১০৪৩ আত্মঘাতী জঙ্গি সক্রিয়, আগেই সতর্ক করেছিল ভারত

82

যুগবার্তা ডেস্কঃ বাংলাদেশে জঙ্গি ধরা পড়ার আগেই সতর্ক করেছিল ভারতীয় গোয়েন্দারা। ১১ ডিসেম্বর নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) তৎপরতা সম্পর্কে বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা-এনআইএ। এছাড়া বাংলাদেশে ধরা পড়া জঙ্গিরা জানিয়েছেন জেএমবির ১০৪৩ আত্মঘাতী সদস্য বর্তমানে সক্রিয় রয়েছে।
দেশে জেএমবির ১০৪৩ জন আত্মঘাতী সদস্য সক্রিয় আছে। এদের সবাই বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। তারা দেশের বিভিন্ন স্থানে ওঁৎ পেতে আছে- সুযোগ বুঝে হামলা চালাবে। দৈনিক কালের কণ্ঠের এক প্রতিবেদনে রোববার এ তথ্য জানানো হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, জেএমিবর পাশাপাশি জামা’আতুল মুজাহিদীন ও হরকাতুল জিহাদের ৯০১ জন জঙ্গি আসামির তালিকা রয়েছে পুলিশ সদর দপ্তরে। এদের মধ্যে মৃত্যুদন্ড প্রাপ্ত পলাতক এবং আদালত থেকে জামিন পাওয়া অন্তত ৭৩ জন আসামি রয়েছে, যারা পলাতক থেকে জঙ্গি থাবা বিস্তৃত করছে দেশে।পাকিস্তানের দুর্ধর্ষ জঙ্গিদের আদলেই বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে হামলার ঘটনা ঘটছে। বগুড়া ও রাজশাহীর বাগমারায় মসজিদে বোমা হামলাও একই সূত্রে গাঁথা। এই দুটি ঘটনার সঙ্গে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জেএমবি জড়িত বলে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো নিশ্চিত হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার ঢাকার মিরপুরে জঙ্গি আস্তানায় ১৬ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযানের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বোমা বিস্ফোরকসহ আটকদের এবং আগে আটক অন্যদের জিজ্ঞাসাবাদে দেশের বিভিন্ন স্থানে সক্রিয় আত্মঘাতী জঙ্গিদের ব্যাপারে অনেক তথ্য পেয়েছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারীরা। ইতিমধ্যে তাঁরা এই আত্মঘাতী সক্রিয় জঙ্গিদের তালিকা তৈরি করেছেন বলে জানা গেছে। এই তালিকায় ১০৪৩ জনের নাম রয়েছে।
এই তালিকায় যাদের নাম আছে, তাদের মধ্যে কয়েকজন হলেন- সেলিম হাওলাদার, আবু নাইম, গোপালগঞ্জের মাওলানা আমিরুল ইসলাম, আনিছুর রহমান খোকন, ইউনুছ আলী সরদার, জুলফিকার আলী, রাঙামাটির আবদুল হালিম, সিলেটের আরিফ, আহম্মেদ, নারায়ণগঞ্জের আবদুল আজিজ সৈকত, রবিউল ইসলাম সোহাগ, লক্ষ্মীপুরের নজরুল ইসলাম সুমন, লিয়াকত শেখ, আবদুল আহাদ খান, আমির খান, মাওলানা ওবাইদুর রহমান, আবু নোমান আমানউল্লাহ, রুহুল আমিন, গিয়াস উদ্দিন, মৌলভীবাজারের মারুফ মোহাম্মদ ইউসুফ, ময়মনসিংহের আবদুস সামাদ, মুক্তাগাছার হাতেম আলী, আমিনুল ইসলাম, মাওলানা আমিরুল ইসলাম, আনিরুল ইসলাম ওরফে আনিস, এইচ এম শফিকুল ইসলাম ওরফে শাকির, নুর সাঈদী, টাঈাইলের আবু তাহের প্রমুখ।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) (ডিবি) যুগ্ম কমিশনার মনিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, সম্প্রতি যেসব জঙ্গি ধরা হয়েছে তাদের কাছ থেকে আত্মঘাতী জঙ্গিদের ব্যাপারে নানা রকমের তথ্য পাওয়া গেছে। মিরপুরের বাসা থেকে যাদের ধরা হয়েছে তারা জেএমবির সঙ্গে সম্পৃক্ত। জঙ্গিরা বড় ধরনের নাশকতার চেষ্টা চালাচ্ছে। তারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ও সুধীসমাজের লোকজনকেও টার্গেট করে আছে।
তিনি বলেন, জঙ্গিদের প্রতিরোধ করতে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার পাশাপাশি বিশেষ অভিযান শুরু হবে। ইতিমধ্যে র‌্যাব-পুলিশের বিশেষ নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও সাবেক নির্বাচন কমিশনার ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন শনিবার বলেন, ‘সম্প্রতি দেশে যে কয়টি বোমা বা গ্রেনেড হামলা হয়েছে তাতে আমরা আতঙ্কিত। ইসলামকে বিভাজনের চেষ্টা চলছে। সমাজে বিশৃঙ্ঘলা সৃষ্টি করা হচ্ছে। জঙ্গিরা এখন সুরক্ষিত স্থানে আক্রমণ করছে। কৌশলে তারা বেপরোয়া হয়ে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছে। জঙ্গিদের কঠোর হস্তে দমন করতে না পারলে সামনের দিনগুলোতে বড় বিপদ হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
তিনি বলেন, কোনো ঘটনা ঘটলেই রাজনৈতিকভাবে দোষারোপ করা হচ্ছে। এতে করে অপরাধীরা বেশি লাভবান হচ্ছে। রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে জঙ্গিদের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে হবে। যেসব আন্তর্জাতিক চক্র বাংলাদেশের জঙ্গি সংগঠনগুলোকে ব্যবহার করছে তাদের দ্রুত চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে জঙ্গি কার্যক্রমসহ অন্যান্য অপরাধ রোধ করা যাবে না। বগুড়া ও রাজশাহীতে দুটি মসজিদে যেভাবে হামলা হয়েছে তাতে মনে হচ্ছে, এতে পাকিস্তান বা আন্তর্জাতিক জঙ্গিদের হাত আছে। এসব বিষয় দ্রুত তদন্ত করতে হবে। আত্মঘাতী জঙ্গিদের দ্রুত চিহ্নিত করে গ্রেপ্তারের আওতায় আনতেই হবে। তা না হলে জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন বলেন, ‘জঙ্গিদের নিধন করতে যা যা প্রয়োজন তাই করা হবে। কৌশলে জঙ্গিরা নড়াচড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। আন্তর্জাতিক চক্র বাংলাদেশের জঙ্গিদের ব্যবহার করছে এমন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তবে এখনো আমরা নিশ্চিত হতে পারিনি। রাজশাহীর বাগমারায় আহমদিয়া মসজিদে বোমা হামলা আত্মঘাতী কি না তা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। ওই ঘটনায় দুজন অংশ নিয়েছিল। এর মধ্যে একজন মারা গেছে।’
নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন জামায়াতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশের (জেএমবি) তৎপরতা সম্পর্কে বাংলাদেশের গোয়েন্দাদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে ভারতের জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থা-এনআইএ। এনআইএর এক এসপির নেতৃত্বে দুই সদস্যের একটি টিম ঢাকায় র‌্যাব ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। তাদের এ বৈঠকের বিষয়টি গোপন রাখা হয়। মিন্টো রোডে ডিবি কার্যালয় ও বিমানবন্দরে র‌্যাব সদর দপ্তরে এ বৈঠক দুটি অনুষ্ঠিত হয়। এসময় তারা ডিবি ও র‌্যাবকে বাংলাদেশে জেএমবির তৎপরতা সম্পর্কে একটি রিপোর্ট দেন।
রিপোর্টে বলা হয়েছে, বর্ধমানের খাগড়াগড়ে বোমা বিস্ফোরণের মতো কোনো ঘটনা বাংলাদেশে জেএমবিরা ঘটাতে পারে। বিশেষ করে যে কোনো জনাকীর্ণ স্থানে ভয়ঙ্কর ধরনের আত্মঘাতী বোমা হামলা চালাতে পারে। এজন্য তাদের হাতে প্রচুর বিস্ফোরক ও আগ্নেয়াস্ত্র আছে। এরা পশ্চিমবঙ্গে আর্থিকভাবে তেমন কোনো সুবিধা করতে পারেনি বলে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে।
তবে পুলিশ ও র‌্যাবের একাধিক শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এনআইএর এ প্রতিবেদনের আগেই পুলিশ ও র‌্যাব জেএমবির বর্তমান কর্মকান্ডের বিষয়ে খোঁজখবর নিয়েছে। বিশেষ করে দেশের বিভিন্ন এলাকায় জামিনে মুক্তি পাওয়া জেএমবির নেতাকর্মীদের নজরদারীতে রাখা হচ্ছে। জঙ্গি হামলার আশঙ্কায় উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোর পুলিশ সুপারদের সতর্ক থাকার ব্যাপারে একটি নির্দেশনাও দিয়েছে পুলিশ সদর দপ্তর।
বৈঠক সূত্রে জানা যায়, এনআইএর এসপি ডিবি ও র‌্যাবকে জানান, বর্ধমানের খাগড়াগড়ে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় জড়িত কয়েকজন জেএমবি নেতা আবারো বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে। তারা সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের চাপাইনবাবগঞ্জ, রাজশাহী, নওগাঁ, দিনাজপুর ও ঠাকুরগাঁও জেলার সীমান্ত এলাকায় অবস্থান পাওয়া যায়। তারা সীমান্ত এলাকায় অবস্থান করে ভারতের মোবাইল ফোনের সিমকার্ড ব্যবহার করে। ভারতের জঙ্গিদের (সন্ত্রাসী) সঙ্গে কথা বলে। আবার ভারতের সীমান্ত থেকে তাদের দেশের জঙ্গিরা বাংলাদেশের মোবাইল ফোনের সিমকার্ড ব্যবহার করে কথা বলছে। ফলে প্রযুক্তিগত দিক থেকে তাদের শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। এ কারণে জঙ্গি দমনে দু’দেশের মধ্যে তথ্যের আদান-প্রদান করা প্রয়োজন।
সূত্র জানায়, জেএমবির কার্যক্রমকে অত্যন্ত বিপদজনক জানিয়ে ভারতের এনআইএ জানায় বগুড়া, রাজশাহী, কুষ্টিয়া ও সিলেট এ চার এলাকা ভাগ করে জেএমবির গোপন হামলা ও নাশকতামূলক কর্মকান্ড পরিচালিত হচ্ছে। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলায় আবারও শক্ত ঘাঁটি গেড়েছে জেএমবি।
এনআইএর গোয়েন্দা প্রতিবেদনে বলা হয়, জেএমবি যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জঙ্গি কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে।উত্তরাঞ্চলের বগুড়া এলাকার তালহা বর্তমানে ওই এলাকা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করছে। তালহার সঙ্গে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের খাগড়াগড়ে বোমা বিস্ফোরণে জড়িত মিজান ও সালেহীন ওরফে সালেহউদ্দীনের যোগাযোগ ঘটেছিল।
এনআইএর টিম ধারণা করছে, ময়নসিংহের ত্রিশালে পুলিশের প্রিজন ভ্যান থেকে ছিনতাই করা দুর্র্ধষ জঙ্গিযোদ্ধা মিজান ও সালেহীন বর্তমানে বাংলাদেশে ঢুকেছে।
তবে এ ব্যাপারে ডিবি ও র‌্যাবের পদস্থ কর্মকর্তারা এনআইএর টিমকে জানিয়েছেন, তারা বাংলাদেশে নয়, ভারতের বিহার অথবা ঝাড়খ- রাজ্যে আত্মগোপন করেছে। গত বছরের ২ অক্টোবর পশ্চিমবঙ্গের খাগড়াগড়ে জেএমবির ঘাঁটিতে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনায় ২ জন নিহত হয়। এ ঘটনায় এনআইএ তদন্ত করে চলতি বছরের ৩০ মার্চ ২১ জনকে আসামি করে মামলার চার্জশিট দেয়। এ ২১ জন আসামির মধ্যে ৫ জন পলাতক আছে। এরা পশ্চিমবঙ্গের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখে ধুলো দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকে পড়েছে বলে দাবি এনআইএর।
এনআইএর প্রতিবেদনে জেএমবির শতাধিক ক্যাডারের নাম উল্লেখ করা হয়েছে এবং জেএমবির এসব ক্যাডারদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে বাংলাদেশের পুলিশ ও র‌্যাবকে এনআইএর সঙ্গে তথ্য আদান-প্রদানের অনুরোধ জানানো হয়েছে।মহসীন উদ্দিন, আমাদের সময়.কম