৬৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী এক হাজার শিপ হ্যান্ডলিং এবং ভিশন-২১ বাস্তবায়নে মোংলা বন্দরের প্রস্তুতি

মোংলা থেকে মোঃ নূর আলমঃ ১৯৫০ সালের ০১ ডিসেম্বর গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে শুরু হয় মোংলা বন্দরের যাত্রা। ১৯৫১ সালের ১১ ডিসেম্বর মোংলার জয়মনিরঘোলের পশুর নদীতে প্রথম ব্রিটিশ মার্চেন্ট শীপ ”সিটি অব লিয়ন্স” প্রবেশ এবং নোঙ্গর করে। ১৯৫১ সালের ১৭ মার্চ মোংলা বন্দরে প্রথম কার্গো হ্যান্ডলিং হয়। শুরুতে চালনা বন্দর নামে যাত্রা শুরু করে এবং একজন ডিরেক্টরেট’র মাধ্যমে এটি পরিচালিত হতে থাকে। উপযুক্ত স্থান নির্বাচনের জন্য পরবর্তীতে ব্রিটিশ নাগরিক স্যার ক্লাউড’র গবেষণা জরিপের মাধ্যমে ১৯৫৪ সালে মোংলা নালা এবং পশুর নদীর মোহনায় জাহাজ নোঙ্গর করার জন্য সুপারিশ করা হয়। ১৯৭৮ সালে নৌপরিবহন মন্ত্রনালয়ের অধীন ”চালনা বন্দর কর্তৃপক্ষ” নামকরন করা হয় এবং মোংলাতে স্থায়ী বন্দর সুবিধাসহ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করার জন্য ৫টি জেটি নির্মান করা হয়। অবশেষে ৮ মার্চ ১৯৮৭ ”মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ’ নামকরন করে পরিপূর্ণ ভাবে যাত্রা শুরু করে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দবরন দ্বারা আবৃত ইকো-ফ্রেন্ড মোংলা সমুদ্র বন্দর।
কাল বৃহস্পতিবার ৬৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ দিনব্যাপী নানা কর্মসুচি হাতে নিয়েছে। যেসব কর্মসূচি নেয়া হয়েছে তা হলো দিবসের প্রথম প্রহরে বন্দরে অবস্থানরত সকল দেশী-বিদেশী জাহাজে এক মিনিট বিরতিহীন হুইসেল বাজানো, সূর্য্যােদয়ের সাথে সাথে জাতীয় পতাকা উত্তোলন, র‌্যালী, ভলিবল প্রতিযোগিতা, গণমাধ্যম কর্মীদের সাথে মতবিনিময়, কেককাটা, আলোচনা সভা ,প্রীতিভোজ ও দোয়া-মোনাজাত এবং সবশেষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি থাকবেন তালুকদার আব্দুল খালেক এমপি এবং বিশেষ অতিথি থাকবেন নৌ-পরিবহন মন্ত্রনালয়ের সচিব অশোক মাধব রায়।
নানা চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মোংলা বন্দর আজ একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ৬৬তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উদযাপন করছে। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বন্দর লাভ করেছে ৬৪ কোটি ৪০ লক্ষ টাকা। আগামী দিনের ভিশন-মিশন উল্লেখ করে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে ২০২১ সালের মধ্যে বছরে ১ হাজার শিপ হ্যান্ডলিং এবং সরকার প্রধান ঘোষিত ভিশন ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ ও ২০৪১ সালে উন্নত দেশে পরিণত করার জন্য মোংলা বন্দর যথাযথ ভূমিকা রাখবে। সেই প্রস্তুতি নিয়েই মোংলা বন্দর এগুচ্ছে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। বন্দর ব্যবহারকারী এবং শিপিং এজেন্টরা বলছেন সরকারের আন্তরিকতার কারনে বন্দর আজ লাভজন প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। তবে পশুর নদীর আউটার বার ড্রেজিং অব্যাহত, নেভিগেশন লাইট স্থাপন, পাইলট নিয়োগ করে আশু সমস্যার সমাধান করলে মোংলা বন্দর লাভজন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেশের মধ্যে রোল মডেল হয়ে উঠবে। অন্যদিকে বন্দর শ্রমিকরা নেতারা বলছেন যাদের হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমে বন্দর এই পর্যায়ে তাদের জন্য কল্যামূলক কোন কর্মকান্ড নেই এবং তারা মনবেতর জীবন-যাপন করছেন।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এ্যাডমিরাল রিয়াজ উদ্দিন আহমেদ জানান প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী বাৎসরিক প্রোগ্রাম, আনুষ্ঠানিকতা, একটা উৎসব। ভিশন-মিশন জানতে চ্ওায়া হলে বলবো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ করার যে রূপকল্প তা বাস্তবায়নে মোংলা বন্দরকে সাজাচ্ছি। এই মুহুর্তে রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নে জন্য মোংলা বন্দরের যে ভূমিকা রাখা দরকার সেটা যথাযথ ভাবে পালন করতে পারবো। সেই প্রস্তুতি নিয়ে আমরা এগুচ্ছি।
মোংলা বন্দর ব্যবহারকারী খুলনা চেম্বার অব কমার্স’র সদস এইচ এম দুলাল বলেন মোংলা বন্দর ১ ডিসেম্বর ৬৬ বছরে পদার্পন করতে যাচ্ছে। বিভিন্ন চড়াই-উতরাই পেরিয়ে মোংলা বন্দর আজ একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। বর্তমান সরকারের আন্তরিকতায় লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপ নেয়ায় এটা বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ। আমাদের এ অঞ্চলের মানুষ খেয়ে-পরে সচ্ছল হচ্ছে মোংলা বন্দরের মাধ্যমে। ড্রেজিং অব্যাহত এবং কিছু যন্ত্রপাতি ক্রয় করলে মোংলা বন্দর লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশের কাছে রোল মডেল হয়ে থাকবে।
অলসীজ শিপিং এজেন্ট’র সাখ্ওায়াত হোসেন মিলন বলেন পদ্মা সেতু, বিমান বন্দর এবং সরকারের উন্নয়নের জন্য মোংলা বন্দরের গতিশীলতা বৃদ্ধি পেয়েছে। যতদ্রুত সম্ভব মোংলা বন্দরের আউটার বার ড্রেজিং, বয়া নেভিগেশনাল লাইট স্থাপন এবং পাইলট সংকট দুর করে মোংলা বন্দর যেন আরো গতিশীল হয় এটাই প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীর প্রত্যাশা।
মোংলা বন্দরের শ্রমিক নেতা মাহবুবুর রহমান মানিক বলেন যাদের হাড় ভাঙ্গা পরিশ্রমে মোংলা বন্দর এই পর্যায়ে এসেছে এই প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীতে মূলত তাদের জন্য কিছু নেই। এই প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী উপলক্ষ্যে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের কিছু বিলাসী কর্মকান্ড হয় যা দরিদ্র জনগোষ্ঠির কোন কল্যানে আসে না। বর্তমানে শ্রমিকরা মানবেতর জীবন-যাপন করছে। শ্রমিকদের ঝুঁকিপূর্ণ যাতায়াত এবং শ্রমিকদের জন্য কল্যানমূলক কর্মকান্ড নেই।
২০১৫-১৬ অর্থবছরে মোংলা বন্দর জাহাজ হ্যান্ডলিং করেছে ৪শ ৮২টি। যদিও ভিশন হিসেবে বলা হয়েছে ২০২১ সালের মধ্যে ১ হাজার শীপ হ্যান্ডলিং করতে সক্ষম হবে। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষ মনে করছে ২০২১ সাল লাগবে না তার আগেই বছরে ১ হাজার শীপ’র আগমন ঘটবে বন্দরে। ২০১৮ সালের মধ্যে পদ্মা সেতু বাস্তবায়িত হলে মোংলা বন্দরে জাহাজের আগমন বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু বন্দর কর্তৃপক্ষের হিসেব অনুযায়ী আশংকার দিক হচ্ছে আমদানী পন্য’র হ্যান্ডলিং প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পেল্ওে কমে যাচ্ছে রপ্তানী পন্য হ্যান্ডলিং। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে যেখানে ১ লক্ষ ৮শ ৩০ মেঃ টন রপ্তানী পন্য হ্যান্ডলিং সেখাসে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রপ্তানী পন্য হান্ডলিং হয়েছে ৮৭ হাজার ৮শ ৫৭ মেঃ টন। দিনকে দিন এ হার কমছে। এর জন্য অবশ্য রপ্তানীকারকরা কাস্টম্স’র বৈরী আচরন এবং কনটেইনার সংকটকে দায়ী করেছেন।