বিল্লাল বিন কাশেম:
একটি দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি তার মানবসম্পদ। প্রাকৃতিক সম্পদ, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতি যতই থাকুক না কেন, দক্ষ, সৃজনশীল ও কর্মমুখী জনগোষ্ঠী ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রায় তাই শিক্ষাব্যবস্থাকে সময়োপযোগী ও বাস্তবমুখী করে তোলার বিকল্প নেই। দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনে ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ—যদি সুষ্ঠু পরিকল্পনা, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং মানসম্মত শিক্ষার মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়—তবে এটি দেশের শিক্ষা খাতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হতে পারে।
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার বিস্তার ঘটেছে, কিন্তু সেই শিক্ষার সঙ্গে কর্মসংস্থানের সম্পর্ক সব সময় দৃঢ় হয়নি। প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী এসএসসি, এইচএসসি এবং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে বের হলেও তাদের একটি বড় অংশ শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। ফলে একদিকে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বাড়ছে, অন্যদিকে শিল্প, কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা ও কারিগরি খাতে দক্ষ জনবলের ঘাটতি রয়ে যাচ্ছে। এই বৈপরীত্য দূর করতে হলে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীদের দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রস্তাবিত ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ কেবল নতুন ভবন নির্মাণের প্রকল্প হয়ে থাকলে তার কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলবে না। এগুলোকে হতে হবে আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞানচর্চা, প্রযুক্তি, ভাষা দক্ষতা, নৈতিক শিক্ষা এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের উৎকর্ষ কেন্দ্র। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে আধুনিক বিজ্ঞানাগার, স্মার্ট শ্রেণিকক্ষ, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, আইসিটি ল্যাব, ভাষা ল্যাব এবং দক্ষ শিক্ষক নিশ্চিত করতে হবে।
আজকের বিশ্বে কেবল সনদ নয়, দক্ষতাই সবচেয়ে বড় পরিচয়। উন্নত বিশ্বের অনেক দেশেই উচ্চমাধ্যমিক শেষ করার পর বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী কারিগরি শিক্ষা, অ্যাপ্রেন্টিসশিপ, ডিপ্লোমা বা পেশাভিত্তিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে সরাসরি কর্মজীবনে প্রবেশ করে। সবাই বিশ্ববিদ্যালয়ে যায় না। যারা গবেষণা, উচ্চতর জ্ঞানচর্চা বা বিশেষায়িত পেশায় যেতে চায়, তারাই মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। এই কাঠামো শ্রমবাজারের বাস্তবতার সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।
বাংলাদেশেও এই বাস্তবতা নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক লক্ষ্য হিসেবে না দেখে, শিক্ষার্থীর মেধা, আগ্রহ এবং পেশাগত সক্ষমতার ভিত্তিতে বিভিন্ন শিক্ষাপথ তৈরি করা প্রয়োজন। উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়েই এমন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে একজন শিক্ষার্থী চাইলে দক্ষতা নিয়ে চাকরিতে প্রবেশ করতে পারে, উদ্যোক্তা হতে পারে অথবা উচ্চশিক্ষায় যেতে পারে।
এর অর্থ এই নয় যে বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্ব কমিয়ে দেওয়া হবে। বরং বিশ্ববিদ্যালয়কে তার প্রকৃত মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় হবে গবেষণা, উদ্ভাবন, নতুন জ্ঞান সৃষ্টি এবং জাতীয় সমস্যার সমাধান অনুসন্ধানের কেন্দ্র। সেখানে ভর্তি হবে সেই শিক্ষার্থীরা, যারা উচ্চতর শিক্ষা, গবেষণা এবং সৃজনশীল চিন্তার মাধ্যমে নতুন অবদান রাখতে সক্ষম। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমবে, শিক্ষার মান উন্নত হবে এবং গবেষণার পরিবেশ আরও শক্তিশালী হবে।
বাংলাদেশে বর্তমানে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সনদ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার সমালোচনার মুখে রয়েছে। বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী, সীমিত গবেষণা বাজেট, শিক্ষক সংকট এবং অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে কাঙ্ক্ষিত মান অর্জন কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে অনেক শিক্ষার্থী কেবল সামাজিক চাপ বা চাকরির আশায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেও পরবর্তীতে হতাশার মুখোমুখি হয়। এ বাস্তবতায় শিক্ষাব্যবস্থার ভারসাম্যপূর্ণ সংস্কার প্রয়োজন।
মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজগুলোকে যদি শিল্পপ্রতিষ্ঠান, তথ্যপ্রযুক্তি খাত, কৃষি, স্বাস্থ্যসেবা এবং স্থানীয় অর্থনীতির সঙ্গে সংযুক্ত করা যায়, তাহলে শিক্ষার্থীরা বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ পাবে। শিক্ষাজীবনের শেষ পর্যায়েই ইন্টার্নশিপ, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং শিল্প-প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তোলা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা কর্মজীবনের জন্য প্রস্তুত হবে এবং নিয়োগদাতারাও দক্ষ জনবল পাবে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক্স, ডেটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার নিরাপত্তা, ক্লাউড কম্পিউটিং এবং অটোমেশনের মতো বিষয়ে মৌলিক ধারণা এখন আর বিলাসিতা নয়; বরং প্রয়োজন। তাই প্রতিটি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে ইংরেজি ভাষা, যোগাযোগ দক্ষতা, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব এবং দলগত কাজের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষা কেবল কর্মসংস্থানের জন্য নয়; মানুষ গড়ার জন্যও। তাই নৈতিকতা, দেশপ্রেম, মানবিক মূল্যবোধ, পরিবেশ সচেতনতা এবং সামাজিক দায়িত্ববোধের শিক্ষা সমান গুরুত্ব পেতে হবে। একজন দক্ষ কিন্তু অনৈতিক ব্যক্তি সমাজের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি একজন নৈতিক কিন্তু দক্ষতাহীন ব্যক্তি নিজের সম্ভাবনাও পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেন না। সুতরাং জ্ঞান, দক্ষতা ও চরিত্র—এই তিনের সমন্বয়ই হওয়া উচিত শিক্ষার মূল লক্ষ্য।
নারী শিক্ষার ক্ষেত্রেও এই উদ্যোগ যুগান্তকারী হতে পারে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত হলে অনেক শিক্ষার্থী শহরমুখী হওয়ার প্রয়োজন অনুভব করবে না। এতে শিক্ষা ব্যয় কমবে, পরিবারগুলো উপকৃত হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হবে।
তবে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে মনে রাখতে হবে—শুধু অবকাঠামো নির্মাণ করলেই শিক্ষার মান বাড়ে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক পাঠ্যক্রম, কার্যকর মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা। শিক্ষক প্রশিক্ষণ, গবেষণা, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষাদান নিশ্চিত না হলে মডেল প্রতিষ্ঠানের লক্ষ্য পূরণ হবে না।
বাংলাদেশের জনমিতিক সুবিধা (Demographic Dividend) এখনো পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব। দেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি সময়োপযোগী শিক্ষা ও দক্ষতা দেওয়া যায়, তাহলে তারা কেবল দেশের অর্থনীতিকেই সমৃদ্ধ করবে না; আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে। দক্ষ মানবসম্পদই হবে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর চাপ কমানোর বিষয়টি বাস্তবসম্মত নীতিগত আলোচনার দাবি রাখে। তবে এটি কোনোভাবেই উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত করার উদ্যোগ হওয়া উচিত নয়। বরং এমন একটি বহুমাত্রিক শিক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে, যেখানে সাধারণ শিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা, বৃত্তিমূলক শিক্ষা এবং উচ্চশিক্ষা—সবগুলো পথই সমান মর্যাদা পাবে। একজন শিক্ষার্থী তার যোগ্যতা, আগ্রহ এবং জীবনের লক্ষ্য অনুযায়ী পথ বেছে নেওয়ার সুযোগ পাবে।
আজকের বিশ্বে সফলতার একমাত্র মানদণ্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি নয়। দক্ষ উদ্যোক্তা, প্রযুক্তিবিদ, কারিগরি বিশেষজ্ঞ, কৃষি উদ্ভাবক, স্বাস্থ্যকর্মী এবং সৃজনশীল পেশাজীবীরাও জাতীয় উন্নয়নের সমান অংশীদার। সমাজে এই মানসিক পরিবর্তন আনাও জরুরি।
পরিশেষে বলা যায়, দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনে ৬০০টি মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ শুধু একটি শিক্ষা প্রকল্প নয়; এটি ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের একটি কৌশলগত বিনিয়োগ হতে পারে। তবে এর সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনার মান, বাস্তবায়নের স্বচ্ছতা, শিক্ষার গুণগত উৎকর্ষ এবং কর্মমুখী দৃষ্টিভঙ্গির ওপর।
একটি আধুনিক, দক্ষ ও আত্মনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে আমাদের এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা প্রয়োজন, যেখানে উচ্চমাধ্যমিক পর্যায় থেকেই শিক্ষার্থীরা জীবনের জন্য প্রস্তুত হবে, কর্মদক্ষতা অর্জন করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী উচ্চশিক্ষা বা কর্মজীবনের পথ বেছে নিতে পারবে। আর বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হয়ে উঠবে গবেষণা, উদ্ভাবন, জ্ঞান সৃষ্টি ও জাতীয় নেতৃত্ব বিকাশের প্রকৃত কেন্দ্র। সেই ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাব্যবস্থাই বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিযাত্রাকে আরও শক্তিশালী ও টেকসই ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করবে।
-লেখক: কবি, গল্পকার ও জনসংযোগবিদ।
bbqif1983@gmail.com
আতিকুল ইসলাম টিটু:জাতীয় সংসদ ভবন শুধু একটি প্রশাসনিক স্থাপনা নয়; এটি জাতীয় সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র এবং জনগণের রাজনৈতিক ইচ্ছার সাংবিধানিক প্রতীক। সেই সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধী ...
।। মুক্তার হোসেন নাহিদ ।।হাইটিনা, জাপান্টিনা কিংবা নরওয়েন্টিনা—যে নামেই ট্রল করা হোক না কেন, আর্জেন্টিনার কট্টর সমর্থক হওয়ার পরেও আমি সবসময় ব্রাজিলের বিজয় কামনা করেছি। কারণ বিশ্ব ফুটবল উন্মাদনার ...
আফসানা আরেফিন:আমরা এক অদ্ভুত প্যারাডক্স বা আপাত-বিরোধিতার গোলকধাঁধায় দাঁড়িয়ে আছি। পুঁজিবাদী উৎপাদনব্যবস্থা, সোশ্যাল মিডিয়ার কৃত্রিম কিউরেট করা জীবন এবং করপোরেট সংস্কৃতির পারফরম্যান্স রিভিউ সবকিছু মিলে ...
মুক্তার হোসেন নাহিদ:মায়ামির রাতের আকাশে নীল-সাদার সমারোহ। হার্ড রক স্টেডিয়ামে "আর্জেন্টিনা! আর্জেন্টিনা" প্রতিধ্বনি। দুনিয়াজুড়ে পর্দার সামনে কোটি কোটি মানুষের কণ্ঠেও একই আওয়াজ। ফিফা র্যাংকিংয়ে ১ম স্থ ...
সব মন্তব্য
No Comments