হারমোনিয়াম

234

সর্বাণী মুখোপাধ্যায়ঃ রাতের অন্ধকার যখন ধীরে-ধীরে আবছা আলোয় পরিণত হয়, তখন আমাদের বাড়ির উলটো দিকের কৃষ্ণচূড়া গাছের উপর আঁকাবাঁকা শুকনো ডালপালা দিয়ে তৈরি বাসার মধ্যে কাক-দম্পতির আলাপ-আলোচনার ইচ্ছে জেগে ওঠে। ঠিক তখন সারা দিনের হাড়ভাঙা খাটুনির শরীর নিয়ে হাক্লান্ত ঘুমটাও আমার ভেঙে যায়। অবশ্য সে জন্য কাকেদের দোষারোপ করি না। যাকে দোষারোপ করা উচিত, তাকে দোষ দিতে মায়া হয়।
প্রতি দিন ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রাখে বড় বউদি। ভোররাতে মেয়ে বাবলিকে উঠিয়ে দেয়। তার পরেই আধো ঘুমে ডুবে থাকা একটা গলায় হারমোনিয়াম সহযোগে সারেগামা-র নানা কারিকুরি চলে। শুনছি, সামনের বছর থেকে টিভির বিভিন্ন চ্যানেলে গানের কম্পিটিশনে অডিশন দেবে বাবলি। প্রথম-প্রথম খুব বিরক্ত হতাম। কিন্তু এখন আর হই না। বরং মনে-মনে বাবলি আর তার মা’কে ধন্যবাদ দিই। আমাদের বাড়ি থেকে সোজা বেরিয়ে রাসবিহারী অ্যাভিনিউ ধরে হেঁটে গিয়ে সকাল সাড়ে ছ’টার মধ্যে যদি লেক মলের সামনে এসে দাঁড়াতে পারি, তবেই অফিসের বাসটা ধরতে পারব। কোম্পানি মাস দুই হল এই বাস সার্ভিস শুরু করেছে, একেবারে নিখরচায়। কালীঘাট থেকে পৈলান যেতে আগে কালঘাম ছুটে যেত। তার বদলে এসি বাসের আরাম। বাবলির উপর আর রাগ করতে পারি?
আজও সকালে অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছিলাম, এমন সময় মা এসে ঘরে ঢুকল। প্রতি দিনই খুব ভোরে স্নান সেরে গরদের শাড়ি পরে ঠাকুরঘরে ঢোকে মা। তার পর ধূপকাঠি নিয়ে গোটা বাড়ি ঘুরে ব্যাক টু ঠাকুরঘর। আজও ধূপকাঠি ঘোরাতে-ঘোরাতে মা বলল, ‘ফেরার সময় এক বার তুই তোর রাধুজ্যাঠার বাড়ি হয়ে আসতে পারবি?’
‘কেন?’
‘ওদের বাড়িতে একটা ভাল স্কেল-চেঞ্জিং হারমোনিয়াম আছে। বড় বউমা বলছিল, যদি ওটা বিক্রি করে দেয়। ওদের বাড়িতে কে এ সব ব্যবহার করবে! অমন একটা হারমোনিয়ামের এখন অনেক দাম। যদি কিছু কমসম হয়…’
‘এ জন্য তুমি এই সাতসকালে বলতে এলে? আমি ওদের বাড়ি গিয়ে বলবটা কী? জ্যাঠা, হারমোনিয়াম বেচবে! তার পর এই নিয়ে আত্মীয়মহলে রাষ্ট্র করে বেড়াক, আর আমি মরি। চিনি তো জেঠিমাকে!’
মা একটু বিব্রত হয়ে বলল, ‘আহা, ও ভাবে বলবি কেন? একটু বুঝিয়ে-সুঝিয়ে যদি…’
‘আচ্ছা-আচ্ছা দেখব, যদি পারি। এখন আসছি,’ বলেই জুতো হাতে নিয়ে সিঁড়ি ভেঙে সোজা রাস্তায়।
বাসে যেতে-যেতে মায়ের কথাগুলো আমার মাথায় ঘুরপাক খেতে লাগল।
রাধুজ্যাঠার পরিবারটাকে অদ্ভুত বললেও কম বলা হয়। সখেরবাজারের কাছে বহু দিনের পুরনো পৈতৃক বাড়িতে বাস। রাধানাথ, মানে রাধুজ্যাঠারা তিন ভাই। রাধানাথ, আদিনাথ আর দিবানাথ। এরা সকলে আমার বাবার মামাতো ভাই। যখন ক্লাস থ্রি-তে পড়ি, সেই সময় বাবার হাত ধরে প্রথম ওদের বাড়ি গিয়েছিলাম। মান্ধাতা আমলের একটা বাড়ি। রাধুজ্যাঠার ঠাকুরদাদা নাকি এটা তৈরি করেছিলেন। এক তলায় রাধুজ্যাঠা তাঁর দুই ছেলে আর বউকে নিয়ে থাকেন। দোতলায় অন্য দুই ভাই। তখন আমি ছোট। সে ভাবে কিছুই বুঝিনি। কিন্তু এটুকু বুঝতে পেরেছিলাম, একতলার পরিবারটির প্রতি দোতলার বাসিন্দাদের বিপুল ক্ষোভ। নীচের তলার বাসিন্দাদের মনোভাবও একই। আজ ভাবলে হাসি পায়, কিন্তু দীর্ঘ দিন ধরে আমার মনে এই ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে, রাধুজ্যাঠারা হল আদিকাকা আর দিবাকাকার ভাড়াটে। কারণ, কোনও অনুষ্ঠানে গিয়ে আমি কোনও দিন তিন ভাইকে বা তাদের বউদের একে অপরের সঙ্গে কথা বলতে দেখিনি। একটু বড় হয়ে বুঝতে পেরেছিলাম, পুরোটাই সম্পত্তিঘটিত অশান্তির ফল। তার পর একে-একে আদিকাকা, দিবাকাকা অন্যত্র বাড়ি কিনে চলে গেল। কারণ পুরনো বাড়িতে জলের কষ্ট। ভাগে মাত্র একখানা করে ঘর। তা ছাড়া সিলিং থেকে প্লাস্টার খসে পড়ছে। এমন পুরনো বাড়িতে মিস্ত্রি লাগানো মানে হাজার-হাজার টাকার ধাক্কা। রাধুজ্যাঠা এক পয়সাও দিতে নারাজ।
আদিকাকার মেয়ের বিয়েতে গিয়ে শুনেছিলাম, কাকিমা মা’কে ফিসফিস করে বলছেন, ‘বলিহারি যাই বড়দিকে, দু-দুটো ছেলের চুলে পাক ধরে গেল, তবু একটারও বিয়ে দিল না। এ দিকে যক্ষের মতো টাকার পুঁটলি আর হারমোনিয়াম গলায় বেঁধে আছে বড়দা। বলে, ছেলেরা নাকি বিয়ে করতে চায় না! ভাবো! ছেলে দুটোও তেমন। একখানা ঘরে চার জন মিলে গুঁতোগুঁতি করছে। অথচ দুটোই ভাল রোজগার করছে। দোতলার ঘর দুটো ভেঙে পড়ছে, একটা ফ্ল্যাট তো অন্তত কিনতে পারতিস। ওই বাড়িটা বিক্রি হলে আমাদেরও তো কত সুবিধা হত, বল তো? সেই তো মেয়ের বিয়ের জন্য জমা টাকাতেই হাত দিতে হল। নেহাত গলির মধ্যে বাড়িটা। নইলে এত দিনে প্রোমোটারের দাপাদাপিতে টিকতে পারত?’
সে দিন মা’কে চাপা গলায় জিজ্ঞাসা করতে শুনেছিলাম, ‘বড়দির সেই হারমোনিয়ামটা আছে এখনও?’
‘আছে মানে, দুজনে মিলে তার সেবাযত্ন করছে কত! অথচ এক জনেরও তো গলা টিপলে সা বেরবে না। হ্যাঁ, গাইতে পারত বড়দির বোন। কিন্তু এই যে, বাপের সম্পত্তি যা পেয়েছে, এনে ঘরে বন্ধ করেছে। বোন ভোগ করবে, এটা বোধহয় ঠিক সহ্য হবে না।’
অফিসে সে দিন আমার কিছুতেই কাজে মন বসছিল না। খেতে-খেতে বন্ধু তূণীরকে বললাম, ‘হ্যাঁ রে, এখন একটা স্কেল-চেঞ্জিং হারমোনিয়ামের কেমন দাম?’ তূণীর খেতে-খেতে বলল, ‘ভালই দাম, তবে ঠিক কত বলতে পারব না। এক বার ইন্টারনেটে দেখে নে না!’
কথা বাড়ালাম না। কাল রবিবার, ছুটির দিন, প্রায় বছরখানেক ও দিকে যাওয়া হয়নি। না, এক বার ঘুরেই আসা যাক।
রাধুজ্যাঠার বাড়ির সামনে যখন এলাম, তখন সাতটা বেজে গিয়েছে। মরচে ধরা তারের জালের গেটটা পেরিয়ে ইট-পাতা রাস্তা। তার এক পাশে বেঁটে-বেঁটে বুনো গাছের জটলা। চটা-ওঠা ফোকলা দাঁতের পাটির মতো খানকতক সিঁড়ি ভেঙে দালানে পা রাখতেই ব্ল্যাক-আউট। এত ক্ষণ রাস্তার আলোর যে ভগ্নাংশ পথ দেখাচ্ছিল, তা হঠাৎ উধাও। পকেট থেকে মোবাইল বের করে টর্চ জ্বেলে ডাকলাম, ‘জেঠু বাড়ি আছ?’ সঙ্গে-সঙ্গে ম্যাজিকের মতো কাজ হল। সামনের বন্ধ দরজা খুলে গিয়ে টিউবলাইটের আলো এসে পড়ল আমার মুখে। লালপেড়ে সাদা শাড়ি আর কপালে আধুলির সাইজের বড় সিঁদুরের টিপ পরা জেঠিমা বেরিয়ে এসেই এক গাল হেসে বলল, ‘ও মা, আবির যে। এত দিনে আমাদের মনে পড়ল?’ প্রণাম করে বললাম, ‘জেঠু কই? দাদারা?’
‘জেঠু শুয়ে আছে। তোর বড়দা পুরী গিয়েছে বন্ধুদের সঙ্গে। হাবুল দোকানে গিয়েছে। ওই দেখ, বলতে বলতেই এসে গিয়েছে।’
এক হাতে একটা বড় ঠোঙা আর অন্য হাতে টর্চ নিয়ে ঢুকল জেঠুর ছোট ছেলে হাবুলদা। চল্লিশের কোঠা বছর দুই আগে পেরিয়ে গিয়েছে। রাজ্য সরকারি অফিসের চাকুরে। ভাল মাইনে পায়। অথচ পরনে রংচটা নীল পাঞ্জাবি আর কুঁচকোনো পায়জামা। চুলের ফাঁকে রুপোলি রেখা।
আমাকে দেখে একগাল হেসে বলল, ‘কী রে ডুমুরের ফুল, পথ ভুলে না কি? সুবলের দোকানের খাঁটি ঘিয়ে ভাজা গরম সিঙাড়া নিয়ে এসেছি,’ বলে জেঠিমার হাতে ঠোঙাটা দিল।
হাসি পেল। আজকের দিনে খাঁটি ঘিয়ের সিঙাড়া! হাসি চেপে হাবুলদাকে প্রণাম করতে যেতেই আমাকে ধরে ফেলল। ‘দূর, ও সব প্রণাম-ট্রনাম রাখ তো? কত দিন পরে এলি। বাবা, দেখো কে এসেছে!’
একটা ঘরে যে এতগুলো জিনিস কী ভাবে রেখে চার জন মানুষ থাকতে পারে, ভাবতেই বিষম খেলাম।
‘কে? ও আবির, আয় আয়। সাবধানে। ডান দিক ঘেঁষে আয়। বাঁ দিকের ছাদটা আবার…’ উপরে তাকিয়ে দেখি, সিলিং জুড়ে মস্ত ত্রিপলের চাঁদোয়া খাটানো। দাঁড়িয়ে আছি দেখে পুরনো দিনের ছত্রি লাগানো খাটের মধ্য থেকে রুগ্‌ণ সারসের মতো শীর্ণ গলা বাড়িয়ে রাধুজ্যাঠা আমাকে অভয় দিল। মেঝেতে রাখা নানা সাইজের বাক্স, পুঁটুলি, ঘড়া, ট্রাঙ্ক ডিঙিয়ে এসে জেঠুকে প্রণাম করলাম।
‘থাক থাক, বেঁচে থাকো বাবা। কত দিন পরে দেখলাম! তোর বাবা ড্যাং-ড্যাং করে স্বর্গে চলে গেল, তাই বলে তোরাও আমাদের ভুলে যাবি?’
ইতিমধ্যেই আমার সামনে দুটো সিঙাড়া, বিস্কুট, চা দিয়ে গিয়েছে জেঠিমা। এলোমেলো কিছু কথা বলার পর মনে-মনে ঈশ্বরের নাম জপ করে বলেই ফেললাম, ‘জেঠু, তোমাদের একটা হারমোনিয়াম ছিল না? আছে এখনও?’
‘নিশ্চয়ই, তবে ওকে শুধু হারমোনিয়াম বলিস না। এ হচ্ছে একটা শিল্পদ্রব্য। বেলো, বায়ুপ্রকোষ্ঠ, চাবি, আর রিড দিয়ে তৈরি। ওই তো, দেখ না।’ বাঁ দিকে ফিরে দেখি, বিছানার এক পাশে একটা ছোট্ট টেবিলের উপর সাদা লেসের টেবিলক্লথ দিয়ে ঢাকা দেওয়া সেই বিশেষ বাদ্যযন্ত্র।
জেঠু রুমাল দিয়ে নাক মুছতে মুছতে বলল, ‘ছোটবেলায় বাবার কাছেই দেখেছি খোদ ডোয়ার্কিনের হারমোনিয়াম। এ দেশে ওদের কারখানাতেই প্রথম হারমোনিয়াম তৈরি হত। কী তার মিঠে আওয়াজ! আমার দিদিরা ওটা নিয়ে গলা সাধত। তার পর ছোড়দির বিয়েতে বাবা ওটা দিয়ে দিল। দশ হাতে পড়ে সেটার দফাও ঘুচল।’ জেঠু দীর্ঘশ্বাস নিল।
‘এই জন্যেই তো তোমাদের বাড়ি এসে আমি কাউকে এতে হাত দিতে দিইনি। যা সব বেআক্কেলে লোক এ বাড়িতে,’ জেঠিমা খ্যানখেনে গলায় বলে চলল, ‘তোমাদের হারমোনিয়াম কি আর স্কেল-চেঞ্জিং ছিল? আমার বাবা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে এই হারমোনিয়াম তৈরি করেছিল, তা জানো? মেজদা পরে আরও কত খরচাপাতি করেছে এর জন্য। এখন তিরিশ হাজারের কম হবে না এর দাম। হঠাৎ হারমোনিয়ামের কথা?’
বাপ রে, হারমোনিয়ামের বাজারদরও জেঠিমার মুখস্থ? শুকনো গলায় বললাম, ‘না না, ইয়ে মানে, বড়দার মেয়ে বাবলি ভাল গান করে তো, টিভিতে গানের কম্পিটিশনগুলোতেও এ বার নাম দেবে ভাবছে। তাই ওরা একটা ভাল হারমোনিয়াম খুঁজছে। তাই ভাবছিলাম, কেমন হারমোনিয়াম কেনা যায়, এই আর কী।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, শুনেছি, বাবলি খুব ভাল গান গায়। ওর জন্য এমন হারমোনিয়ামই দরকার।’
জেঠু দাঁত খিঁচিয়ে বলল, ‘আর বোলো না। যা হারমোনিয়াম, কাঠের গায়ে উই ধরে যাচ্ছে।’
জেঠিমা চোখ পাকিয়ে বলল, ‘সেটা হারমোনিয়ামের দোষ না তোমার বাড়ির দোষ? কড়িকাঠে উই, দেওয়ালে উই, জানলার পাল্লায় উই, যে দিকে তাকাব সে দিকেই উই। আর দোষ হল আমার হারমোনিয়ামের?’
জেঠু এ বার উত্তেজিত হয়ে বলল, ‘খুব তো স্কেল-চেঞ্জিং হারমোনিয়ামের বড়াই করছ! এ দিকে তো রিডে সা টিপলে মা বেরোয়। একদম অপয়া মাল!’
জেঠিমা জেঠুর নাকের কাছে হাত নেড়ে বলল, ‘কী বললে, অপয়া? এতই বাজে তো হারমোনিয়ামকে গলায় ঝুলিয়ে বসে আছ কেন? দাও না দান করে, পুন্যি হবে।’
জেঠু একটু থতমত খেয়ে বলল, ‘ওটা তো তোমার বাপের বাড়ির সম্পত্তি। আমি দান করার কে?’
‘ও, তাই নাকি? বেশ, দিলাম অনুমতি, যাও, যা খুশি করো। এই তো আবির আছে। হ্যাঁ রে আবির, নিবি এটা?’
আমি এত ক্ষণ কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা আসামির মতো দু’পক্ষের যুক্তি শুনছিলাম। হঠাৎ করে এমন প্রস্তাব শুনে মনে হল, আকাশের চাঁদটা কি ভুল করে আমার কোলে এসে পড়ল?
আমতা-আমতা করে বললাম, ‘এমন ভাল হারমোনিয়াম জেঠিমা, এত দামের জিনিস…’
‘রাখ তোর দাম। আমি কি এটা তোকে বেচতে যাচ্ছি? তোর মা’কে বলবি, ওর নাতনিকে এটা আমি উপহার দিলাম। কিন্তু একটা শর্ত আছে। এই হারমোনিয়াম নিয়ে অভ্যেস করে বাবলিকে মেডেল জিতে আনতে হবে। নইলে ফের এটা ফেরত নিয়ে আসব। বলে কিনা অপয়া মাল!’ এক দমে কথাগুলো বলে হাঁপাতে থাকে জেঠিমা।
আমি আর কথা বাড়ালাম না। নিজের ভাল পাগলেও বোঝে। বেশি কথা বলতে গেলে যদি জেঠিমার আবার মত পালটে যায়! বাড়ি ফিরলে কী রকম নায়কোচিত অভ্যর্থনা পাব, ভাবতে-ভাবতে একটা ট্যাক্সি ডেকে এনে হাবুলদা আর আমি হারমোনিয়ামটাকে ঘর থেকে বের করলাম। কাঠের বাক্সের গায়ে সত্যি উই ধরলেও হারমোনিয়ামটা দেখলে কিন্তু চোখ জুড়িয়ে যায়। ট্যাক্সির দিকে যেতে যেতে চুপিচুপি হাবুলদাকে বললাম, ‘দেখো, তোমাদের কোনও আপত্তি নেই তো?’
হাবুলদা একগাল হেসে বলল, ‘দূর, জন্মে আমরা ওই জিনিসে হাত দিলাম না! নিয়ে যা, নিয়ে যা। ব্যবহার না হয়ে শেষে ওটা ফেলেই দিতে হবে। তোদের বাড়ি গেলে হারমোনিয়ামটা হাত-পা ছড়িয়ে বাঁচবে। এখানে এইটুকু জায়গায়…’
এ বার আমি না বলে পারলাম না, ‘তোমরা একটা বাড়ি বা ফ্ল্যাট কিনতে পারো তো। এখানে এ ভাবে থাকো কী করে?’
হাবুলদা মাথা নাড়তে-নাড়তে বলল, ‘ওরে, এ বাড়ি হল বাবার ঠাকুরদার সম্পত্তি। যে সব জিনিস দিয়ে তৈরি, আজকালকার বাজারে সে সব পাওয়াই যায় না। আর আমরা তো আর সংসার করতে যাচ্ছি না। ও সব সকলের জন্য নয়, বুঝলি? সম্পত্তি বাড়ালেও রক্ষা করার ঝঞ্ঝাট। তার চেয়ে বাবা ব্যাঙ্কে টাকা থাক, শেষ জীবন তোফা কাটবে। কোন ফ্ল্যাটে যাব? ন’ভাগ বালি আর এক ভাগ সিমেন্ট দিয়ে তৈরি! দু’দিন বাদে ধপাস। তার চেয়ে এই তো বেশ চলে যাচ্ছে।’
মুখে এসে গিয়েছিল, এখানেও তো মাথায় ছাদ ভেঙে পড়ার মতো অবস্থা। কিন্তু কিছু বললাম না। কম দিন এদের দেখছি না। এরা এমন পরিবর্তনহীন বদ্ধ জীবনটাকেই ভালবাসে। জেঠিমার যত দোষই থাক, এটা মানতেই হবে, জ্যাঠার মতো পাগলাটে মানুষের খেয়ালকেও তিনি একটুও অশ্রদ্ধা করেন না। একটা ছোট্ট ঘরে ঐতিহ্য আঁকড়ে থাকা জীবন যখন এরা স্বেচ্ছায় বেছে নিয়েছে, তখন আর ভাল করার চেষ্টা করে কাজ নেই।
রাধুজ্যাঠা সদর দরজায় এসে দাঁড়িয়েছিল। দালান পেরিয়ে গেটের কাছে এসে যখন মুখ ফিরিয়ে তাকালাম, দেখতে পেলাম, জ্যাঠার চোখের কোণে জল চিকচিক করছে। কত দিনের এক প্রিয়জন যেন তাকে ছেড়ে যাচ্ছে।
বউদি আর বাবলি কোমর বেঁধে নেমে পড়েছে, যে কোনও কম্পিটিশন জিতে একটা চ্যাম্পিয়ন তকমা আনতেই হবে। হারমোনিয়ামটা ধরে রাখতে হবে তো। জেঠিমার শর্তটা চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে কিনা!-সূত্র: ফেইসবুক