পানির দামেও ক্রেতা নেই, চরম সংকটে কোরবানির চামড়ার বাজার

প্রকাশ : 29 May 2026
পানির দামেও ক্রেতা নেই, চরম সংকটে কোরবানির চামড়ার বাজার

স্টাফ রিপোর্টার: কোরবানির ঈদ শেষ হলেও চামড়ার বাজারে দেখা দিয়েছে চরম ক্রেতা সংকট। সরকার নির্ধারিত দাম কাগজে-কলমে থাকলেও মাঠপর্যায়ে বড় গরুর চামড়াও বিক্রি হচ্ছে পানির দরে। কোথাও কোথাও ২ থেকে আড়াই লাখ টাকার গরুর চামড়া মাত্র ২০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন কোরবানিদাতারা। মাঝারি গরুর চামড়া ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা, আর ছাগলের চামড়া ৫০ থেকে ১০০ টাকায় হাতবদল হচ্ছে। অনেক এলাকায় দুপুর গড়িয়েও ক্রেতার দেখা না মেলায় নিরুপায় হয়ে চামড়া এতিমখানা-মাদ্রাসায় দান করে দিচ্ছেন মানুষ। 


ফেনীর পরশুরামে ১ লাখ ৮০ হাজার টাকা দামের গরুর চামড়া ২০০ টাকায় বিক্রি করেছেন স্কুলশিক্ষক বাহাদুর হোসেন। একই এলাকার যুবদলের আহ্বায়ক মনির হোসেন মিন্টু জানান, তাঁর ২ লাখ ২০ হাজার টাকার গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ২০০ টাকায়। মাঠপর্যায়ে মৌসুমি খুচরা ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন এলাকা ঘুরে নামমাত্র মূল্যে চামড়া কিনছেন। পাইকারি ক্রেতাদের অনাগ্রহের কারণে বাজার আরও নিম্নমুখী। 


সরকার এ বছর ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। সর্বনিম্ন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি পিস ১ হাজার ৩৫০ টাকা। কিন্তু বাস্তবে গত বছরের চেয়েও কম দামে চামড়া বিক্রি হচ্ছে। গত বছরও কোথাও কোথাও ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় গরুর চামড়া বিক্রির অভিযোগ ছিল। ফলে এবারও বাজারে অনিশ্চয়তা কাটেনি। 


বিশ্লেষকরা বলছেন, এক দশকে চামড়ার প্রকৃত মূল্য ৮০ শতাংশের বেশি কমেছে। ২০১৫ সালে একটি গরুর চামড়ার গড় দাম ছিল ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকা। মূল্যস্ফীতি হিসাব করলে সেই চামড়ার দাম এখন ৪ হাজার ১৮০ টাকা হওয়ার কথা। অথচ ২০২৬ সালে অনেক জায়গায় ৭০০ থেকে ৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। 


ট্যানারি মালিকরা জানান, এবার তাঁরা সব মিলিয়ে ৭৫ থেকে ৮০ লাখ পিস চামড়া সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছেন। গতবার এই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮০ থেকে ৮৫ লাখ। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যানুসারে, এবার কোরবানির জন্য প্রস্তুত ছিল প্রায় ১ কোটি ২৩ লাখ ৩৪ হাজার পশু, চাহিদা ছিল ১ কোটি ১ লাখ ৬ হাজার। কিন্তু মৌসুমি ব্যবসায়ীরা বলছেন, দুপুর পর্যন্ত কাঁচা চামড়া আসার পরিমাণ গতবারের চেয়ে কম। 


সংকটের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। প্রথমত, ব্যাংক ঋণের ঘাটতি। ব্যাংকগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, চামড়া খাতের ঋণের ৬৫ শতাংশ চলতি মূলধন এবং মাত্র ৩৫ শতাংশ কোরবানির চামড়া কেনার জন্য ব্যবহার করা যায়। এ বছর সোনালী ব্যাংক ২৫ কোটি, অগ্রণী ব্যাংক ৭৫ কোটি ও জনতা ব্যাংক ৬০ কোটি টাকা ঋণ অনুমোদন দিয়েছে। রূপালী ব্যাংকের গ্রাহকেরা আগের ঋণসীমা অতিক্রম করায় নতুন ঋণই পাননি। ২০১৯ সালে চামড়া খাতে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ হলেও গত বছর তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১২৫ কোটি টাকায়। 


দ্বিতীয়ত, সাভারের ট্যানারি স্থানান্তরের ব্যর্থতা। ২০১৭ সালে হাজারীবাগ থেকে সাভারের বিসিক চামড়া শিল্পনগরীতে ট্যানারি স্থানান্তর করা হলেও কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। সিইটিপির দৈনিক সক্ষমতা প্রায় ১৪ হাজার ঘনমিটার, অথচ কোরবানির মৌসুমে প্রয়োজন পড়ে ৩২ থেকে ৪০ হাজার ঘনমিটার পর্যন্ত। ফলে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত বর্জ্য ধলেশ্বরী নদীতে গিয়ে পড়ছে। পরিবেশদূষণের কারণে অধিকাংশ ট্যানারি আন্তর্জাতিক এলডব্লিউজি সনদ পাচ্ছে না। 


তৃতীয়ত, লবণ সংকট ও বাড়তি খরচ। চামড়া ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বাজারে লবণের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে। লবণের দাম কয়েক মাস আগেও ৬৮০ থেকে ৭০০ টাকা বস্তা থাকলেও এখন আরও বেড়েছে। প্রতিটি চামড়ার পেছনে শুধু পরিবহন খরচই ৪০০ টাকার বেশি পড়ে। তার সঙ্গে বাড়তি লবণ খরচ যুক্ত হওয়ায় লোকসানের আশঙ্কা বাড়ছে। ট্যানারিগুলো সময়মতো বকেয়া পরিশোধ না করায় ছোট ব্যবসায়ীরা টিকে থাকতে পারছেন না। 


বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ভ্যালু অ্যাডিশনে পিছিয়ে থাকা। এখনো রপ্তানির বড় অংশ নির্ভর করছে ওয়েট ব্লু বা স্বল্প প্রক্রিয়াজাত চামড়ার ওপর। অথচ আন্তর্জাতিক বাজারে মূল মুনাফা আসে ব্র্যান্ডেড জুতা, ব্যাগ ও ফ্যাশন পণ্য থেকে। ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও মানসম্পন্ন ফিনিশড পণ্যে না গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকা কঠিন হবে। 


এ পরিস্থিতিতে চামড়া শিল্পের উন্নয়নে একটি স্বতন্ত্র ‘জাতীয় চামড়া বোর্ড’ গঠনের দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। নীতিগত সমন্বয়, আন্তর্জাতিক বাজার সম্প্রসারণ, পরিবেশগত সনদ অর্জন, প্রযুক্তি উন্নয়ন ও অর্থায়ন ব্যবস্থাপনায় কার্যকর নেতৃত্বের অভাবেই খাতটি পিছিয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন তাঁরা। পাশাপাশি এলডব্লিউজি সনদ জটিলতা কাটাতে ট্যানারিগুলোতে পৃথক ইটিপি স্থাপন, দীর্ঘমেয়াদি ঋণ সুবিধা এবং স্থানীয় বাজার সম্প্রসারণের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে। 

সম্পর্কিত খবর

;