আক্ষেপ-হতাশার সুরে বইমেলার বিদায়

প্রকাশ : 28 Feb 2025
আক্ষেপ-হতাশার সুরে বইমেলার বিদায়


স্টাফ রিপোর্টার ।। ’৫২-র ভাষা আন্দোলনের চেতনায় বইপ্রেমীদের মহোৎসব অমর একুশে বইমেলা ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে লেখক-পাঠক ও প্রকাশকদের মিলনমেলা। ফি বছর নতুন বইয়ের ঘ্রাণে লেখক-পাঠক ও প্রকাশকদের মনে যে ধরণের উচ্ছ্বাস-উন্মাদনা লক্ষ্য করা গেছে, এবার তেমনা দেখা যায়নি। কেবল ছিল উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর আক্ষেপ-হতাশার সুর। সে সুরেই গতকাল শুক্রবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) বিদায় নিল বইমেলা-২০২৫।

এবছর শুরু থেকেই বইমেলাকে ঘিরে মানুষের মধ্যে উৎসাহ কম পরিলক্ষিত হয়েছে। মেলার ভেতরে ঘটা পর পর কয়েকটি অঘটন সে উৎসাহকে আরো ম্লান করে দেয়। শেষ দিন পর্যন্ত লেখক ও প্রকাশকদের আক্ষেপ আর হতাশা প্রকাশ করতে দেখা দেখা গেছে। গত বছরের তুলনায় এ বছর বই প্রকাশের সংখ্যা যেমন কমেছে, তেমনি বিক্রিও কমেছে ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ। বাংলা একাডেমির তথ্যমতে  এবারের বইমেলায় নতুন বই এসেছে ৩ হাজার ২’শ ৯৯টি, যা গত বছর ছিল ৩ হাজার  ৭’শ ৫১টি। গত বছরের তুলনায় ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত খোদ বাংলা একাডেমির বই বিক্রি কমেছে ৭৪ লাখ ৩৪ হাজার ৪০৭ টাকা।

বইমেলায় লেখক ও প্রকাশক উভয় আক্ষেপ এবং হতাশা প্রকাশ করেছেন। অনেক লেখক বই মেলাতেই আসেন নাই। যারা এসেছেন তাদের মুখেও হতাশার ছাপ দেখা গেছে।  

বইমেলায় মব চলার কথা উল্লেখ করে কবি নাসির আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, "নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে আমি বইমেলায় যাই নি। যেভাবে মব চলছে, তাতে বারবার নিরাপত্তার অভাবের কথাই মনে হয়েছে। ”

নিয়মিত বইমেলায় থাকা মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মোহিত কামাল বলেন, "এবারের বইমেলাটি আমার কাছে বেশ হতাশার ছিল। কারণ, মানুষের সমাগম যেমন কম ছিল, তেমনি বিক্রি ছিল তার চেয়েও কম। মানুষের বই কেনার আগ্রহ কমে যাওয়া লেখকদের জন্য খুব হতাশার।”

হতাশার সুর ব্যক্ত করেছেন প্রকাশকরাও। তাদের মতে এবারের বইমেলায় বেচাবিক্রি কম ছিল। বইও কম প্রকাশিত হয়েছে।

বইমেলায় তসলিমা নাসরিনের বই বিক্রির কারণে ১০ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় সব্যসাচী প্রকাশনীর স্টলে হামলার ঘটনায় সকলেই হতভম্ব হয়েছেন। বইমেলার ভেতরে হামলার ঘটনা এর আগে যেমন ঘটেনি, তেমনি হামলার প্রতিবাদে ভেতরে বিক্ষোভও হয়নি। কিন্তু এবার হয়েছে। ‘বইমেলার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে', ‘বইমেলায় হামলা কেন, ইন্টেরিম জবাব দাও', ‘মবতন্ত্রের আস্তানা, বাংলাদেশে হবে না', ‘অভিজিৎ, দীপন, লাগবে আর কতজন'-খোদ বইমেলার ভেতরে এমন শ্লোগান এর আগে হয়েছে কিনা তা অনেকেই বলতে পারেন না।

সবমিলিয়ে আক্ষেপ হতাশার সুরে বিদায় নেওয়া অমর একুশে বইমেলা-২০২৫ এর সমাপণী আয়োজন হয় বাংলা একাডেমির মূলমঞ্চে। বিকেল ৫টায় সমাপণী অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৫’-এর সদস্য-সচিব ড. সরকার আমিন। প্রধান অতিথি ছিলেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মোঃ মফিদুর রহমান। সভাপতিত্ব করেন বাংলা একাডেমির সভাপতি অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। 

এবারের বইমেলার সমাপণী আয়োজনে ‘কবি জসীমউদ্দীন সাহিত্য পুরস্কার ২০২৫’ পেয়েছেন- কবি আল মুজাহিদী এবং ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ সাহিত্য পুরস্কার ২০২৪’ পেয়েছেন অধ্যাপক হান্স হার্ডার ও কথাশিল্পী বর্ণালী সাহা।

এবার বাংলা একাডেমি পরিচালিত চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার, মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার, রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার এবং শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করা হয়। ২০২৪ সালে প্রকাশিত বিষয় ও গুণমানসম্মত সর্বাধিক সংখ্যক বই প্রকাশের জন্য ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার ২০২৫’ পেয়েছে প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান কথাপ্রকাশ

২০২৪ সালে প্রকাশিত গুণমান ও শৈল্পিক বিচারে সেরা বইয়ের জন্য যৌথভাবে ‘মুনীর চৌধুরী স্মৃতি পুরস্কার ২০২৫’ পেয়েছে পাঠক সমাবেশ এবং কথাপ্রকাশ। এছাড়া ২০২৪ সালে গুণমান বিচারে সর্বাধিক সংখ্যক শিশুতোষ বই প্রকাশের জন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ‘কাকাতুয়া’ পেয়েছে ‘রোকনুজ্জামান খান দাদাভাই স্মৃতি পুরস্কার ২০২৫’।

নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়ে শেষ হওয়া এবারের বইমেলা থেকে লেখক-পাঠক, প্রকাশক ও সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা বইমেলা হয়ে উঠুক বাঙ্গালির প্রাণের মেলা, ঐতিহ্য-সংস্কৃতি ও একুশের চেতনায় প্রাণের উৎসবের মিলনমেলা।

সম্পর্কিত খবর

;