সাত দিনের শোকযাত্রা তেহরান থেকে মাশহাদ

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান শুরু

প্রকাশ : 04 Jul 2026
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান শুরু

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ও শোকযাত্রা শুরু হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় নিহত ৮৬ বছর বয়সী এই শিয়া নেতার সাত দিনব্যাপী শেষকৃত্য অনুষ্ঠান চলবে তেহরান থেকে মাশহাদ পর্যন্ত। ইরান ও ইরাকের পবিত্র শহরগুলো ঘুরে ৯ জুলাই মাশহাদের ইমাম রেজা মাজারে তাকে সমাহিত করা হবে। 


শোকানুষ্ঠানের সময়সূচি ও রুট

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোর খবর অনুযায়ী, ৩ জুলাই শুক্রবার তেহরানের ইমাম খোমেনি গ্র্যান্ড মোসাল্লায় খামেনির মরদেহ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় রাখা হয়েছে। সেখানে ক্লারিক, সরকারি কর্মকর্তা ও বিদেশি বিশিষ্টজনরা শ্রদ্ধা জানান। তার সঙ্গে একই হামলায় নিহত মেয়ে, জামাতা ও ১৪ মাস বয়সী নাতনির কফিনও রাখা হয়েছে। 


৪ ও ৫ জুলাই তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় সর্বসাধারণের জন্য শোকজ্ঞাপনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। ৬ জুলাই সোমবার রাজধানীর ইমাম হোসেন স্কয়ার থেকে আজাদি স্কয়ার পর্যন্ত ছয় মাইল দীর্ঘ শোক মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। এরপর ৭ জুলাই মঙ্গলবার মরদেহ নেওয়া হবে শিয়া শিক্ষার কেন্দ্র পবিত্র শহর কোমে। 


৮ জুলাই বুধবার খামেনির মরদেহ উড়িয়ে নেওয়া হবে প্রতিবেশী ইরাকের নাজাফে। সেখানে বিমানবন্দরে রাষ্ট্রীয় সংবর্ধনার পর নাজাফ ও কারবালার পবিত্র মাজারে শোকানুষ্ঠান হবে। শিয়া মতাবলম্বীদের কাছে এই দুই শহর অত্যন্ত পবিত্র। এরপর মরদেহ ফিরিয়ে আনা হবে ইরানে। ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার জন্মস্থান মাশহাদের ইমাম রেজা মাজারে তাকে দাফন করা হবে। 


আন্তর্জাতিক উপস্থিতি ও নিরাপত্তা

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, ১০০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধি এই শোকানুষ্ঠানে অংশ নেবেন। রাশিয়ার নিরাপত্তা পরিষদের উপপ্রধান দিমিত্রি মেদভেদেভ, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ, জর্জিয়ার প্রেসিডেন্ট মিখাইল কাভেলাশভিলি উপস্থিত থাকবেন। চীন, তুরস্ক, ভারত, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান থেকেও উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল এসেছে। তবে পশ্চিমা কোনো দেশকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। 


প্রায় ১৪,০০০ সাংবাদিক, যার মধ্যে ৯০০ জন বিদেশি, এই অনুষ্ঠান কভার করছেন। তেহরানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আকাশপথে সাময়িক নিষেধাজ্ঞা জারি হয়েছে এবং শহরের প্রবেশ-বাহির পথ বন্ধ রাখা হয়েছে। হোটেলগুলো ৫০% ছাড় দিচ্ছে, মসজিদ, স্কুল ও স্পোর্টস হলগুলো শোকাহত মানুষের থাকার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। 


প্রেক্ষাপট ও প্রতিক্রিয়া

৩৭ বছর ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করা খামেনি গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানের বাসভবনে মার্কিন-ইসরায়েলি হামলায় নিহত হন। তার মৃত্যু চার মাসব্যাপী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-ইরান যুদ্ধের সূচনা করে। তার ছেলে মোজতাবা খামেনি নতুন সর্বোচ্চ নেতা হলেও হামলায় আহত হওয়ার পর থেকে তাকে প্রকাশ্যে দেখা যায়নি। 


ইরানের কর্মকর্তারা দাবি করছেন, শোকানুষ্ঠানে ৪০ লাখ থেকে ১.৫ কোটি মানুষ অংশ নিতে পারে, যা আধুনিক ইতিহাসের বৃহত্তম অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া হতে পারে। সিএনএন জানিয়েছে, এই আয়োজনের মাধ্যমে ইরান বিশ্বকে ‘সীমাহীন বিপ্লবী শক্তি’ হিসেবে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে চায়। কারণ খামেনির ধর্মীয় অনুসারী ইরাক, পাকিস্তান, বাহরাইনসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে আছে। 


শুক্রবার তেহরানে কফিন উন্মোচনের সময় হাজার হাজার সমর্থক কান্নায় ভেঙে পড়েন। অনেকেই মাথা চাপড়ে শোকগীতি গাইছিলেন। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন সারাদিন খামেনির জীবনভিত্তিক প্রামাণ্যচিত্র প্রচার করছে। শহরজুড়ে কালো ব্যানারে তার ছবি টাঙানো হয়েছে। 


বিশ্লেষকরা বলছেন, এই অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া ইরানের জন্য একটি সংকটময় মুহূর্ত। একদিকে যুদ্ধে টিকে থাকার পর শাসকগোষ্ঠী শক্তি প্রদর্শন করছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণভাবে সরকারের জনসমর্থন তলানিতে। 


সম্পর্কিত খবর

;