বিশ্বকাপের উল্লাস বনাম ঈমানের মর্যাদা: বিনোদন ও বিশ্বাসের সীমারেখা

প্রকাশ : 03 Jul 2026
বিশ্বকাপের উল্লাস বনাম ঈমানের মর্যাদা: বিনোদন ও বিশ্বাসের সীমারেখা

বিল্লাল বিন কাশেম:


বিশ্বকাপ ফুটবল নিঃসন্দেহে পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ ক্রীড়া আসর। চার বছর পরপর এই প্রতিযোগিতা ঘিরে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের মধ্যে আনন্দ, উচ্ছ্বাস ও আবেগের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশেও এর ব্যতিক্রম ঘটে না। দেশের মানুষ নিজ নিজ পছন্দের দলের পতাকা টাঙায়, জার্সি পরে, বন্ধুদের সঙ্গে খেলা দেখে এবং বিজয়-পরাজয়ের আবেগ ভাগাভাগি করে। এই আনন্দ মানুষের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক জীবনেরই একটি অংশ।


কিন্তু যখন এই আনন্দ-উচ্ছ্বাস এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যায়, যেখানে ধর্মীয় প্রতীক, ঈমানের পরিচয় কিংবা পবিত্র বিশ্বাসকে বিনোদনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দাঁড় করানো হয়, তখন বিষয়টি আর শুধুমাত্র খেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। তখন এটি বিবেক, মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় অনুভূতির প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।


আমার কাছে বিশ্বকাপ ফুটবল একটি বিনোদন। এর বেশি কিছু নয়। কিন্তু কলেমা তাইয়্যিবা শুধু একটি বাক্য নয়; এটি আমার ঈমানের ঘোষণা, আমার ধর্মীয় বিশ্বাসের ভিত্তি এবং আমার মুসলিম পরিচয়ের সর্বোচ্চ প্রতীক। "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ" এমন একটি কালেমা, যার ওপর একজন মুসলমানের সমগ্র বিশ্বাসের ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত। এই কালেমাকে বহনকারী পতাকা তাই নিছক একটি পতাকা নয়; এটি ধর্মীয় মর্যাদা ও আধ্যাত্মিক পরিচয়ের প্রতীক।


সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, বিশ্বকাপ ফুটবল উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের পতাকার পাশাপাশি কলেমা খচিত পতাকাও একই আবেগে, একই প্রতিযোগিতায় কিংবা একই প্রদর্শনীতে ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেকে হয়তো ভালোবাসা বা ধর্মীয় আবেগ থেকেই এটি করছেন। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে- এই ব্যবহার কি যথার্থ? একটি ধর্মীয় প্রতীককে কি একটি সাময়িক ক্রীড়া উন্মাদনার সঙ্গে একই কাতারে দাঁড় করানো সমীচীন?


একটি শিশু যখন ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, স্পেন কিংবা অন্য কোনো দলের পতাকা হাতে নেয়, তখন তার উদ্দেশ্য আনন্দ করা। সে একটি খেলার সমর্থন করছে। চার বছর পরে হয়তো সেই দলও বদলে যাবে, পছন্দও বদলে যাবে। কিন্তু একজন মুসলমানের ঈমান কি কখনো পরিবর্তনশীল? একজন বিশ্বাসীর কাছে কলেমা কি কোনো দলের প্রতীক? কখনোই নয়।


এখানেই বিনোদন ও বিশ্বাসের মৌলিক পার্থক্য।


ধর্মীয় প্রতীক এমন কোনো বিষয় নয়, যাকে আনন্দ-উৎসবের প্রতিযোগিতার অংশ বানানো যায়। কারণ ধর্ম মানুষের চিরন্তন পরিচয়, আর খেলাধুলা মানুষের অবসর বিনোদনের মাধ্যম। একটির মর্যাদা চিরস্থায়ী, অন্যটির আবেগ ক্ষণস্থায়ী।


আমরা এমন একটি সমাজে বাস করি যেখানে ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি পারস্পরিক সম্মান সামাজিক সম্প্রীতির অন্যতম ভিত্তি। তাই যে কোনো ধর্মের পবিত্র প্রতীককে এমনভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়, যাতে তা বিতর্ক, বিভ্রান্তি বা অবমূল্যায়নের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ইসলাম যেমন অন্য ধর্মের উপাসনালয় বা ধর্মীয় প্রতীককে অবমাননা করতে নিষেধ করে, তেমনি মুসলমানদেরও নিজেদের ধর্মীয় প্রতীক যথাযথ মর্যাদায় সংরক্ষণ করা উচিত।


বিশ্বকাপের পতাকা বাতাসে উড়বে- এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কলেমা খচিত পতাকার স্থান কি একই আবেগের প্রতিযোগিতায়? এই প্রশ্ন প্রত্যেক মুসলমানের বিবেকের কাছে রেখে যেতে চাই। কারণ ঈমান কখনো খেলার প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারে না। ঈমান মানুষের জীবন পরিচালনার মূল ভিত্তি।


আমরা যদি আমাদের সন্তানদের শেখাই যে ধর্মীয় প্রতীকও খেলার পতাকার মতোই একটি প্রদর্শনীর বিষয়, তবে তারা অজান্তেই ধর্মীয় প্রতীকের অন্তর্নিহিত মর্যাদা সম্পর্কে ভুল ধারণা পেতে পারে। শিশুদের আনন্দে বাধা দেওয়া উদ্দেশ্য নয়; বরং তাদের শেখানো দরকার কোনটি বিনোদনের প্রতীক এবং কোনটি বিশ্বাসের প্রতীক।


একজন মানুষ ব্রাজিল কিংবা আর্জেন্টিনার সমর্থক হতে পারেন, আবার পরবর্তী বিশ্বকাপে অন্য দলেরও সমর্থক হতে পারেন। কিন্তু একজন মুসলমানের পরিচয় কখনো পরিবর্তিত হয় না। তাই যে প্রতীক ঈমানের প্রতিনিধিত্ব করে, তাকে সাময়িক উল্লাসের প্রতিযোগিতায় নামানো বুদ্ধিমানের কাজ নয়।


বিশ্বাসের মর্যাদা রক্ষা করা কোনো উগ্রতা নয়; বরং এটি ধর্মীয় সচেতনতার পরিচয়। একই সঙ্গে খেলাধুলাকে খেলাধুলার জায়গায় রাখা এবং ধর্মকে ধর্মের জায়গায় রাখা- এই ভারসাম্যই একটি পরিণত সমাজের বৈশিষ্ট্য।


আমার বক্তব্য খুবই সরল- বিশ্বকাপ ফুটবল আমার বিনোদন হতে পারে; কিন্তু কলেমা তাইয়্যেবা আমার ঈমান। শিশুদের বিনোদনের সঙ্গে আমার ঈমানকে প্রতিযোগিতায় নামানো কোনোভাবেই সমীচীন নয়। বিশ্বাসের মর্যাদা বিশ্বাসের স্থানেই থাকুক, আর খেলার আনন্দ থাকুক খেলার মাঠেই।


-লেখক: কবি, গল্পকার ও গণসংযোগবিদ।

bbqif1983@gmail.com

সম্পর্কিত খবর

;