বাঘাইছড়িতে মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ভাস্কর্য উন্মোচন

প্রকাশ : 10 Nov 2025
বাঘাইছড়িতে মহান নেতা মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ভাস্কর্য উন্মোচন

চট্টগ্রাম অফিস: জুম্ম জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির প্রতিষ্ঠাতা, সাবেক সাংসদ  মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা’র ভাস্কর্য উন্মোচন  এবং  আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রবিবার (৯ নভেম্বর ২০২৫)  সকাল ১০ ঘটিকায়  বাঘাইছড়ির সার্বোতুলি ইউনিয়নের শিজক কলেজ সংলগ্ন কলেজ পাড়ায় ভাস্কর্য উন্মোচন করা হয়। 


উক্ত অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির সহ-সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার, এম এন লারমা মেমোরিয়েল ফাউন্ডেশনের সভাপতি বিজয় কেতন চাকমা, রাঙ্গামাটি পার্বত্য জেলা পরিষদের সদস্য ও কাচালং ডিগ্রী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ দেবপ্রসাদ দেওয়ান, শিজক কলেজের অধ্যক্ষ সুভাষ দত্ত চাকমা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম মহিলা সমিতির কেন্দ্রীয় সহ-সাধারণ সম্পাদক শান্তনা তালুকদার। 


অনুষ্ঠানের শুরুতে এম এন লারমা’র আবক্ষ মূর্তি উন্মোচন করা হয়। ভাস্কর্যটি উন্মোচন করেন এম এন লারমা মেমোরিয়েল ফাউন্ডেশনের সভাপতি বিজয় কেতন চাকমা। একই সময়ে এম এন লারমার আবক্ষ মূর্তি উদ্বোধনের দিনটিকে (৯ নভেম্বর) স্মরণীয় রাখতে এম এন লারমা মেমোরিয়েল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে মহান নেতার স্মরণে ‘মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা স্মারক সংকলন’ নামে একটি প্রকাশনা বের করা হয়।


এম এন লারমার এই ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয় রাঙ্গামাটি জেলার বাঘাইছড়ি উপজেলার সার্বোয়ালী ইউনিয়নের শিজক মুখ (শিজক কলেজ সংলগ্ন) গ্রামে। ভাস্কর্যটি নির্মাণের জন্য কনক বরণ চাকমা ০.২০ একর জায়গা দান করেন। ভাস্কর্যের ধরন: আবক্ষ ভাস্কর্য, উচ্চতা: ৬’.৬”, প্রস্থ: ৪’.০” (প্রায়), গভীরতা: ২’.৬” (প্রায়), মাধ্যম: মার্বেল পাথর, রঙ: সাদা মার্বেল, নকশা: বাস্তবধর্মী (Realistic Style), ব্যস: ৬'.৫", মুখাবয়ব: দৃঢ় ও চিন্তাশীল, যা তাঁর নেতৃত্ব ও মানবিক চেতনা প্রকাশ করে। এম এন লারমার ভাস্কর্য নির্মাণের শিল্পী ছিলেন জিংমুন লিয়ান বম এবং সহকারি শিল্পী ছিলেন অমিত কোচ।


ভাস্কর্য উন্মোচন উপলক্ষ্যে আয়োজিত আলোচনা সভার প্রধান অতিথি হিসেবে ঊষাতন তালুকদার বলেন, যে জাতি ত্যাগ স্বীকার করতে জানে না, সে জাতি বাঁচতে পারে না। যাঁরা মরতে জানে, তাদেরকে সবাই ভয় করে। সব জাতি ভয় করে। এখন সরকার চুক্তি বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া বন্ধ রাখলেও এটা অস্বীকার করতে পারবে না যে, তাঁরা একসময় বাধ্য হয়েছিল আমাদের সঙ্গে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে।


আমি নিজের কানে শুনেছি, জেনারেল মঞ্জু নিজেই স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন "শান্তিবাহিনীরা শৃঙ্খলিত, সুসংগঠিত এবং আমরা রণ-ক্লান্ত। সুতরাং পার্বত্য চট্টগ্রামের সমস্যাটা আমাদের রাজনৈতিকভাবে সমাধান করা ছাড়া বিকল্প উপায় নেই।" এরপর তাঁরা বাধ্য হয় আমাদের সাথে চুক্তিতে উপনীত হতে।


তিনি বলেন, তারা (বাংলাদেশ সরকার) ঈমানদারি মানুষ। ধর্মের ভাষায় তারা বলে ঈমানদার। কিন্তু চুক্তি করে চুক্তি পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন না করে তারা ঈমান রক্ষা করতে পারেনি। তারা ঈমানের সাথে বেঈমানী করেছে। 


তিনি আরো বলেন, জুম্ম জাতীয় জাগরণের অগ্রদূত মহান নেতা এম এন লারমা এবং তাঁর পরিবারটাই ছিলেন শিক্ষিত এবং ঘূণেধরা, ক্ষয়িষ্ণু সামন্তীয় জুম্ম সমাজ ব্যবস্থা থেকে জুম্মদের উত্তরণের জন্য নিজেদের মূল্যবান সময়কে উৎসর্গকারী একটা আদর্শ পরিবার। এছাড়া সামগ্রিকভাবে তাঁদের গোটা পরিবারটাই আগাগোড়া রাজনৈতিক মহান কর্মকাণ্ডে জড়িত।


বিজয় কেতন চাকমা বলেন, এম এন লারমার আদর্শ, তাঁর জ্ঞান, আমাদের অন্তরের অন্তস্থলে ধারণ করে আমরা আমাদের প্রজন্মকে নতুনভাবে পুনর্জন্ম, নতুনভাবে অনুপ্রাণিত, আমরা যতটুকু পেরেছি, বাকিটা তারা কাঁধে নেবে। তিনি আরও বলেন, সাধারণভাবে এই ভাস্কর্যটা দেখলে ইট-কংক্রিট-সিমেন্ট ছাড়া কিছুই নয়। আর যদি একটু গভীরে গিয়ে দেখি, তাহলে আমাদের সামনে লারমার চেহারা ভেসে উঠবে। আর যদি আমরা আরও গভীরে গিয়ে দেখি তাহলে প্রকৃতভাবে লারমার চেহারা, তাঁর জীবন, তাঁর আদর্শ আমাদের সামনে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠবে। 


দেবপ্রসাদ দেওয়ান বলেন, এম এন লারমাকে শুধুমাত্র তিন পার্বত্য জেলার আদিবাসীদের একজন নেতা হিসেবে ভাবলে বা মনে করে থাকলে সেটা দ্বারা আমাদের সংকীর্ণ মানসিকতার প্রকাশ পাবে। শৈশব থেকে আমৃত্যুকালীন সময় পর্যন্ত যদি আমরা এম এন লারমার জীবনকে অধ্যয়ন করি তাহলে দেখতে পাবো, তিনি বাংলাদেশের সকল অবহেলিত, উপেক্ষিত, খেটে-খাওয়া ও মেহনতী মানুষের হয়ে, নারীদের হয়ে কথা বলেছেন। তাই এই ভাস্কর্য সেই সকল মানুষের প্রতীক। তাঁর আদর্শের প্রতীক। তাঁর সংগ্রাম ও চেতনার প্রতীক।


তিনি বলেন, গত ৫ আগস্ট ছাত্র জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে বিগত আওয়ামী সরকারের পতন হয়েছে। বলা হচ্ছে বিগত সরকার পতনের মধ্যে দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন ব্যবস্থারও বিলোপ হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপট পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, এখানে স্রেফ সরকার বদল হয়েছে। তার যে পুরনো ব্যবস্থাপনা, যে শাসন ব্যবস্থা সেটা এখনো আগের মত রয়ে গেছে। রাষ্ট্রীয় যে শাসন-কাঠামো সেটার এখনো সুন্দর বদল ঘটেনি। দেশে এখনো বৈষম্য কমেনি। এখনো আদিবাসী ও দেশের অন্যান্য সংখ্যালঘুদের ঘরপোড়া বন্ধ হয়নি। তাদের উপর রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন বন্ধ হয়নি।


পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির পুলক জ্যোতি চাকমার সভাপতিত্বে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ বাঘাইছড়ি থানা শাখার সভাপতি চিবরন চাকমার সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় স্বাগত বক্তব্য প্রদান করেন মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমার ভাস্কর্য নির্মাণ কমিটির সম্মানিত সদস্য সচিব ত্রিদীপ চাকমা (দীপ)।

সম্পর্কিত খবর

;