শরিফুল ইসলাম: জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন ক্রমশ ভাঙনের মুখে পড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার প্রসার, ঘূর্ণিঝড়ের ঘনঘটা এবং জীববৈচিত্র্যের দ্রুত ক্ষয়-সব মিলিয়ে বনটি আজ অস্তিত্ব সংকটে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে চলতে থাকলে আগামী শতাব্দীর মধ্যেই সুন্দরবনের বড় অংশ বিলীন হয়ে যেতে পারে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম-সম্পাদক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সুন্দরবন কেবল বাঘ-হরিণ বা গাছপালার আবাসস্থল নয়, এটি আসলে উপকূলীয় এলাকার প্রাকৃতিক বর্ম। প্রতিবার ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার সময় এই বন কোটি মানুষের জীবন বাঁচায়। যদি এ বন ধ্বংস হয়, পুরো দক্ষিণাঞ্চল ঝুঁকির মুখে পড়বে।”
লবণাক্ততার দাপটে বনজ উদ্ভিদ শুকিয়ে যাচ্ছে
পরিবেশবিদরা জানাচ্ছেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার কারণে সুন্দরবনের ভেতরে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ মারাত্মক আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে সুন্দরী গাছ, যা বনটির নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে, সেটি ‘টপ-ডাই ব্যাক’ রোগে আক্রান্ত হয়ে ব্যাপক হারে মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া গেওয়া, পশুর, গরানসহ অন্যান্য লবণ-সংবেদনশীল বৃক্ষও ধীরে ধীরে শুকিয়ে যাচ্ছে। বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, গত ৩০ বছরে সুন্দরী গাছের পরিমাণ অন্তত ২০ শতাংশ কমেছে।
সুন্দরবন কেবল গাছের বন নয়; এটি রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রধান আবাসস্থল। পাশাপাশি হরিণ, বানর, কুমির, ডলফিনসহ অসংখ্য প্রজাতির প্রাণী ও পাখিরও বাস এখানে। কিন্তু জলবায়ুর প্রভাবে খাদ্যচক্রে পরিবর্তন আসায় এসব প্রাণীর বেঁচে থাকা কঠিন হয়ে উঠছে। বাঘের খাদ্য চিত্রা হরিণের সংখ্যা কমছে, আর মিঠাপানির মাছ হ্রাস পাওয়ায় কুমির ও ডলফিন বিপদে পড়ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. নাজমুল হক বলেন, “একসময় সুন্দরবনে প্রায় ৫ লাখ হরিণ ছিল বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু এখন সংখ্যা অর্ধেকে নেমে এসেছে। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত পরিবেশগত সংকট এ প্রাণী বৈচিত্র্যকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে।”
ঘূর্ণিঝড় সিডর (২০০৭), আইলা (২০০৯) ও আম্পান (২০২০)-এর ভয়াবহ ক্ষত এখনও সুন্দরবনের ভেতরে স্পষ্ট। এসব ঘূর্ণিঝড়ে লক্ষাধিক গাছ উপড়ে যায়, অগণিত প্রাণী মারা পড়ে। স্থানীয় জেলেরা জানান, ঝড়ের পর নদীতে মাছ কমে গেছে, মধুশিকারিরা মধু পাচ্ছেন না, বন থেকে কাঠও আর আগের মতো সংগ্রহ করা যায় না। ফলে তাদের জীবিকা সংকটে পড়ছে।
খুলনার দাকোপ উপজেলার জেলে হাফিজুর রহমান বলেন, “আগে মাছ ধরতে বনে ঢুকলে দিনে দুই-তিন মণ মাছ পাওয়া যেত। এখন এক মণও পাওয়া যায় না। লবণাক্ত পানির কারণে মাছ পালিয়ে গেছে।”
জাতিসংঘের আন্তঃসরকারি প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি) জানিয়েছে, ২১০০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা আরও এক মিটার বেড়ে গেলে সুন্দরবনের অন্তত ৩০ শতাংশ এলাকা ডুবে যেতে পারে। এ কারণে আন্তর্জাতিক জলবায়ু তহবিল থেকে অভিযোজন খাতে অর্থ বরাদ্দ বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকায় নিযুক্ত জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)-এর আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফানি জোনস বলেন, “সুন্দরবন বৈশ্বিক সম্পদ। এটিকে রক্ষা করা কেবল বাংলাদেশের দায়িত্ব নয়, বরং বিশ্বের দায়িত্ব। জলবায়ু অভিযোজনের অর্থায়নে উন্নত দেশগুলোকে এগিয়ে আসতেই হবে।”
বাংলাদেশের পরিবেশবাদীরা বলছেন, সুন্দরবন রক্ষায় সরকারকে বহুমুখী পদক্ষেপ নিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
উপকূলীয় এলাকায় লবণ সহনশীল গাছ লাগানো। বিকল্প জীবিকা নিশ্চিত করে বননির্ভরতা কমানো। জলবায়ু পরিবর্তন অভিযোজন প্রকল্পে আন্তর্জাতিক অর্থায়ন বাড়ানো। বনাঞ্চলে অবৈধ দখল, শিকার ও কাঠ সংগ্রহ বন্ধ করা।
পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. কামরুল হাসান বলেন, “আমরা সুন্দরবন রক্ষায় বেশ কিছু অভিযোজন প্রকল্প হাতে নিয়েছি। এর মধ্যে রয়েছে কৃত্রিম বাঁধ নির্মাণ, লবণাক্ততা প্রতিরোধক ব্যবস্থা, এবং বনায়ন কার্যক্রম। তবে আন্তর্জাতিক সহায়তা ছাড়া এ বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব নয়।”
সুন্দরবন রক্ষা মানে শুধু একটি বন সংরক্ষণ নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার কোটি মানুষের জীবন-জীবিকা ও পরিবেশ সুরক্ষার প্রতীক। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতিগুলো দ্রুত বাস্তবায়ন না হলে, সুন্দরবনের মতো মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ বিলীন হয়ে যাবে-আর তার পরিণতি হবে ভয়াবহ।
স্টাফ রিপোর্টার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও দেশের আইনি কাঠামোর ধারাবাহিকতা রক্ষায় স্বল্প সময়ের মধ্যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ নিষ ...
স্টাফ রিপোর্টার: বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পীকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম, এমপি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের নবনির্বাচিত সংসদ-সদস্য মোঃ রেজাউল করিম বাদশা (৪১ বগুড়া-৬) ও মোঃ মাহমুদুল হক রুবেল ( ...
ডেস্ক রিপোর্ট: রাজধানীর সাংস্কৃতিক অঙ্গন বেইলি রোডের নাটকপাড়ায় শিশুতোষ নাটক উপভোগ করতে পরিবারসহ উপস্থিত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার (১১ এপ্রিল) সন্ধ্যায় তিনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে নাট ...
স্টাফ রিপোর্টার: যুদ্ধবিরতি হলেও বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট সহজে কাটবে না—এমন সতর্কবার্তা দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান। তিনি মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতের প্রভাব বিশ্বজুড় ...
সব মন্তব্য
No Comments