হলে কৃষিনির্ভর সালথা এক নতুন অর্থনৈতিক জাগরণের পথে এগিয়ে যাবে।



সম্পর্কিত খবর

;