সাঈদীর মামলার বাদী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যু, গোপনে গার্ড অব অনার

প্রকাশ : 24 Oct 2026
সাঈদীর মামলার বাদী বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারীর মৃত্যু, গোপনে গার্ড অব অনার



বরিশাল অফিস: মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় প্রয়াত জামায়াত নেতা মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরকারী বাদী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মানিক পশারী (৮৭) মারা গেছেন। শনিবার সকাল ১০টার দিকে গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় মেয়ের বাড়িতে তার মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর পিরোজপুরে তার মরদেহ পৌঁছালে রাষ্ট্রীয় গার্ড অব অনার প্রদান ও দাফন নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়। পরে জেলা পুলিশ লাইন্সের ভেতরে গোপনে তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়। 


মানিক পশারী পিরোজপুর সদর উপজেলার শংকরপাশা ইউনিয়নের চিতলিয়া গ্রামের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা ছিলেন। তিনি একজন গেজেটভুক্ত বীর মুক্তিযোদ্ধা। পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে তিনি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া এলাকায় মেয়ে জামাইয়ের কাছে আশ্রয় নিয়েছিলেন এবং গত দুই মাস ধরে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতায় ভুগছিলেন। 


শনিবার দুপুর ১২টার দিকে মরদেহ পিরোজপুর সদর উপজেলা পরিষদ চত্বরে নিয়ে আসা হলে সেখানে গার্ড অব অনার দেওয়ার আয়োজন করা হয়। কিন্তু এ খবর ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মী ও সমর্থকেরা সেখানে জড়ো হয়ে গার্ড অব অনার দিতে এবং পিরোজপুরে দাফন করতে বাধা দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সূত্র জানায়, সকাল ১১টার দিকে পিরোজপুর শহর অতিক্রমের সময় মরদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্স আটকানোর চেষ্টা করা হয় এবং চিতলিয়া গ্রামে দাফনের জন্য খোঁড়া কবর ভরাট করে এলাকা ঘিরে রাখা হয়। 


পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ মরদেহটি পুলিশ পাহারায় পিরোজপুর জেলা পুলিশ লাইন্সে নিয়ে যায়। সেখানে বিকেল ৫টার দিকে গোপনে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়ার পর মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। তবে শনিবার রাত ৮টা পর্যন্ত পাওয়া খবরে দাফন কোথায় সম্পন্ন হবে তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। পুলিশ লাইন্স থেকে গ্রামমুখী বিভিন্ন সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে জামায়াত সমর্থকদের অবস্থান নেওয়ার খবর পাওয়া গেছে। 


মানিক পশারীর মেয়ে জামাই ফারুক হোসেন বলেন, সকাল ১০টায় মৃত্যুর পর দুপুর ১২টায় তারা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে এলে গার্ড অব অনারের কথা বলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত তাদের দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, একজন গেজেটেড মুক্তিযোদ্ধা হওয়া সত্ত্বেও সাধারণ অ্যাম্বুলেন্সে কোনো বরফ ছাড়া ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা রাখার পর কোনোমতে গোপনে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে এবং দাফনের বিষয়ে প্রশাসন কোনো দায়িত্ব নেয়নি। এতে পরিবার দাফন নিয়ে চরম উদ্বেগের মধ্যে রয়েছে। 


এ বিষয়ে পিরোজপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি আব্দুর রাজ্জাক বলেন, মানিক পশারী একজন ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা। তাকে কোনোভাবেই গার্ড অব অনার দিতে দেওয়া হবে না এবং পিরোজপুরের মাটিতে তার মরদেহ দাফন করতে দেওয়া হবে না। অন্যদিকে পাড়েরহাট ইউনিয়ন জামায়াতের সেক্রেটারি জালাল হোসেন বলেন, সাঈদীর বিরুদ্ধে মামলায় সাক্ষী দেওয়ার কারণে স্থানীয়রা তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে দাফন করতে দিতে চায় না। 


পিরোজপুর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. শরিফুল ইসলাম বলেন, মানিক পশারীকে গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে এবং এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। পিরোজপুর সদর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. ইফতেখারুল ইসলাম শামীম বলেন, রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় গার্ড অব অনার দেওয়া হয়েছে। পিরোজপুরের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তালেবুর রহমান জানান, জানাজা ও দাফনের বিষয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় সতর্ক দৃষ্টি রাখা হচ্ছে এবং দাফনের স্থান নিয়ে জেলা প্রশাসন ও পুলিশ আলোচনা করছে। 


উল্লেখ্য, মানিক পশারী ২০০৯ সালের ১২ আগস্ট পিরোজপুর থানায় দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীসহ পাঁচজনের বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালের মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা করেন। পরবর্তীতে মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমে মূল মামলা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং এতে তিনি ৬ নম্বর সাক্ষী ছিলেন। এই মামলায় ট্রাইব্যুনাল ২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি সাঈদীকে মৃত্যুদণ্ড দেন, ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ তা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদণ্ড দেন। কারাবন্দী অবস্থায় ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট সাঈদী মারা যান। 


সম্পর্কিত খবর

;