হরমুজ-লেবানন ইস্যুতে সমাধান

সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠকে অগ্রগতি

প্রকাশ : 22 Jun 2026
সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান বৈঠকে অগ্রগতি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে প্রথম দফার উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা ‘উৎসাহব্যঞ্জক অগ্রগতির’ মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে বলে জানিয়েছে মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তান। সোমবার দেওয়া এক যৌথ বিবৃতিতে দুই দেশ জানায়, একটি উচ্চ পর্যায়ের কমিটি ৬০ দিনের মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য একটি রূপরেখায় সম্মত হয়েছে। কারিগরি আলোচনা সপ্তাহজুড়ে চলবে। 


গত সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে প্রাথমিক সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর রবিবার সুইজারল্যান্ডে এ আলোচনা শুরু হয়। মার্কিন প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স, বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাতা জ্যারেড কুশনার। ইরানের পক্ষে নেতৃত্ব দেন পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। 


আলোচনার শুরুটা ছিল উত্তেজনাপূর্ণ। বৈঠক শুরুর ঠিক আগে ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ড জানায়, লেবাননে ইসরায়েলি হামলার প্রতিক্রিয়ায় তারা হরমুজ প্রণালী আবারও বন্ধ করেছে। একই সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ট্রুথ সোশ্যালে হুমকি দেন, লেবাননে ইরানের প্রক্সিদের বিশৃঙ্খলা অবিলম্বে বন্ধ না করলে ওয়াশিংটন ইরানে গত সপ্তাহের চেয়েও বিধ্বংসী সামরিক হামলা চালাবে। তিনি হরমুজ প্রণালীতে মার্কিন টোল বসানোর হুমকিও দেন। 


ট্রাম্পের এই পোস্ট ভেন্যুতে পৌঁছানোর পর তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে আলোচনার টেবিল ছেড়ে সাময়িক ওয়াকআউট করে ইরানি প্রতিনিধিদল। পরে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পর্দার আড়ালে যোগাযোগ চালিয়ে যায় তেহরান। মধ্যস্থতাকারীরা জানিয়েছে, আলোচনা একেবারে ভেঙে যায়নি, বরং এটিকে ‘সাময়িক বিরতি’ হিসেবে দেখা হচ্ছে। 


ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ ট্রাম্পের হুমকির কড়া জবাব দেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আমেরিকার হুমকিকে গুরুত্ব দিই না। ওয়াশিংটনের উচিত তাদের বক্তব্যের বিষয়ে সতর্ক থাকা। আমাদের সশস্ত্র বাহিনী অন্যভাবে জবাব দেওয়ার জন্য প্রস্তুত।’ একই সঙ্গে তিনি জানান, হুমকির মুখে কোনো আলোচনা হবে না। 


মধ্যস্থতাকারীদের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়, হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে এবং কোনো ঘটনা বা ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে একটি ‘যোগাযোগ ব্যবস্থা’ তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে লেবাননসহ ‘সকল রণাঙ্গনে’ সামরিক অভিযান বন্ধের লক্ষ্যে একটি ব্যবস্থা গঠনে দুই পক্ষ সম্মত হয়েছে। 


মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, আলোচনায় পারমাণবিক চুক্তির ‘উপাদানগুলো’ এবং লেবানন যুদ্ধবিরতি ইস্যুতে অগ্রগতি হয়েছে। তিনি জানান, ‘আজকের এই কাজকে ভবিষ্যতে চলমান কারিগরি আলোচনার জন্য একটি সূচনা বিন্দু হিসেবে’ ব্যবহার করবে উভয় প্রতিনিধিদল। 


ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি জানিয়েছেন, আলোচনায় তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানিতে ছাড়, কিছু অবরুদ্ধ সম্পদ মুক্তি এবং ইরানের জন্য পুনর্গঠন ও উন্নয়ন পরিকল্পনা চালুর বিষয়ে অগ্রগতি হয়েছে। 


তবে আলোচনার মধ্যেই জটিলতা তৈরি করেছে ইসরায়েলের অবস্থান। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ঘোষণা দিয়েছেন, সুইজারল্যান্ডে যাই হোক না কেন, দক্ষিণ লেবানন থেকে সেনা সরাবে না তেল আবিব। গত সপ্তাহের প্রাথমিক চুক্তিতে লেবাননসহ ‘সকল রণাঙ্গনে’ যুদ্ধবিরতি এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। কিন্তু এরপর দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলি বাহিনীর মধ্যে লড়াই তীব্রতর হয়েছে।


মধ্যস্থতাকারী কাতার ও পাকিস্তান জানিয়েছে, ৬০ দিনের বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ উন্মুক্ত করা, লেবানন যুদ্ধবিরতি কার্যকর এবং ইরানের অবরুদ্ধ বিলিয়ন ডলারের বৈশ্বিক সম্পদ মুক্ত করার মতো জটিল শর্তগুলোর বাস্তবায়ন এখন তাদের মধ্যস্থতার সফলতার ওপরই নির্ভর করছে। 


সুইজারল্যান্ডের বুর্গেনস্টক রিসোর্টে চলমান কারিগরি আলোচনায় ইরানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও তেল মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারাও অংশ নিচ্ছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং কাতারের প্রধানমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ বিন আবদুলরহমান বিন জসিম আল থানিও আলোচনায় যুক্ত রয়েছেন। 


সম্পর্কিত খবর

;