হ্যাকিং নাকি রিগিং করে, রিজার্ভ নিল রাবিশ চোরে!!

106

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ
শেষ পর্যন্ত রিজার্ভ শব্দটি সরকার আর রিজার্ভড রাখতে পারেনি; সাধারণের হয়ে গেছে। ইংরেজী এই শব্দটি এখন সারাদেশে বহুল শ্রুত, বহুল প্রচারিত। কেবল মিডিয়ার টকশো নয়, শহরে অফিস-রেস্টুরেন্টের টেবিলে নয়; কিংবা নয় ড্রয়িং-ডাইনিং এর আড্ডায়। হাটে, মাঠে এবং ঘাটে সব জায়গায়, সবখানে কথা এখন কেবল একটিই; রিজার্ভ নিয়ে গর্ব, হয়ে গেল খর্ব! রিজার্ভ শব্দটি নিয়ে কথা বলা এবং শোনা এখন আমজনতাও ডিজার্ভ করে।
সরকারের যত সফলতা নিয়ে আমাদের পত্রিকায় লেখালেখি করি, এর মাঝে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ অন্যতম। অহংকার করার মত একটি জায়গায় নিয়ে গেছে দেশের রিজার্ভকে বর্তমান সরকার। কালেভদ্রে অর্থমন্ত্রীর অতিকথন নিয়ে মিডিয়া নানা সময় নানা মুখোরোচক সমালোচনা করে থাকলেও আমরা কখনোই এই কাজটি করিনি। আমরা সব সময় বিষয়টিকে পাশ কাটিয়ে গেছি। অসম্ভব গুনী একজন বয়স্ক মানুষের কথাবার্তায় মাঝেমধ্যে কদাচিত অসংগতি থাকলেও আমরা ওভারলুক করেছি সর্বদা। তাঁর কথাকে নয়, কর্মকেই বিচার করেছি সবক্ষেত্রে। অত্যন্ত সজ্জন মানুষ হিসেবে আমরা সব সময় তাঁর মুল্যায়ন করে আসছি। তিনি সবচেয়ে সফল একজন অর্থমন্ত্রী হিসেবে দেশের ইতিহাসে ইতিমধ্যেই তাঁর স্থান করে নিয়েছেন। ৫৩ হাজার কোটি টাকার রাষ্ট্রীয় বাজেটকে প্রায় তিনলাখ কোটিতে নিয়ে এসেছেন। এটা চাট্টিখানি কথা নয়। যে কাজটি কেউ পারেনি, সেই কাজটি তিনি পেরেছেন বলেই তাঁকে শ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃতি দিয়েছি।
স্বীকৃতি আরো একজনকে দিয়েছি। সরকারে থাকা বিভিন্ন সফল ব্যক্তিদের মাঝে অন্যতম সফল ব্যাক্তি হিসেবে আমরা অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত এবং সদ্য বিদায়ী গর্ভনর আতিউর রহমানকে বিবেচনা করি সব সময়। এই দুজনার সফল অর্থ ব্যবস্থাপনার কারনেই সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন প্রধানমন্ত্রী দি¦গুন করতে পেরেছেন একধাপেই। কেবল এ খাতেই সরকারের ব্যয় বেড়েছে বছরে প্রায় ত্রিশ হাজার কোটি টাকা। তাঁদের নেতৃত্বে সফল মুদ্রানীতির কল্যাণে রিজার্ভ গেল সাত বছরে ৬ বিলিয়ন থেকে বেড়ে এখন ২৮ বিলিয়নে এসে দাঁড়িয়েছে। (এক বিলিয়ন মানে ৮,০০০ কোটি টাকা) যা প্রকৃত অর্থেই অহংকার করার মত একটি জায়গা।
সরকারের সেই অহংকারের জায়গায় যখন অশনি সংকেত দেখা দেয় তখন আমরা যেমনি শংকিত না হয়ে পারিনা, তেমনি পারিনা কলম না ধরে থাকতে। আমজনতার মত আমিও ব্যাক্তিগতভাবে অর্থনীতির মারপ্যাচ তেমন বুঝি না। এর নানা খুটিনাটি বিষয়গুলো আমার কাছে জটিল মনে হয় বলে সব সময় এড়িয়ে যাই। এবার পারিনি। না পারার কারণ হলো প্রথম দিকে বিষয়টি নিয়ে এই দুজন কর্তা ব্যাক্তির হাল্কা মেজাজের কথাবার্তা এবং শেষদিকে পারস্পরিক দ্বন্দ।
প্রথম যেদিন সাংবাদিকগন অর্থমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি জানতে চাইলেন, তিনি তো অবাক। পাশে বিশ্বব্যাংকের এশিয়া বিষয়ক প্রধানও দাঁড়িয়ে। অকস্মাৎ এই প্রশ্নের জন্যে তিনি প্রস্তুত ছিলেন না মোটেও। পূরোপুরি না জানার ভান করলেন। ঘটনা ঘটে যাবার প্রায় একমাস পরও দেশের অর্থমন্ত্রী এত বড় বিষয়টি জানেন না! মুখে না করলে কী হবে? মুখমন্ডলের মলিনতার ছাপ তো আর তিনি লুকাতে পারেন নি। তিনি জানেন না, অথচ তামাম দুনিয়া জানে! খবরটি প্রথম প্রকাশ করে ফিলিপাইনের পত্রিকা। না হলে আমরা তো জানতামই না। উপায়ন্তর না দেখে দুদিন পরে তিনি স্বীকার করলেন, কিন্তু দোষ চাপিয়ে দিলেন সরাসরি আমেরিকান ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের উপর। একমাস কিছুই না জেনে মাত্র দুদিনে সব জেনে গেলেন? তদন্ত না করেই এত তাড়াতাড়ি বিষয়টির উপসংহার টেনেও তিনি ঠিক করেননি।
মোটেই ঠিক করেননি গভর্নরের উপর এতটা চড়া মেজাজ দেখিয়ে। সাবেক আমলা ছিলেন বলেই কি তাঁর মেজাজ এত চড়া; তিনি রাজনীতিবিদ হতে পারেননি। রাজনীতিবিদ হতে হলে জীবনের শুরু থেকেই চর্চা করতে হয়। ৫৭ বছর আমলাগিরি করে রাজনীতিতে যোগ দিলেই রাজনীতিবিদ হওয়া যায় না। হতে পারলে ক্রান্তিকালে মাথা ঠান্ডা রাখতেন। গভর্নর তাঁর অধস্তন হতে পারেন। কিন্তু মনে রাখতে হবে এই পদটি রাষ্ট্রের একটি অত্যন্ত সম্মানিত পদ। আর গভর্নর আতিউরও অত্যন্ত সফল একজন গভর্নর। মুখে যা আসে তাই তাঁকে বলা যায় না অবশ্য অনেক আগে থেকেই তিনি গভর্নরের উপর নাখোশ; সরিয়ে দেবার ফাঁক পাচ্ছিলেন না। এবার পেয়ে আর দেরী করেননি। ফলাফল কী হলো! রাষ্ট্র একজন সফল গভর্নরকে হারালো। প্রধানমন্ত্রী হারালেন তাঁর ২৮ বছরের বিশ্বস্ত সহকর্মীকে। মানুষটি অসম্ভব ভাল মানুষ, গুণী মানুষ। তার পদত্যাগ পরবর্তী চমৎকার বক্তব্য মানুষকে আপ−“ত করেছে; ভারমুক্ত করেছে অনেকটাই। টাকা লোপাটের দায়ভার তিনি এড়াতে পারেন না সত্যি। কিন্তু গেল সাত বছরের সফলতাও তো মিথ্যে নয়। অর্থমন্ত্রীরও অনেক সফলতা আছে। কিন্তু তিনি কি দায় এড়াতে পারেন? একজন পদত্যাগ করলে অন্যজনা থাকে কি করে? পদত্যাগ পরবর্তী ভাষনে গভর্নর খুব সুন্দর করে কথা বলেছেন। তবে এত সুন্দর কথা বলা মানুষটি ঘটনার শুরুতে হাল্কা কথা না বললেও পারতেন। রাজভান্ডারে মজুদ অর্থ সংরক্ষনের সিন্দুক ফুটো হয়ে গেছে; অথচ তিনি ব্যস্ত বিদেশ সফরে। দেশের ক্রান্তিলগ্নে বিদেশী সভা সেমিনারে বক্তব্য দেয়ার চেয়ে রাজভান্ডার সুরক্ষা করা অতীব জরুরী। জনগন এটাই মনে করে। তিনি তা করলেন না। উল্টো খুবই হাল্কা একটি বিবৃতি দিলেন এই বলে যে, ১০০ কোটি ডলার চুরি করতে চেয়েছিল। আমাদের সতর্কতার কারনে ১০ কোটির বেশী চুরি করতে পারেনি। তিনি জানলেন কী করে যে ওরা ১০০ কোটি ডলার চুরি করতে চেয়েছিল? যদি ১০০ কোটি ডলারই চুরি হয়ে যেত তাহলে কি বলতেন যে, ৫০০ কোটি ডলার চুরি করতে চেয়েছিল। সতর্কতার কারনে ১০০ কোটির বেশী চুরি করতে পারেনি!
এত বড় একটি বিষয়কে ছোট করে দেখাবার এই কৌশলটি মোটেও ভাল লাগেনি আমাদের। অবশ্য এই কৌশলটি অর্থমন্ত্রীও করে থাকেন। হলমার্কের কেলেঙ্কারীতে ৪,০০০ কোটি লোপাট। অর্থমন্ত্রী বললেন, এটা তেমন বড় কোন অংক নয়! কেলেঙ্কারী তো আর কেবল হলমার্কেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। বেসিক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংক, শেয়ার বাজার, এটিএম কার্ড জালিয়াতি; অর্থ কেলেঙ্কারী কোথায় হয়নি। যখনই একেকটি কেলেঙ্কারী ধরা পড়েছে তখনই এমন দায়িত্বহীন হাল্কা কথা বলে জনগনকে নিরাশ করা হয়েছে। আমাদের দুঃখটি কেবল এই জায়গায়।
তবে এই দুঃখ প্রকাশের জায়গা আমাদের নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের সকল ব্যাংকের নিয়ন্ত্রক সংস্থা। আমরা যারা প্রতিদিন ব্যাংকিং করি তারা জানি কী হেনস্তা এই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দোহাই দিয়ে সকল বানিজ্যিক ব্যাংক আমাদেরকে করছে। আজকাল বিশ হাজার টাকার চেক পাঠালেও ফোন করে রিকনফার্ম করে। ফোনটা করে জোহ্রের জামাতের সময়ে। স্বভাবতই ফোনটা বন্ধ পায়। ব্যাস, কেল্লা ফতে; হেনস্তা শুরু। সবই করে আমাদের অর্থের তথাকথিত নিরাপত্তার নামে। এটা কি আমাদেরকে নিরাপত্তা দেয়া, নাকি হয়রানী করা! একটিবারও তাদের মাথায় এ ভাবনা আসে না। যারা নিজেদের সিন্দুকের নিরাপত্তা দিতে পারে না, তারা সারাদিন গ্রাহকের নিরাপত্তা দেবার নামে হালুম হুলুম করে।
এখানেই শেষ নয়। ব্যাংকে গেলে শুরু হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সময়ে সময়ে জারি করা অধ্যাদেশের ছুঁতোয় নানা তালবাহানা। ফরমের পর ফরম পূরণ করতে হয়। টাকা কোথা থেকে এলো, কাকে দেবো, কেন দেবো, ইত্যাদি জবাবদিহি করতে করতে গ্রাহকদের জান শেষ। আবার যে অধ্যাদেশগুলো ব্যাংক কর্তৃপক্ষের বিপক্ষের সেসব তারা কখনোই মানে না; ওভারলুক করে। আর যে গুলোতে ব্যাংকের স্বার্থে আঘাত লাগে না, কেবল গ্রাহকের ভোগান্তি বাড়ে, সেগুলো গ্রাহকের উপর চাপিয়ে দেয়ার প্রতিযোগীতা শুরু হয়। কিছু বললেই তারা অধ্যাদেশের দোহাই দেয়। এ এক অসহনীয় কঠিন উৎপাত। এসব উৎপাতে গ্রাহক বুঝে হোক, না বুঝে হোক বাংলাদেশ ব্যাংকের উপর দারুন ত্যাক্ত, দারুন বিরক্ত। এর উপর যদি ব্যাংকের অব্যবস্থাপনায় ৮০০ কোটি টাকা লোপাট হতে দেখে তাহলে তারা কি ক্ষমা করবে তাদেরকে?
তবে এটা যে কেবল দেশের বাইরে থেকে হ্যাকিং করে লোপাট নয়, এর সাথে বাংলাদেশ ব্যাংকের লোকজনও জড়িয়ে যাচ্ছে এটাও আস্তে আস্তে বেরিয়ে আসছে। ব্যাংকের যে রুম থেকে সার্ভার নিয়ন্ত্রন করা হয় তার ক্লোজ সার্কিট ক্যামেরা কদিন ধরে নষ্ট থাকাটাও তাদের জড়িয়ে থাকার একটি ক্লু নিশ্চয়ই। রিজার্ভ লোপাট কর্মটি হ্যাকারদের হ্যাকিং, নাকি বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তাদের রিগিং; নাকি দুই গ্রুপের সম্মিলিত চিটিং! এটা তদন্তে বেরিয়ে আসুক।
সঠিক তদন্তে আমেরিকান ফেডারেল ব্যাংকের দুনম্বরীও তো বেরিয়ে আসতে পারে। নিয়ম হলো ঢাকা থেকে কোন ইলেকট্রোনিক্স ম্যাসেজ গেলে ফেডারেল ব্যাংক ভিন্ন চ্যানেলে সেটা ভেরিফাই করে। তথ্যে বেরিয়ে এসেছে ফেডারেল ব্যাংক কোন ভেরিফাই না করেই দ্রুত টাকা ট্রান্সফার করেছে। সন্দেহটা এখানেই এবং বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণও বটে। বর্তমান বাংলাদেশের কোন কাজে আমেরিকা জড়িয়ে গেলেই প্রথমে সন্দেহ এবং পরে ভয় লাগে।
ভয় লাগে নোবেলীয় মন্ত্রে হিলারী তন্ত্র এর সাথে যুক্ত আছে কিনা! একথা তো ঠিক রিজার্ভ চুরিতে একমাত্র বিব্রত হচ্ছে হাসিনা সরকার; আর কেউ না। হতেও তো পারে এসবের মূল টার্গেট তার সরকারকে বিব্রত করা। সরকারকে কঠিনভাবে বিব্রত করে জনগনের কাছে অজনপ্রিয় তথা ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে পদ্মাসেতু নিয়ে বিশ্বব্যাংককে দিয়ে এদের সম্মিলিত ষড়যন্ত্র কেলেঙ্কারীর কথা বেশীদিন আগের তো নয়!! -লেখকঃ যুগবার্তা, উপদেষ্টা সম্পাদক