৫ জানুয়ারির পরিক্রমা

106

যুগবার্তা ডেস্কঃ ৫ জানুয়ারি ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে জল্পনা কল্পনা। ঢাকায় আগামীকাল বিএনপি ও আওয়ামী লীগ পাল্টাপাল্টি জনসভার কর্মসূচি ঘোষণা করায় নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে।
বিএনপির তরফ থেকে দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, তারা ৫ জানুয়ারিকে এবারও ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে পালন করবেন।
আওয়ামী লীগ এই দিনটিকে ‘গণতন্ত্রের বিজয় দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। শনিবার সন্ধ্যায় দলের আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক আব্দুস সোবহান গোলাপের পাঠানো একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। ১৮টি ¯’ানে সমাবেশের ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগ।
৫ জানুয়ারির করণীয় ঠিক করতে সোমবার রাতে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসছেন বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া।
উল্লেখ্য, গত বছর ৫ জানুয়ারির দিনটিকে ঘিরে ঢাকায় তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। সরকার বিএনপিকে জনসভার অনুমতি না দেয়ায় দলটি টানা অবরোধ কর্মসূচির ডাক দেয়। গত বছর ২৭ ডিসেম্বর বিএনপি গাজীপুরে জনসভার অনুমতি চেয়েছিল কিন্ত সরকার সমাবেশের অনুমতি দেন নি। আর এ থেকেই সংঘাতের সূত্রপাত হয়।
গাজীপুর, ঢাকায়সহ সারাদেশে উত্তেজনার ছড়িয়ে পড়ে। এরপর গাজীপুরে সব ধরনের সভা-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ১৪৪ ধারা জারি করে জেলা প্রশাসন। তখন করণীয় ঠিক করতে বৈঠকে বসে গাজীপুর বিএনপি। বৈঠক শেষে গাজীপুর জেলা বিএনপির সভাপতি ফজলুল হক মিলন গাজীপুরে হরতাল ও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সারাদেশে বিক্ষোভ কর্মসূচির ঘোষণা দেন।
প্রহসনের নির্বাচন বন্ধ করে গণতন্ত্র রক্ষার আন্দোলনে দেশবাসীকে শরিক হওয়ার আহবান জানিয়ে ২০১৪ সালের নভেম্বর ঢাকা চলো কর্মসূচি ঘোষণা দেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ২৪ ডিসেম্বর গুলশান কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে খালেদা জিয়া ‘মার্চ ফর ডেমোক্র্যাসি’ নামে এই কর্মসূচি ঘোষণা করেন।
২৮ ডিসেম্বর রাত থেকেই খালেদা জিয়ার বসভবনে বালির ট্রাক দিয়ে অবরুদ্ধ করা হয়। সারাদেশে থেকে ঢাকায় আসার যানবাহন আসা বন্ধ করে দেয় সরকার। তখন বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া কার্যত গৃহবন্দী হয়ে পড়েন।
এরপর ৫ জানয়ারি সমাবেশের জন্য অনুমতি চাওয়া হয়। সরকার অনুমতিতো দেননি বরং পাল্টা কর্মসূচি দেয়। ফলে সংঘাত আরো ছড়িয়ে পড়ে। ৫ জানুয়ারি বিকেলে খালেদা জিয়া বাসা থেকে বের হতে চাইলে পুলিশ বাধা দেয়। এপর্যায়ে বেগম খালেদা জিয়া অনির্দিষ্টকালের জন্য অবরোধের ডাক দেন।
টানা ৯২ দিন অবরোধ-হরতালে গাড়িতে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ, অগ্নিসংযোগ ও হাতবোমা বিস্ফোরণে ১৫৩ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। আহত হন কয়েক’শ মানুষ। সে সময় বিএনপির শত শত নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার করা হয়। বিএনপি ও জামায়াতের অনেক নেতাকর্মী সেই নাশকতা এখনও মামলায় জেলে আছেন।
আন্দোলনে সরকার হঠাতে ব্যর্থ হওয়ার পর এপ্রিলে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিএনপি। এরপর বছরের শেষে দলীয় প্রতীকে পৌর নির্বাচনেও অংশ নেয় তারা। পৌর নির্বাচনে ভরাডুবির পর ভোট জালিয়াতির অভিযোগ করলেও কোনো কর্মসূচি দেয়নি বিএনপি। এরপর ৫ জানুয়ারিই প্রথম কর্মসূচি নিয়ে আসছে দলটি। দু’দলের পাল্টাপাল্টি এ কর্মসূচি ঘোষণার মধ্যে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বাসার চারপাশে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
শনিবার নয়া পল্টনে দলীয় কার্যালয়ে এক সভার পর ফখরুল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ২০১৪ সালের প্রহসনের নির্বাচনের দিনকে আমরা গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসেবে চিহ্নিত করেছিলাম। এই দিবসটিকে স্মরণ করতে এবং গণতন্ত্র ফিরিয়ে পাওয়ার আন্দোলনের অংশ হিসেবে আমরা আগামী ৫ জানুয়ারি একটি শান্তিপূর্ণ জনসভা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
এদিকে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির জনসভার অনুমতির বিষয়ে যা করণীয় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) তা-ই করছে বলে ডিএমপির একজন পুলিশ কর্মকর্তার বরাত দিয়ে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন বিএনপির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার।
শনিবার বিকেলে দলের আরও তিন নেতাকে নিয়ে ডিএমপি কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়ার কার্যালয়ে গিয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বেরিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন তিনি। মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করার জন্য আমরা গত ৩১ ডিসেম্বরেই অনুমতি চেয়ে আবেদন জমা দিয়েছিলাম। সোমবার সে বিষয়ে কথা বলতে এসেছি। তিনি বলেন, এর আগে নিয়ম অনুযায়ী জনসভা করার জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের তত্ত্বাবধায়ক পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্টের (পিডব্লিউডি) প্রধান প্রকৌশলীর কাছে আবেদন জমা দিয়েছি আমরা। তাদের পক্ষ থেকে এখনও কোনো জবাব পাইনি। ডিএমপি থেকেও কোনো সরাসরি উত্তর দেওয়া হ”েছ না। তবে ডিএমপি সদর দফতরের পুলিশ কর্মকর্তা আল মামুনের বরাত দিয়ে মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, আমাদের জানানো হয়েছে, ডিএমপি কমিশনার ইতোমধ্যে জনসভার অনুমতির বিষয়ে যা করণীয় তা-ই করছেন। তিনি ইতোমধ্যে রমনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও ট্রাফিক বিভাগের কাছে ক্লিয়ারেন্স চেয়েছেন। অনুমতি পাওয়ার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে বিএনপির এ নেতা বলেন, আমাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা বলছে অনুমতি পাবো। ডিএমপি এ বিষয়ে কী বলে তা আমরা আপনাদের জানাবো। অনুমতি না মিললে বিএনপির করণীয় কী হবে সে বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মাসুদ আহমেদ তালুকদার বলেন, এখন কিছু বলতে পারছি না। তবে, আমরা শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি অব্যাহত রাখবো।
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের পরিবর্তে ৫ জানুয়ারি নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশর অনুমতি পেলে বিএনপির কোনো আপত্তি নেই বলে জানিয়েছেন দলের যুগ্মমহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আহমেদ। তিনি বলেন, গণতন্ত্র, শান্তি, সংঘাত ও সংঘর্ষ এড়ানোর জন্য এ সিদ্ধান্ত মেনে নেবে বিএনপি। গতকাল নয়াপল্টনে সাংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন।
৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্র রক্ষা দিবস’ পালনের ঘোষণা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ রাজধানীর ১৮ টি স্পট এবং সারাদেশে সমাবেশ এবং আনন্দ র‌্যালী করার কথা রয়েছে দলটির।
এদিকে বিএনপি তথাকথিত কর্মসূচির নামে ৫ জানুয়ারি নাশকতা ও সন্ত্রাসী কর্মকা- করলে জনগণ দলটিকে সমুচিত জবাব দেবে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে বঙ্গবন্ধু ডিপ্লোমা প্রকৌশল পরিষদের প্যানেল পরিচিতি অনুষ্ঠানে
তিনি এ কথা বলেন।
আগামী ৫ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সমাবেশের অনুমতি না পেলে ২৩ বঙ্গবন্ধু এভিনিউ দলীয় কার্যালয়ের সামনে সমাবেশ করবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
দলটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব উল আলম হানিফ এমপি গত রোববার এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন।
তিনি বলেন, দশম সংসদ নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপি যে ভুল করেছে তার জন্য দলটিকে ৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালন না করে ‘অনুতপ্ত দিবস’ পালন করা উচিৎ। হানিফ বলেন, গতবারের মতো এবারও যদি ৫ জানুয়ারি বিএনপি কোনও নাশকতার চেষ্টা করে তাহলে তাদের আরও কঠোর শিক্ষা দেবে জনগণ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। মহসীন উদ্দিন ,আমাদের সময়.কম