Home জাতীয় ১২০ কিমি গতিতে ছুটবে সব ট্রেন

১২০ কিমি গতিতে ছুটবে সব ট্রেন

97

ডেস্ক রিপাের্ট: চারদিকে নিরাপত্তাবেষ্টনী। দূর থেকেই কানে আসে বিকট সব শব্দ। ভেতরে চলছে মহাকর্মযজ্ঞ। করোনা মহামারির মধ্যেও যমুনার উজানে নেই বিরতি, চলছে দিন-রাত কাজ। বঙ্গবন্ধু সেতুর ৩০০ মিটার উজানে নির্মিত হচ্ছে দেশের সবচেয়ে বড় রেল সেতু। নাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু। করোনার কারণে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা না থাকলেও এরই মধ্যে শুরু হয়েছে চারটি পাইল বসানোর কাজ। মূল সেতুর বাইরেও দুই প্যাকেজে ভাগ করে চলছে শ্রমিকদের থাকার জায়গা ও অস্থায়ী অফিস নির্মাণ।

সরেজমিনে প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা যায়, বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্ব-উত্তর পাশের গাইড বাঁধের কাছ থেকে ৪৬ নম্বর পিয়ার দিয়ে পাইল বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। এখন চলছে ৪৫, ৪৬, ৪৭ ও ৪৮ নম্বর পিয়ারের স্টিল পাইপ শিল পাইপ (এসপিএসপি) ড্রাইভিংয়ের কাজ। ক্রেনের সাহায্যে হ্যামার দিয়ে বসানো হচ্ছে পাইলিং পাইপ। আবার বঙ্গবন্ধু সেনানিবাস সংলগ্ন এলাকায় চলছে প্রকল্প অফিস ও আবাসন নির্মাণের কাজ। সেতুর ভাটিতে যমুনা নদীতে আনলোডের অপেক্ষায় রয়েছে ভারী যন্ত্রপাতি। এ ছাড়া সেতু এলাকার হার্বারের পুরনো জেটি সংস্কার করে ক্রেনের সাহায্যে বিভিন্ন যন্ত্রপাতি আনলোড করা হচ্ছে। পূর্বদিকে চলছে নতুন জেটির নির্মাণ কাজও। জেটির কাছেই কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে রাখা হচ্ছে উচ্চ ভোল্টের বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম জেনারেটর, ক্রেনসহ ভারী যন্ত্রপাতি ও এসপিএসপি পাইপ।

গত ২২ মার্চ প্রকল্পের কাজ শুরুর পর ২০ জন শ্রমিক করোনায় আক্রান্ত হলে সাময়িক বন্ধ থাকে কাজ। পরে ১৩ এপ্রিল পুরোদমে ফের কাজ শুরু হয়। এপ্রিল পর্যন্ত প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি হয়েছে ২৯ শতাংশ এবং আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ১৩.৯৪ শতাংশ।

২০২৪ সালের আগস্টে এই সেতুর ওপর ট্রেন চলার কথা রয়েছে। এই সেতু নির্মাণের মধ্য দিয়ে ঢাকার সঙ্গে দেশের পূর্বাঞ্চল ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন ট্রেন যোগাযোগ স্থাপন হবে। এখন ৩৮টি ট্রেন চলছে, নতুন সেতু চালু হলে ৮৮টি ট্রেন চলাচল করতে পারবে। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধু সড়ক সেতু দিয়ে যেখানে ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৫ থেকে ২০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলাচল করে, সেখানে এই রেল সেতুতে ব্রড গেজ ট্রেন প্রতি ঘণ্টায় ১২০ কিলোমিটার এবং মিটার গেজ ট্রেন প্রতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারবে।

প্রকল্পের তথ্য ঘেঁটে জানা গেছে, ৯ হাজার ৭৩৪ কোটি টাকা ব্যয়ে রেল সেতুটি নির্মাণ করার কথা থাকলেও প্রথম সংশোধনীর পর সেতুর প্রকল্পের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৬ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা। এর মধ্যে দেশীয় অর্থায়ন থাকবে ২৭.৬০ শতাংশ বা চার হাজার ৬৩১ কোটি টাকা এবং জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা) ঋণ দেবে ১২ হাজার ১৪৯ কোটি টাকা, যা পুরো প্রকল্পের ৭২.৪০ শতাংশ। এই প্রকল্পের আওতায়, বিদ্যমান বঙ্গবন্ধু সেতুর সমান্তরালে ডুয়াল গেজ ডাবল ট্র্যাকসহ প্রায় ৪.৮০ কিলোমিটার রেল সেতু নির্মাণ করা হবে। সেতুর দুই পাশে .০৫ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট, ৭.৬৬৭ কিলোমিটার রেলওয়ে এপ্রোচ এমব্যাংকমেন্ট এবং লুপ ও সাইডিংসহ মোট ৩০.৭৩ কিলোমিটার রেললাইন নির্মাণ করা হবে। বঙ্গবন্ধু সেতু পূর্ব এবং বঙ্গবন্ধু সেতু পশ্চিম স্টেশন ভবন আধুনিক করা এবং ইয়ার্ড রিমডেলিং করা হবে। সেতুর এই দুই পাশের স্টেশনের সিগন্যাল ও টেলিকমিউনিকেশন ব্যবস্থা উন্নত করা হবে। এ ছাড়া ওই সেতু এলাকায় নির্মিত হবে রেলওয়ে সেতু জাদুঘর।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব রেলওয়ে সেতু প্রকল্পের পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান বলেন, ‘করোনার মধ্যেও পুরোদমে কাজ চলছে। থেমে থাকা সময়ের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এখন কাজের গতি আরো বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় প্রতিদিন ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা কাজ চলছে। শুরুর দিকে মূল সেতুর পাশাপাশি প্রকল্প এলাকায় অফিস ও আবাসন নির্মাণের কাজও চলছে। এগুলো দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। এরপর শুধুই মূল সেতুর কাজ চলবে। ইয়ার্ড নির্মাণের জন্য বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের সঙ্গে ভূমিসংক্রান্ত বিরোধ নিষপত্তি হয়েছে।’

প্রকল্পটি ২০১৬ সালের ৬ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদন পায়। জাইকার সঙ্গে ঋণচুক্তির পর ওরিয়েন্টাল কনসালট্যান্স গ্লোবাল জেভিকে পরামর্শক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এই প্রতিষ্ঠানই ২০১৮ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সেতুর নকশা প্রণয়ন করে। সেতুর নির্মাণ প্যাকেজে পূর্ব পাশের কাজের জন্য জাপানের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ছয় হাজার ৮০১ কোটি ৭৪ লাখ ৬৬ হাজার ১৫৮ টাকার চুক্তি হয়েছে। আর পশ্চিম পাশের জন্য চুক্তি হয়েছে ছয় হাজার ১৪৮ কোটি ৩২ লাখ ১৭ হাজার ২০৯ টাকার। ২০২০ সালের ৫ এপ্রিল এই নির্মাণ প্যাকেজের চুক্তি সই হয়। গত ২৯ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পের নির্মাণকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।-আমাদের সময়.কম