বরিশালে সিজারের পরেই মৃত্যু হয় মাইশার, ভুল চিকিৎসার অভিযোগ

প্রকাশ : 25 Sep 2026
বরিশালে সিজারের পরেই মৃত্যু হয় মাইশার, ভুল চিকিৎসার অভিযোগ

রাহাদ সুমন,বরিশাল ব্যুরো : সিজারিয়ান অপারেশনের পর পরই অপারেশন থিয়েটারে নাজিয়া রহমান মাইশা (৩০) নামের এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ করেছেন মৃতের স্বজনরা। ঘটনাটি ঘটেছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বরিশাল নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে।


নগরীর কালিজিরা এলাকার বাসিন্দা মৃত নাজিয়া রহমান মাইশা বরিশালের উদীয়মান উদ্যোক্তা হিসেবে সবার কাছে ব্যাপক পরিচিত মুখ। তিনি বরিশাল গণপূর্ত বিভাগের সাবেক কর্মচারী প্রয়াত মো. নাজমুর রহমান বাদলের কন্যা। 

 

বরিশালের বেসরকারি রাহাত আনোয়ার হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দাবি সিজারিয়ান অস্ত্রোপাচারের পর বমি করায় শ্বাসনালিতে খাবার আটকে শ্বাসরোধ হয়ে নাজিয়া রহমান মাইশার মৃত্যু হয়েছে। মৃতের স্বজনরা জানিয়েছেন, বানারীপাড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের রেজিস্ট্রার ডা. তহুরা আক্তারের তত্ত্বাবধানে অন্তঃসত্ত্বা হওয়ার পর থেকে চিকিৎসা নিচ্ছিলেন মাইশা। পরে তার পরামর্শে সিজারিয়ান অস্ত্রোপাচারের জন্য রাহাত আনোয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বৃহস্পতিবার সিজারিয়ান অস্ত্রোপাচারের মাধ্যমে তার (মাইশা) একটি কন্যা সন্তানের জন্ম হয়। এরপরই অস্ত্রোপাচারের কক্ষে মাইশার শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়।


মৃত মাইশার স্বজন সাজ্জাদ হোসেন নয়ন বলেন, ঘটনার সময় আমি হাসপাতালে ছিলাম। মাইশা পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল। সে পায়ে হেঁটে অপারেশন থিয়েটারে গেছে। অপারেশনের শেষ মুহুর্তে আমার সামনেই তার মৃত্যু হয়েছে। অভিযোগ করে তিনি বলেন, অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকের অবহেলার কারণে মাইশার মৃত্যু হয়েছে। তার ভাষ্য, অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পরপরই মাইশা অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং বারবার বমি করতে থাকেন। শরীরে দেওয়া স্যালাইন ‘ওভারফ্লো’ করে আস্তে আস্তে ফুসফুসে কফ জমে যাওয়ার ফলে অস্ত্রোপাচার শেষ হওয়ার সাথে সাথেই মাইশার মৃত্যু হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।


নয়ন আরও অভিযোগ করেন, অস্ত্রোপাচারের সময় অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক সার্বক্ষণিক রোগীর পাশে ছিলেন না। তিনি স্পাইনালে অ্যানেসথেসিয়া দেওয়ার পর অন্য রোগীর কাছে চলে যান। রোগীর অবস্থার অবনতি হলেও তিনি খোঁজ নেননি। তার অভিযোগ, অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসকের পাশাপাশি ডা. তহুরা আক্তারের অসাবধানতার কারণেই মাইশার মৃত্যু হয়েছে।


সাজ্জাদ হোসেন নয়ন বলেন, মাইশার অস্ত্রোপাচার চলার সময় পাশের আরও দুটি অপারেশন থিয়েটারে অস্ত্রোপাচার চলছিল। হাসপাতালের চারটি অপারেশন থিয়েটারের জন্য ডা. সোহেল মিয়া একাই ছিলেন । মাইশার মৃত্যুর পর অবহেলা ও দোষ আড়াল করতে তাকে দ্রুত শের-ই বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে পাঠানো হয়। সেখানে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তার (মাইশা) মৃত্যু হয়েছে।


নয়ন আরও বলেন, মাইশার মৃতদেহ আমি নিজে হাসপাতালে নিয়ে আসছি। নিয়ম অনুযায়ী মুমুর্ষু কোনো রোগীকে স্থানান্তর করা হলে সাথে অ্যানেসথেসিয়া চিকিৎসক থাকেন। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে সেটা হয়নি। এমনকি হাসপাতালে মৃত্যু নিশ্চিত হয়ে ডা. সোহেল মিয়াকে ফোন করে জানালে তিনি বলেন, আমার অন্য ওটি চলে, এখন আসতে পারবো না।


মাইশার আরেক স্বজন শামসুন্নাহার বেগম বলেন, অপারেশন থিয়েটার থেকে শেষদিকে হঠাৎ করে আমাদের এসে বলা হয়, আপনারা আল্লাহর কাছে দোয়া করতে থাকেন, পেশেন্ট কার্ডিয়াক অ্যাটাক করেছে। আমরা কোনো কিছু বুঝে উঠতে পারিনি। মাইশাকে অস্ত্রোপাচারের পর পোস্টঅপারেটিভ ইউনিটে রাখা হয়েছিল।


মাইশার স্বামী হাফিজ আহমেদ বলেন, চিকিৎসা ব্যবস্থা নিয়ে আসলে কিছুই বলার নেই। যেই মানুষটা সুস্থ স্বাভাবিকভাবে অপারেশন থিয়েটারে ঢুকলো, সেই মানুষটা সেখান থেকে কীভাবে মৃত হয়ে বের হয়। অবহেলায় এমন মৃত্যু মেনে নেয়ার মতো নয়। দুপুর আড়াইটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত অপারেশন থিয়েটারে আমার সন্তান জন্মের পর চিকিৎসকরা কী করেছে, সেটা জানি না।


অভিযোগের বিষয়ে রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালের ম্যানেজার সাহিল আহমেদ সাকিব বলেন, রোগীর মৃত্যুর জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা চিকিৎসকেরা দায়ী নন। তার দাবি, শ্বাসনালিতে খাবার আটকে রোগীর মৃত্যু হয়েছে। সাকিব আরও জানান, বেলা ১২টার দিকে মাইশাকে রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে চিকিৎসকরা স্বাভাবিক প্রসবের চেষ্টা করেন। পরে রোগীর স্বজনরা সিজারিয়ান অস্ত্রোপাচারের অনুরোধ করেন। এ কারণে বিকেল তিনটার দিকে তাকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয় এবং সাড়ে তিনটার দিকে ডা. তহুরা আক্তার অস্ত্রোপাচার শুরু করেন।


হাসপাতাল ব্যবস্থাপকের দাবি, অস্ত্রোপাচার সুন্দরভাবেই সম্পন্ন হয়। মা ও সন্তান দুজনই ভালো ছিলেন। মাইশাকে পোস্টঅপারেটিভ ইউনিটে নেওয়ার পর তিনি সদ্য ভূমিষ্ঠ কন্যার মুখও দেখেন। সেখানে তার স্বজনরাও ছিলেন। এরপর হঠাৎ তার রক্তচাপ কমতে শুরু করে। একপর্যায়ে তিনি তিনবার বমি করেন। তাৎক্ষণিকভাবে সাকার দিয়ে মুখের ভেতর থেকে বমি পরিস্কার করা হয়। কিন্তু অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তাকে দ্রুত শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়।


সাকিব বলেন, আইসিইউ থেকে আমরা জানতে পেরেছি, বমি করার সময় শ্বাসনালিতে খাবার আটকে গিয়ে শ্বাসরোধ হয়ে নাজিয়ার মৃত্যু হয়েছে। তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের এ বক্তব্য ভিত্তিহীন দাবি করে মৃতের স্বজন নয়ন বলেন, অপারেশনের সময় আমি ছাড়াও মাইশার একজন চাচি, যিনি অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র নার্স, তিনিও ছিলেন। এখন নিজেরা রক্ষা পাওয়ার জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এমন উল্টাপাল্টা কথা বলছে।


অপরদিকে ঘটনার পর ডা. তহুরা আক্তার ও ডা. সোহেল মিয়া আত্মগোপনে রয়েছেন বলে অভিযোগ করেন মৃতের স্বজনরা। তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোনও বন্ধ রয়েছে। তবে বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি আল মামুন উল ইসলাম বলেন, এমন কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে আসেনি। এ ঘটনায় লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

সম্পর্কিত খবর

;