দুই বছরের কম সময়ে বিদায়: যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ

প্রকাশ : 23 Jun 2026
দুই বছরের কম সময়ে বিদায়: যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের পদত্যাগ

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ২০২৪ সালে ১৪ বছরের কনজারভেটিভ শাসনের অবসান ঘটিয়ে লেবার পার্টিকে বড় জয় এনে দিয়েছিলেন কিয়ার স্টারমার। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশংসা কুড়ালেও মাত্র দুই বছরেরও কম সময়ের মধ্যে দেশের ভেতর কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে অজনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব ছাড়লেন তিনি।


সোমবার ২২ জুন লন্ডনের ডাউনিং স্ট্রিটের ১০ নম্বর বাসভবনের সামনে দাঁড়িয়ে পদত্যাগের ঘোষণা দেন স্টারমার। এএফপি জানিয়েছে, গম্ভীর মুখে তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী হওয়া ছিল তার জীবনের সবচেয়ে গর্বের মুহূর্ত। এখন মর্যাদার সঙ্গে বিদায় নেওয়ার সময় এসেছে। আবেগঘন বক্তব্যে পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়ে চোখ ভিজে আসে তার। পরে স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে তিনি সেখান থেকে সরে যান।


২০২৪ সালের ৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেন ৬৩ বছর বয়সী স্টারমার। প্রথম ভাষণে তিনি ‘সেবামূলক’ সরকার গঠনের অঙ্গীকার করেন, যা মানুষের জীবনে কম হস্তক্ষেপ করবে। নিজেকে বাস্তববাদী ও প্রশাসনিক শৈলীর নেতা হিসেবে তুলে ধরেন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও লিজ ট্রাসের আদর্শিক ও আড়ম্বরপূর্ণ রাজনীতির বিপরীতে নিজেকে উপস্থাপন করেছিলেন তিনি। লিজ ট্রাসের মাত্র ৪৯ দিনের সরকারসহ টানা রাজনৈতিক অস্থিরতার পর স্থিতিশীলতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসেন স্টারমার।


কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পর একের পর এক নীতিগত অবস্থান বদল ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তে সমালোচনার মুখে পড়েন তিনি। প্রবীণদের শীতকালীন জ্বালানি ভাতা বাতিলের ঘোষণা, কল্যাণভাতা সংস্কার, কৃষকদের জন্য উত্তরাধিকার কর আরোপের পরিকল্পনা এবং বেতন কর ও ন্যূনতম মজুরি বাড়ানোর সিদ্ধান্তে দলের ভেতরে-বাইরে অসন্তোষ তৈরি হয়। পরে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসতে বাধ্য হন। মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে পরিচিত স্টারমার শেষ পর্যন্ত নির্ভরযোগ্য নেতৃত্বের প্রতীক হয়ে উঠতে পারেননি বলে সমালোচকদের মত।


২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে উপ-প্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার সম্পত্তি কর কম দেওয়ার অভিযোগে পদত্যাগ করেন। একই মাসে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনকে বরখাস্ত করেন স্টারমার। প্রয়াত মার্কিন ধনকুবের জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ম্যান্ডেলসনের ঘনিষ্ঠতা নিয়ে বিতর্কের জেরে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। স্টারমার পরে এ নিয়োগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে তার দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগীকেও সরে যেতে হয়।


চলতি বছরের মে মাসে স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির বড় ধরনের পরাজয়ের পর স্টারমারের পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়। ইউগভের জনমত জরিপে দেখা গেছে, তার জনপ্রিয়তার হার ছিল মাত্র ১৯ শতাংশ, যা যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রীদের মধ্যে ইতিহাসের অন্যতম সর্বনিম্ন।


তবে বিদায়ী বক্তব্যে নিজের কিছু সাফল্যের কথা তুলে ধরেন স্টারমার। তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যকে তিনি আরও শক্তিশালী ও ন্যায়সঙ্গত অবস্থায় রেখে যাচ্ছেন। জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় অপেক্ষমাণ রোগীর সংখ্যা কমে আসা, ইউক্রেনের পাশে ইউরোপীয় সমর্থন ধরে রাখা এবং ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেন। সমর্থকদের মতে, ইরান ইস্যুতে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অবস্থানের বিরোধিতা করাও ছিল তার সাহসী পদক্ষেপ।


স্টারমারের স্থলাভিষিক্ত হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে আছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। গ্রেটার ম্যানচেস্টারের সাবেক মেয়র বার্নহ্যাম সম্প্রতি একটি উপনির্বাচনে জয়ী হয়ে পার্লামেন্টে ফিরেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, স্টারমারকে যেখানে অনেকে কাঠখোট্টা ও দূরত্ব বজায় রাখা নেতা মনে করতেন, সেখানে বার্নহ্যাম জনসংযোগে বেশি দক্ষ ও প্রাণবন্ত।


১৯৬২ সালের ২ সেপ্টেম্বর লন্ডনের উপকণ্ঠে জন্ম নেওয়া স্টারমার মানবাধিকার আইনজীবী ও পরে রাষ্ট্রের প্রধান কৌঁসুলি হিসেবে কাজ করেছেন। এ অবদানের জন্য রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাকে নাইট উপাধি দেন। ২০১৫ সালে সংসদ সদস্য হন। ২০২০ সালে জেরেমি করবিনের স্থলাভিষিক্ত হয়ে লেবার পার্টির নেতা হন। দলে ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, করবিনপন্থীদের সরিয়ে দেওয়া এবং দলকে মধ্যপন্থায় আনার মাধ্যমে ২০২৪ সালে লেবারকে দুই দশকের মধ্যে সবচেয়ে বড় জয় এনে দেন। তবে অভিবাসনসহ কয়েকটি ইস্যুতে তার অবস্থানের কারণে দলের বামপন্থী অংশের সমর্থন হারান।


ব্রিটিশ গণমাধ্যমের একাংশের মতে, স্টারমার এমন একজন নেতা ছিলেন যার নিজস্ব দৃঢ় আদর্শের ঘাটতি ছিল। গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধাগ্রস্ত থাকতেন এবং প্রয়োজনে ঘনিষ্ঠ সহযোগীদেরও সরিয়ে দিতে পিছপা হননি।


সম্পর্কিত খবর

;