তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও যুদ্ধবিমান কেনা

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনায় ‘নজর’ রাখছে ভারত

প্রকাশ : 03 Jul 2026
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের আলোচনায় ‘নজর’ রাখছে ভারত

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য জে-১০সিই যুদ্ধবিমান ক্রয় এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে বেইজিংয়ের সহযোগিতা নিয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ভারত। শুক্রবার নয়াদিল্লিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ভারত প্রতিবেশী দেশগুলোর এ ধরনের সব উন্নয়ন “ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ” করছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী “উপযুক্ত ব্যবস্থা” নেবে। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমরা প্রতিবেশী অঞ্চলের এ ধরনের সব উন্নয়ন নিবিড়ভাবে অনুসরণ করি এবং প্রয়োজন অনুসারে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করি”। 


সম্প্রতি বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক গণমাধ্যমে খবর আসে, প্রধান উপদেষ্টা তারেক রহমানের চীন সফরে বাংলাদেশ ২০ থেকে ২৪টি জে-১০সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার আলোচনা চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়েছে। প্রায় ২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তির আওতায় প্রশিক্ষণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও আনুষঙ্গিক খরচ অন্তর্ভুক্ত থাকবে এবং ২০২৬-২০২৭ সাল নাগাদ বিমানগুলো সরবরাহ হতে পারে। অর্থ পরিশোধ ২০৩৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। একই সফরে বাংলাদেশ তিস্তা নদী সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে (TRCMRP) চীনের কারিগরি ও আর্থিক সহায়তা চেয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নে পাওয়ার চায়নার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর হয় ২০১৬ সালে। প্রথম ধাপে প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে, যার মধ্যে ৬ হাজার ৭০০ কোটি টাকা চীনের কাছ থেকে ঋণ হিসেবে চাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। 


তিস্তা প্রকল্প প্রসঙ্গে জয়সওয়াল বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের উন্নয়ন সহযোগিতা একটি “পারস্পরিকভাবে সম্মত রোডম্যাপের” ভিত্তিতে হয়, যা নিয়মিত পর্যালোচনা করা হয়। তিনি যোগ করেন, “তিস্তা নদী প্রকল্প নিয়ে আমাদের অবস্থান আগেই বাংলাদেশকে জানানো হয়েছে” এবং “সংশ্লিষ্ট সব উন্নয়ন আমাদের সামগ্রিক বাংলাদেশ-নীতিতে বিবেচনায় নেওয়া হবে”। এর আগে গত এপ্রিলেও তিনি জানিয়েছিলেন, তিস্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলো “কাঠামোবদ্ধ দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থার” মাধ্যমে নিয়মিত আলোচনা হয়। 


ভারতের নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, জে-১০সিই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশের বিমানবাহিনী প্রথমবারের মতো বিওন্ড-ভিজ্যুয়াল-রেঞ্জ ক্ষমতাসম্পন্ন ৪.৫ প্রজন্মের যুদ্ধবিমান পাবে। একইসঙ্গে চীনের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ, সফটওয়্যার আপডেট ও অস্ত্র সরবরাহের নির্ভরতা তৈরি হবে। ভারতের জন্য উদ্বেগের জায়গা হলো, এই বিমানগুলো শিলিগুড়ি করিডোর বা “চিকেন নেক” সংলগ্ন এলাকায় মোতায়েন হতে পারে, যা উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের সংযোগস্থল। পাশাপাশি চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর প্রস্তাব এবং তিস্তা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা নিয়েও নয়াদিল্লি সতর্ক। ভারতীয় কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ব্রহ্মপুত্রে চীনের বাঁধ নির্মাণ এবং মেকং নদীর অভিজ্ঞতার আলোকে তিস্তায় চীনের ভূমিকা “পানিবোমার” ঝুঁকি তৈরি করতে পারে, যা আসাম, অরুণাচল ও বাংলাদেশে বন্যার কারণ হতে পারে। 


এদিকে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সহযোগিতা “কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয়” এবং তৃতীয় পক্ষের প্রভাবে প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়। বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রথম পর্যায় ২০২৬ সালে শুরু হয়ে ২০২৯ সালে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। প্রকল্পে নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ, সেচ সুবিধা সম্প্রসারণ, নদী বন্দর ও সড়ক নেটওয়ার্ক অন্তর্ভুক্ত। চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পাওয়ার চায়না ইতোমধ্যে লালমনিরহাট, রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধাসহ তিস্তাপাড়ের জেলাগুলোতে মাঠপর্যায়ে সমীক্ষা শুরু করেছে। 


ভারত জানিয়েছে, ৫৪টি অভিন্ন নদীর পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে কাঠামোবদ্ধ আলোচনা চলছে এবং তিস্তা চুক্তি ঝুলে আছে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আপত্তির কারণে। ১৯৮৩ সালের অস্থায়ী সমঝোতায় ভারত ৩৯ শতাংশ ও বাংলাদেশ ৩৬ শতাংশ পানি পাওয়ার কথা থাকলেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। ২০১১ সালে প্রায় চূড়ান্ত হওয়া খসড়ায় বাংলাদেশের জন্য ৩৭.৫ শতাংশ বরাদ্দের প্রস্তাব ছিল। 


বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যুদ্ধবিমান ক্রয় ও তিস্তা প্রকল্প—দুটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের চীন-নির্ভরতা বাড়লে দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ভারসাম্যে পরিবর্তন আসবে। ভারতের পার্লামেন্টারি স্ট্যান্ডিং কমিটি অন এক্সটার্নাল অ্যাফেয়ার্স “বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ভবিষ্যৎ” নিয়ে বৈঠক ডেকেছে, যেখানে চীনের ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি আলোচনার মূল বিষয়। তবে বাংলাদেশ সরকার বলছে, এসব সিদ্ধান্ত সার্বভৌম এবং জাতীয় স্বার্থেই নেওয়া হচ্ছে। 


সম্পর্কিত খবর

;