৬৩ কারাগারে কোনো ডাক্তার নেই, ১১১টি পদ খালি

40

যুগবার্তা ডেস্কঃ কারা কর্তৃপক্ষের হাতে আছে ৬ জন ডাক্তার। কোনো কারাগারে কয়েদির অবস্থা আশঙ্কাজনক হলে সেখানেই ছুটে যান এই ৬ জন ডাক্তারের কোনো ১ জন। ঘুরে ফিরে এই ৬ জন ডাক্তারের কাউকে না কাউকে বদলি করা হয় এক কারাগার থেকে অন্য কারাগারে। চিকিৎসায় বিলম্ব অনেক কয়েদির মৃত্যুর কারণ পর্যন্ত হয়ে দাঁড়ায় বলে জানিয়েছেন কারা কর্তৃপক্ষ। কারাগারগুলোতে কয়েদির সংখ্যা ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা বা কয়েদির তুলনায় ডাক্তারের অনুপাত ভয়াবহ এক দৃশ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।
গত ২৬ এপ্রিলের মধ্যরাতে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ৭০ বছর বয়স্ক কয়েদি জহির উদ্দিন বুকে তীব্র ব্যথা অনুভব করলে কর্তৃপক্ষ তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ কারাগারের অভ্যন্তরে এধরনের রোগির জরুরি চিকিৎসার কোনো ব্যবস্থা নেই। কারাগার রক্ষী মোহাম্মদ শাওন দ্রুত জহির উদ্দিনকে ঢঠকঠ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান রাত দুইটায়। কিন্তু তার আগেই জহির উদ্দিন মারা গেছেন বলে জানান কর্তব্যরত চিকিৎসক।
স্ত্রীকে হত্যার দায়ে ২০০৮ সালে জহির উদ্দিন যাবজ্জীবন কারাদন্ডে দন্ডিত হন। এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে জহিরের ছেলে আনোয়ার হোসেন তার সঙ্গে কাশিমপুর কারাগারে দেখা করতে গেলে ছেলেকে তিনি জানান, চিকিৎসার জন্যে তাকে ঢাকা কারাগারে স্থানান্তর করা হতে পারে। আনোয়ার জানান, গত ২৭ এপ্রিল কারা কর্তৃপক্ষ তার মৃত্যু সংবাদ জানায়।
জহিরের এ ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়। গত দেড়মাসে এধরনের অন্তত ৭টি ঘটনা ঘটেছে। কয়েদিরা গুরুতর অসুস্থ’ হবার পর কারাকর্তৃপক্ষ তাদের দ্রুত হাসপাতালে পাঠালেও তারা মারা গেছেন।
ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র কারা সুপার জাহাঙ্গির কবির জানান, কোনো কয়েদি গুরুতর অসুস্থ’ হলেই তাদের হাসপাতালে পাঠানো হয়। ঢাকা কারাগারে যে ১৭২ শয্যার হাসপাতাল রয়েছে তাতে মাত্র ২ জন ডাক্তার সাড়ে ৩ থেকে ৪’শ রোগিকে চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। প্রতিদিন ১৪০ থেকে ১৫০ জন কয়েদি এ হাসপাতালে ভর্তি হন। জাহাঙ্গির বলেন, এত বিপুল সংখ্যক কয়েদি বা রোগিকে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া কঠিন। মধ্য বা গভীর রাতে কোনো কয়েদি অসুস্থ’ হয়ে উঠলে তার চিকিৎসা দেওয়া আরো কঠিন হয়ে পড়ে।
কারাগারের এক চিকিৎসক বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস বলেন, প্রতিদিন তিনি ১০ থেকে ১৫ জন কয়েদিকে উন্নত চিকিৎসার জন্যে বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠিয়ে থাকেন।
কারাগারে চিকিৎসা ব্যবস্থা সম্পর্কে ইন্সপেক্টর জেনারেল অব প্রিজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সাইদ ইফতেখার উদ্দিন বলেন, দেশের ৬৮টি কারাগারের মধ্যে শুধু মাত্র ৫টি কারাগারে ডাক্তার রয়েছে। এসব কারাগারে ১১১টি ডাক্তারের পদ খালি। কারাগারগুলো থেকে কয়েদিদের বিভিন্ন হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়ার জন্যে ৯টি এ্যাম্বুলেন্স আছে মাত্র।
সিভিল সার্জন উদ্বেগ জানিয়ে বলেন, যেখানে ৬৩টি কারাগারে কোনো ডাক্তার নেই, তাই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা পাঠানো হয়ে থাকে। কোনো কোনো কারাগারে তাও পাঠানো সম্ভব হয় না। তাই গুরুতর অসুস্থ’ কয়েদিকে অন্য সরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়ে থাকে। ডিপ্লোমা নার্সদের উ”চতর পদে নিয়োগের সুযোগ দেওয়ার পর কারাগারগুলোর চিকিৎসা ব্যবস্থায় আরো নাজুক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
আইজি প্রিজন বলেন, অর্থ ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে ইতিমধ্যে কারাগারে ডাক্তার, নার্স ও এ্যাম্বুলেন্সের স্বল্পতা সম্পর্কে জানানো হয়েছে। এখনো কোনো সাড়া মেলেনি। তিনি বলেন, কারাগারে চিকিৎসা অবকাঠামো ও লোকবলের অভাব ছাড়াও কয়েদিরা দীর্ঘদিন সরকারি হাসপাতালে থাকে কারণ কারা কর্তৃপক্ষের কয়েদিদের স্বাস্থ্য পরিস্থিতি সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কোনো সক্ষমতা নেই। তাই যতক্ষণ না সরকারি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কয়েদিকে কারাগারে ফেরত না পাঠায় ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের ফেরত আনা সম্ভব হয় না।
যাদের অর্থ রয়েছে এমন অনেক কয়েদি কারাগারের বদলে হাসপাতালে সময় কাটায় আবার অর্থ নেই এমন কয়েদিরা চিকিৎসার অভাবে মারা যায়। রংপুর কেন্দ্রীয় কারাগারের জেলার আমজাদ হোসেন জানান, ১৮’শ ৪২ জন কয়েদির মধ্যে প্রতিদিন ৫০ থেকে ৬০ জন কয়েদির হাসপাতালে বর্হিবিভাগে চিকিৎসা প্রয়োজন হয়। কিন্তু কারাগারের হাসপাতালে সুযোগ পায় ১৮ থেকে ২০ জন কয়েদি। এ কারাগারে কোনো ডাক্তার নেই। অস্থায়ী ভিত্তিতে একজন ডাক্তারকে সম্প্রতি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কোনো কয়েদির জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে ভরসা করতে হয় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওপর।-আমাদের সময়.কম