দশ বছর ধরে রাস্তার অপেক্ষায় নিঃসঙ্গ এক সেতু

প্রকাশ : 07 Jun 2026
দশ বছর ধরে রাস্তার অপেক্ষায় নিঃসঙ্গ এক সেতু

সুজয় ঘোষ: মাঠের মাঝখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি সেতু। দূর থেকে দেখলে মনে হবে উন্নয়নের ছোঁয়া পৌঁছে গেছে প্রত্যন্ত জনপদে। তবে কাছে যেতেই ধরা পড়ে এক নির্মম বাস্তবতা সেতু আছে, অথচ নেই কোনো সংযোগ সড়ক। ফলে এক দশক ধরে সেতুটি কৃষকের দীর্ঘশ্বাসের স্মারক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।


নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলার মাকড়াইল বিলে কৃষকদের সুবিধার্থে নির্মিত ২৪ ফুট দৈর্ঘ্যের এই সেতুটি আজও কার্যত অচল। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর প্রায় ২০ লাখ টাকা ব্যয়ে এটি নির্মাণ করেছিল। উদ্দেশ্য ছিল বিলাঞ্চলের কৃষকদের উৎপাদিত ফসল সহজে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার পথ তৈরি করা। কিন্তু নির্মাণের ১০ বছর পরও সেই লক্ষ্য অধরাই রয়ে গেছে।


সরেজমিনে দেখা যায়, সেতুর দুই প্রান্তে কোনো সংযোগ সড়ক নেই। একপাশে শুধুই ক্ষেতের সরু আইল, অন্যপাশে একটি রাস্তা থাকলেও সেটি সেতুর চেয়ে কয়েক ফুট নিচু। ফলে সেতু ব্যবহার করে চলাচল করা তো দূরের কথা, মাথায় ফসলের বোঝা নিয়ে ওঠানামা করাও প্রায় অসম্ভব।


যেখানে সেতুটি কৃষকের কষ্ট কমানোর কথা ছিল, সেখানে সেটিই যেন নতুন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফসল ঘরে তুলতে অনেক কৃষককে এখন ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হয়। এতে কৃষকের সময়, শ্রম ও পরিবহন ব্যয় বাড়ছে।


মাকড়াইল গ্রামের কৃষক কবির হোসেন আক্ষেপের সুরে বলেন, আগে তাও আইল দিয়ে চলাচল করা যেত। এখন এই উঁচু ব্রিজে উঠতে গিয়ে কোমর ভেঙে যাওয়ার অবস্থা। ব্রিজ হইছে ঠিকই, কিন্তু আমাগে ভোগান্তি কমেনি, বরং বাড়ছে। রাস্তা না থাকলে এই ব্রিজ দিয়ে আমরা কী করবো?


স্থানীয়দের ভাষায়, এটি এখন ‘রাস্তা ছাড়া সেতু’র এক বাস্তব উদাহরণ। সরকারি অর্থ ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোটি বছরের পর বছর ব্যবহারহীন পড়ে থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে সাধারণ মানুষের মধ্যে।


সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সংযোগ সড়ক নির্মাণের ক্ষেত্রে জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতাই মূল বাধা। যে জায়গা দিয়ে রাস্তা হওয়ার কথা, সেটি ব্যক্তিমালিকানাধীন হওয়ায় জমির মালিকরা জমি দিতে কিংবা মাটি কাটতে আপত্তি জানাচ্ছেন। ফলে দীর্ঘদিন ধরে আটকে আছে প্রকল্পের কাজ।


নড়াইল জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মনোয়ারুল আলম জানান, জমি সংক্রান্ত সমস্যার কারণেই এতদিন সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা সম্ভব হয়নি। তবে বিষয়টি এখন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, আমরা দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছি। আশা করছি, দুটি প্রকল্পের মাধ্যমে খুব শিগগিরই সেখানে সংযোগ সড়ক নির্মাণের কাজ শুরু হবে।


মাকড়াইল বিলের বিস্তীর্ণ ফসলি জমিতে বছরের পর বছর ঘাম ঝরিয়ে চলা কৃষকদের প্রত্যাশা, যে সেতু এতদিন ধরে নিঃসঙ্গ দাঁড়িয়ে আছে, সেটি যেন একটি পথ পায়। 


সম্পর্কিত খবর

;