হিজড়া রূপধারী চাঁদাবাজ ও হাতির কবলে আমরা

136

শাহানা হুদা রঞ্জনা।
ঢাকা শহরের রাস্তায় যানজট যেমন বেড়েছে, এরই সাথে তাল মিলিয়ে বেড়েছে নানা কিসিমের ভোগান্তি। আমি এখন বিভিন্ন ট্র্যাফিক সিগন্যালে পৌঁছানো মাত্র ঘুমের ভান করে বসে থাকি। হিজড়া নামধারী কিছু চাঁদাবাজের উপদ্রব থেকে বাঁচার জন্য আমার এই অভিনয়।
ঢাকায় এখন এমন কোনো সিগন্যাল নাই, যেখানে এরা জোরজবরদস্তি করে, আজেবাজে কথা বলে পথচারীদের বিব্রত করছে না।
এইতো কিছুদিন আগেও শুধু কাকলি ক্রসিং ও উত্তরার সিগন্যালে এদের দৌরাত্ম ছিল, কিন্তু এখন সবকটি সিগন্যালে এদের বিচরণ। দিব্যি ট্র্যাফিক পুলিশের নাকের ডগায় অত্যাচার চালিয়ে যাচ্ছে। এমন কী এরা বাসে উঠেও যাত্রীদের হয়রানি করছে।
এদের দাপটে সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা অন্য ভিক্ষুক, হকাররাও ঝামেলায় আছে। কারণ মানুষজন এদের হাতে নাজেহাল হওয়ার ভয়ে তাড়াতাড়ি তাদের হাতে টাকা ধরিয়ে দিয়ে ইজ্জত রক্ষা করছে।
হিজড়াদের দ্বারা নিগৃহীত হয়েছে, আমাদের এমন বন্ধুও আছে। ওর এই ঘটনা যখন ঘটেছিল, তখন সেটা ছিল বিচ্ছিন্ন একটি মজার ঘটনা। কিন্তু এখন এটা প্রতিনিয়ত ঘটছে, সবার সামনেই ঘটছে।
বাসা বাড়ি, অফিস, নবজাতকের পরিবার কেউই রক্ষা পাচ্ছে না। যত টাকা খুশি, তত টাকাই চাঁদা দাবি করছে। কী কারণে জানি না পুরুষরাই এদের দ্বারা নানাভাবে বেশি অপদস্ত হয়। আর তাই পুলিশ, ট্র্যাফিক পুলিশ, বাড়ির গার্ড, এমন কী র‌্যাব সদস্যদেরও এদের হাতে জিম্মি হতে দেখেছি।
হিজড়া জনগোষ্ঠী নিয়ে কাজ করে, এমন একজন বললো, ‘রাস্তায় যারা চাঁদাবাজি করছে, এরা কেউই আসল হিজড়া নয়। সবাই পুরুষ। ব্যবসা করবে বলে এই চেহারা ধারণ করেছে।’ তাহলে তো ব্যাপারটা তদন্তের দাবি রাখে। কিন্তু বেড়ালের গলায় ঘন্টি বাঁধবে কে? মানে সাহস করে তদন্তটা করবে কারা? তবে অবশ্যই এরা যে কুৎসিত কায়দায় চাঁদাবাজি করছে, এর একটা বিহিত হওয়া উচিৎ।
হাতি যখন চাঁদাবাজ: হিজড়া চাঁদাবাজ দেখে না হয় ঘুমানোর ভাব করছি; কিন্তু যখন হাতি তার শুর ঢুকিয়ে চাঁদা চায়, তখনতো ত্রাহি অবস্থা। সেদিন ধানমন্ডির ৪ নম্বর সড়ক দিয়ে যাচ্ছি আমি, নয়নতারা আর অনসূয়া। হঠাৎ দেখলাম একটি হাতি আমাদের বাহনের দিকে এগিয়ে আসছে। নয়নতারা অপার উৎসাহে হাতি হাতি বলে হৈ চৈ করে উঠলো। অনসূয়া ওকে মাহুত চেনাচ্ছে। আর আমি অভ্যাসবশত হাতির ছবি কাছ থেকে তুলবো বলে মোবাইল বের করার চেষ্টা করছি।
ঠিক সেই মুহুর্তে অনসূয়া আর নয়নতারার ভয়ার্ত চিৎকার। নয়নতারাতো কেদেঁই ফেললো। কারণ হাতি আমাদের পথ আটকে গাড়ির জানালা দিয়ে শুর ঢুকিয়ে চাঁদাবাজি করছে। ৫০ টাকা দেয়ার পর হাতি রেগে হুউম করে চেঁচিয়ে উঠল। ভয়ে ১০০ টাকা দিতে হল। অবশ্য তখন ভয়ে প্রাণ যায় যায়। হাজার টাকা দিতেও কেউ আপত্তি করতো না। কিন্তু এটা কী হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে। হাতিকে ব্যবহার করে এই চাঁদাবাজি চরম অপরাধ ও ভয়ংকর বিপদজনক।
হাতির প্রতি মাহুতের এই আচরণ পশু আইনের লংঘণ ও অমানবিক। সেদিন লালমাটিয়া এলাকাতেও হাতিকে দোকান থেকে চাঁদা তুলতে দেখা গেল। একে তো অসহনীয় যানজট, তাতে আবার গাড়ির হর্ণ, মানুষের চিৎকার, ফেরিওয়ালাদের হাঁকডাক, ছিনতাইকারী– তার উপর চাঁদাবাজ হাতি!!!
উটও বাদ যাচ্ছে না: এই ঘটনার পরপরই মানিক মিয়া এভিনিউতে লাইন ধরে উট যেতে দেখে আবার চমকে উঠলাম। ভাবলাম এই বুঝি উটও এক্ষুণি তার কুঁজ নামিয়ে বাহনের সামনে বসে পড়বে এবং গলা উচুঁ করে চাঁদা চাইবে।
কিন্ত না বাঁচা গেল, জানলাম এরা চাঁদাবাজ নয়, নিজেরাই চাঁদাবাজির শিকার হতে চলেছে। এই সারি সারি উট, অগণিত গরু, কয়েক পাল ছাগল জবাই করে এদের মাংস দিয়ে ভোজ হবে। আর একশ্রেণীর মানুষ সেটা খেয়ে দোয়া-খায়ের করবে।
শাহানা হুদা রঞ্জনা: সাংবাদিকতা জীবনে কাজ করেছেন বার্তা সংস্থা ইউএনবিতে। প্রেস ইন্সটিটিউট অব বাংলাদেশ, পিআইবিতেও প্রশিক্ষক ছিলেন। এখন সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’- এ।