বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয়: অস্তিত্ব সংকটে মানুষ ও প্রকৃতি

প্রকাশ : 14 Sep 2025
বাংলাদেশের পরিবেশ বিপর্যয়: অস্তিত্ব সংকটে মানুষ ও প্রকৃতি

কামরুল ইসলাম: বাংলাদেশ এক সময় নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। সবুজ বন-জঙ্গল, মাটির উর্বরতা, এবং নদী-কেন্দ্রিক জীবনধারা দেশের প্রকৃতিকে দিয়েছে ভিন্ন সৌন্দর্য ও সমৃদ্ধি। কিন্তু বর্তমানে বিশ্ব জলবায়ু পরিবর্তন ও অভ্যন্তরীণ অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে দেশটি ভয়াবহ পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখোমুখি। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে, নদী দখল-দূষণে মৃতপ্রায়, বন উজাড় হচ্ছে লাগামহীনভাবে, আর দূষণে মানুষের জীবন হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ।


বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরীর তালিকায় প্রায়শই শীর্ষে অবস্থান করছে ঢাকা। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীর বাতাসে PM2.5 ও PM10 কণার মাত্রা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) নিরাপদ সীমার কয়েকগুণ বেশি। এর ফলে শ্বাসকষ্ট, ফুসফুসের ক্যান্সার, হাঁপানি, হৃদরোগসহ নানান জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন লাখ লাখ মানুষ। চিকিৎসকদের মতে, কেবলমাত্র বায়ুদূষণের কারণে প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষের অকালমৃত্যু ঘটছে।


বাংলাদেশের প্রায় সব নদীই এখন মারাত্মক সংকটে। রাজধানীর বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, শীতলক্ষ্যা, বালু নদী থেকে শুরু করে গ্রামীণ এলাকার ছোট নদীগুলো দখল ও শিল্পবর্জ্যে মৃতপ্রায়। নৌযান চলাচল কমেছে, মৎস্য সম্পদ ধ্বংসের পথে। পানি বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্পকারখানার অনিয়ন্ত্রিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দখলবাজদের দৌরাত্ম্যে নদীগুলো ধ্বংস হচ্ছে।


একই সঙ্গে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যাচ্ছে। কৃষিকাজ ও নগরায়ণের চাপ বাড়ায় পরিষ্কার পানির ঘাটতি তীব্র আকার ধারণ করছে।


দেশের এক সময়কার সবুজ বনভূমি আজ মারাত্মকভাবে হুমকির মুখে। বন বিভাগ জানিয়েছে, গত কয়েক দশকে দেশের মোট বনভূমির উল্লেখযোগ্য অংশ উজাড় হয়েছে। চট্টগ্রাম, সিলেট ও সুন্দরবন অঞ্চলে অবৈধ কাঠ ব্যবসায়ী ও দখলবাজদের কারণে প্রতিনিয়ত কমছে বনাঞ্চল।


এছাড়া, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবনও ভেঙে পড়ছে। ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততার বিস্তার এবং নদীর ভাঙনে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন আজ বিপন্ন। এর ফলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ বহু প্রাণী ও উদ্ভিদ প্রজাতি বিলুপ্তির পথে।


বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও ঘূর্ণিঝড়ের তীব্রতা বেড়ে যাওয়ায় উপকূলীয় অঞ্চলের লক্ষ লক্ষ মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। পটুয়াখালী, ভোলা, সাতক্ষীরা, খুলনা অঞ্চলে লবণাক্ততার কারণে কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক কৃষক তাদের জমি ফেলে রেখে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।


জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী কয়েক দশকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা যদি অব্যাহতভাবে বাড়তে থাকে, তবে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের বড় অংশ পানির নিচে তলিয়ে যেতে পারে।


বাংলাদেশে প্লাস্টিক ব্যবহার অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। পরিবেশবাদীদের মতে, প্রতি বছর প্রায় ৮ লাখ টন প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার বড় অংশই নদী-খাল-জলাশয়ে গিয়ে পড়ে। এর ফলে মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ছে।


একই সঙ্গে শহরাঞ্চলে সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার অভাব একটি বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে। সড়কের পাশে, খাল ও ড্রেনে জমে থাকা আবর্জনা শুধু পরিবেশ দূষণ করছে না, বরং ডেঙ্গু-ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগও বাড়াচ্ছে।


পরিবেশবিদরা মনে করেন, রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব ও দুর্নীতি বাংলাদেশের পরিবেশ সংকটকে গভীরতর করছে। সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর আইন প্রয়োগ ও গণসচেতনতা ছাড়া এই বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব নয়।


ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এক অধ্যাপক বলেন,

"বাংলাদেশকে যদি টিকে থাকতে হয়, তবে এখনই পরিবেশ রক্ষায় বড় উদ্যোগ নিতে হবে। নদী উদ্ধার, বন সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার নিশ্চিত না করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য ভয়াবহ পরিস্থিতি অপেক্ষা করছে।


বাংলাদেশের পরিবেশ আজ এক কঠিন সঙ্কটে দাঁড়িয়ে। প্রকৃতি ধ্বংস হলে মানুষও বাঁচতে পারবে না—এ সত্য সবাই জানে, কিন্তু বাস্তবে কার্যকর উদ্যোগের অভাব দেশকে ধীরে ধীরে মৃত্যুকূপে ঠেলে দিচ্ছে। এখনই যদি রাষ্ট্র, নাগরিক সমাজ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় একসাথে পরিবেশ রক্ষায় এগিয়ে না আসে, তবে আগামী প্রজন্মের জন্য এই দেশ একটি “অধিবাসহীন বিপর্যস্ত ভূমি” হয়ে পড়তে পারে।

সম্পর্কিত খবর

;