পিরোজপুরে লিচু চাষে মডেল তারাবুনিয়ার কৃষক হংসপতি মিস্ত্রী

প্রকাশ : 25 Jun 2026
পিরোজপুরে লিচু চাষে মডেল তারাবুনিয়ার কৃষক হংসপতি মিস্ত্রী

হাসান মামুন, পিরোজপুর: দক্ষিণাঞ্চলের উপকূলীয় জেলা পিরোজপুরে একসময় লিচু চাষের কথা ছিল প্রায় অকল্পনীয়। সেই ধারণাকে বদলে দিয়ে নাজিরপুর উপজেলার তারাবুনিয়া গ্রামের প্রান্তিক কৃষক হংসপতি মিস্ত্রী গড়ে তুলেছেন সফল লিচুবাগান। তাঁর হাত ধরেই এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে লিচু চাষের নতুন সম্ভাবনা। আজ তারাবুনিয়া শুধু একটি গ্রামের নাম নয়, স্থানীয়দের কাছে এটি পরিচিতি পেয়েছে ‘লিচু গ্রাম’ হিসেবে। তালতলা নদীর তীরঘেঁষা তারাবুনিয়া গ্রামে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সারি সারি লিচুগাছ। মৌসুমজুড়ে গাছে ঝুলে থাকা টসটসে লাল লিচু, বাগানে ব্যস্ত নারী-পুরুষ, কোথাও ফল সংগ্রহ, কোথাও বাছাই ও বাজারজাতকরণের প্রস্তুতি। পুরো গ্রামজুড়ে যেন উৎসবের আমেজ।


স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই যুগ ধরে এ গ্রামে লিচুর চাষ হচ্ছে। বর্তমানে প্রায় পাঁচ একর জমিতে লিচুর পাশাপাশি আপেল কুল, বরই, কমলা ও মালটার আবাদ করছেন হংসপতি মিস্ত্রী। একসময় দক্ষিণাঞ্চলে বিরল এই ফল এখন স্থানীয় কৃষকদের জন্য লাভজনক আয়ের উৎসে পরিণত হয়েছে। বিষমুক্ত ও প্রাকৃতিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত হওয়ায় তারাবুনিয়ার লিচুর চাহিদা ব্যাপক। স্থানীয় বাজারের চাহিদা পূরণ করে এসব লিচু যাচ্ছে ঢাকা, খুলনা, বরিশাল, গোপালগঞ্জসহ আশপাশের ২০ থেকে ২৫টি উপজেলায়। প্রতিদিন পিরোজপুর শহর ও পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে অসংখ্য মানুষ পরিবার নিয়ে বাগান দেখতে আসছেন। অনেকেই গাছ থেকে নিজের হাতে লিচু পেড়ে কিনে বাড়ি ফিরছেন।


লিচুচাষি হংসপতি মিস্ত্রী জানান, ২০০৭ সালে সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে তিনি লিচু চাষ শুরু করেন। এ জন্য তিনি দিনাজপুর, রাজশাহী, মাগুরা ও যশোরের বিভিন্ন লিচুবাগান পরিদর্শন করেন এবং অভিজ্ঞ চাষিদের পরামর্শ নেন। পাশাপাশি কৃষিবিষয়ক প্রতিবেদন এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠান থেকেও তিনি অনুপ্রাণিত হন। তিনি বলেন, ২০০৮ সালে দিনাজপুরের একটি নার্সারি থেকে মুজাফফরী ও চায়না-৩ জাতের চারা সংগ্রহ করে রোপণ করি। দীর্ঘ পরিচর্যার পর বাগানে আশানুরূপ ফলন এসেছে। এ বছর প্রায় ৯০ শতাংশ গাছে ফল ধরেছে। মৌসুম শেষে লিচু বিক্রি করে ৫ থেকে ৬ লাখ টাকা আয় হওয়ার আশা করছি।


হংসপতির সাফল্যে অনুপ্রাণিত হয়ে গ্রামের অনেক কৃষক এখন লিচু চাষে যুক্ত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে মনোজ সিকদার, গৌরাঙ্গ মণ্ডল, হারুনুর রশীদ, সমীর এদবর ও কমলেশ মল্লিক উল্লেখযোগ্য। চাষি পরিমল বিশ্বাস বলেন, পাঁচ একরের বাগান থেকে খরচ বাদ দিয়ে এবার ভালো লাভ হয়েছে। প্রতি বছর ফল বিক্রির অর্থ দিয়ে কিছু না কিছু জমি কিনছি। গত ১৩-১৪ বছরে কখনো লোকসান হয়নি। হারুনুর রশীদ জানান, এক একর বাগান থেকে এবার খরচ বাদ দিয়ে দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা লাভের আশা করছেন তিনি। কমলেশ মল্লিক বলেন, প্রতি হাজার লিচু ৩ হাজার ৫০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এবার প্রায় সব চাষিই লাভবান হবেন।


সরেজমিনে দেখা গেছে, তারাবুনিয়ার অধিকাংশ পরিবার কোনো না কোনোভাবে ফলচাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। অনেক বাগানে একই সঙ্গে লিচু, আম, বরই ও মালটার চাষ করা হচ্ছে। ফলে বছরের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন ফল থেকে আয় করছেন কৃষকরা। স্থানীয় কৃষক রতন কুমার ও আব্দুল মালেক বলেন, হংসপতি মিস্ত্রী নিজের সন্তানের মতো গাছগুলোর পরিচর্যা করেছেন। তাঁর সফলতা দেখে অনেকেই এখন লিচু চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। স্থানীয়দের মতে, উত্তরাঞ্চলের জনপ্রিয় এই ফল দক্ষিণাঞ্চলে এত ভালো ফলন দেবে, তা একসময় কল্পনাও করা যায়নি। উপকূলীয় অঞ্চলে পরিকল্পিতভাবে লিচুর আবাদ সম্প্রসারণ করা গেলে স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও সরবরাহ সম্ভব হবে।


নাজিরপুর উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, উপজেলায় বর্তমানে ছোট-বড় মিলিয়ে শতাধিক লিচুবাগান রয়েছে। অধিকাংশ চাষি ২০ থেকে ২৫ বছর ধরে বিভিন্ন জাতের লিচু চাষ করছেন। তবে এবারের মতো এত ভালো ফলন আগে দেখা যায়নি। নাজিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ ইশরাতুন্নেছা এশা বলেন, নাজিরপুরের লিচুচাষিরা শুধু জেলার নয়, বরিশাল বিভাগেরও সফল ও মডেল চাষি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। তাঁদের উৎপাদিত উন্নত জাতের লিচু রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে নিয়মিত প্রশিক্ষণ, বাগান পরিদর্শন ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, ফলচাষ লাভজনক হওয়ায় দিন দিন এ অঞ্চলের কৃষকেরা ফলজ বাগান গড়ে তুলতে আগ্রহী হচ্ছেন।


হংসপতি মিস্ত্রীর স্বপ্ন, এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবকদের ফলচাষে উদ্বুদ্ধ করে দক্ষিণাঞ্চলকে একটি সমৃদ্ধ ফল উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত করা। তাঁর এই উদ্যোগ ইতোমধ্যে প্রমাণ করেছে—সঠিক পরিকল্পনা, পরিশ্রম ও আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির সমন্বয়ে দক্ষিণাঞ্চলও হতে পারে দেশের অন্যতম লিচু উৎপাদন কেন্দ্র।


সম্পর্কিত খবর

;