হাওর অঞ্চলের বিষাক্ত পানি ও দুর্গত পরিস্থিতি

42

মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম তালুকদারঃ হাওড়-বাঁধ দুর্নীতির প্রেক্ষিতে সুনামগঞ্জে অকাল বন্যায় শত শত কোটি টাকার ফসলহানী, দুর্গত অবস্থা দুর্নীতি বিরোধী তরুণ মুভমেন্ট ও পরিস্থিতি উত্তরণে সার্বজনীন দাবি এবং অতঃপর মহামান্য রাষ্ট্রপতির আগমনে আশার আলো। কিন্ত ব্যাপৃত ও তীব্রভাবে হাওরের পানি দূষণ এবং তার ফলে ব্যাপকভাবে হাওরের জীব-বৈচিত্রের মড়ক আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
প্রাথমিকভাবে যদিও ধারণা করা হয়েছিল কাঁচাধান পঁচে যে আমোনিয়া গ্যাস সৃষ্টি হয় তার কারণেই মাছের মড়ক দেখা দিচ্ছে, কিন্তু যখন ক্রমেই পানির রং পরিবর্তিত হতে থাকল এবং পানি নর্দমার পানির মত দুর্গন্ধযুক্ত হয়ে উঠল এবং হাঁস ও হাওড়ের ব্যাঙসহ অন্যান্য জীব-বৈচিত্রের মড়ক প্রবণতা দেখা দিল তখন আশঙ্কা করা হল সুনামগঞ্জের হাওরসংলগ্ন ভারতের মেঘালয় সীমান্তের কাছে গড়ে উঠা উন্মুক্ত ইউরেনিয়াম খনির তেজস্ক্রিয়তায় ইউরেনিয়াম পানিতে ছড়িয়ে পড়েছে।
এমতাবস্থায় প্রথমত, অনতিবিলম্বে বিশেষজ্ঞ টিম পাঠিয়ে ব্যাপৃত ও তীব্রভাবে হাওরের পানি দুষণের কারণ অনুসন্ধান ও তার প্রতিকারের ব্যাবস্থা গ্রহণ জরুরি। বলার অপেক্ষা রাখেনা পানি একটি প্রবাহমান তরল পদার্থ। এই দুষিত পানি প্রবাহিত হয়ে দেশের বিভিন্ন জায়গায় কম-বেশি নেতিবাচক প্রভাব রাখতে পারে এবং এমনকি দেশব্যাপী জীব-বৈচিত্র বিপর্যয়ের ও মানুষের স্বাস্থ্য ঝুকি বৃদ্ধির কারণ হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, আমোনিয়া গ্যাসক্রিয়া থেকে পানিকে পরিশোধিত করার ব্যাবস্থা অবশ্যই মৎস্য বিভাগ, বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর,পানি উন্নয়ন বোর্ড এবং দুর্যোগ ব্যাবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের থাকা উচিৎ। এবং ভারত যখন ইউরেনিয়াম খনি চালু করেছে তখন অবশ্যই তার পরিবেশগত ঝুকি এবং তার প্রতিকার ও নিরাময় ব্যাবস্থা রেখে করেছে। এখন সরকারের উচিত তড়িৎ কার্যকরী ব্যাবস্থা নেয়া। একটি রাষ্ট্রের সামর্থ্য শুধু তার প্রবৃদ্ধি ও উন্নয়ন গতির উপর নির্ভর করেনা, বিপর্যয় প্রতিরোধ ও মোকাবেলায় তার সামর্থ্য ও প্রশাসনিক দক্ষতার উপরও নির্ভর করে।
তৃতীয়ত, বিষয়টি এখন আর দুর্যোগপূর্ণ বা দুর্গত এলাকা ঘোষণার দাবির মধ্যে নেই, এটি চরম পরিবেশগত ও জীব-বৈচিত্র বিপর্যয়ের মধ্য দিয়ে মানবিক বিপর্যয়ের দ্বার-প্রান্তে। আরও কাল-বিলম্ব করলে সম্ভাব্য মানবিক বিপর্যয় ঠেকাতে সরকারের, এমনকি রাষ্ট্রের সক্ষমতার প্রশ্ন আসতে পারে। এটি এখন মানুষের মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুকি ও জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এটি ব্যাঙ নিয়ে গবেষণাগারে এক্মেপেরিমেনটের বিষয় নয়।
চতুর্থত, সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ সাপেক্ষে ভারতকে অবশ্যই তার কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত বিপর্যয় মোকাবেলায় তড়িৎ প্রতিকার ও নিরাময় সহায়তা ও ন্যায্য দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। কিন্তু তার জন্য সরকারকে জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে।
পঞ্চমত, সম্ভাব্য মানবিক বিপর্যয় বা স্বাস্থ্য ঝুকি মোকাবেলায় স্থানীয় হাসপাতালগুলোর পর্যাপ্ত প্রস্তুতি থাকতে হবে। এবং বিষাক্ত পানি থেকে বাঁচতে ভূমিতে উভচর প্রাণী সাপের উপদ্রপ বারতে পারে বিদায় স্থানীয় হাসপাতালসমূহে পর্যাপ্ত এনটিভেনম ইনজেকশন রাখতে হবে। অন্যদিকে রাজনৈতিক দল ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জনস্বার্থে ব্যাপক ভিত্তিক জনসচেতনতামূলক ও নানা ধরণের সেবা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতামুলক ব্যাপক কমসুচি গ্রহণ করতে হবে।
ষষ্ঠত, মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুকির কথা বিবেচনা করে এখন মড়ক মাছত খাওয়াই যাবেনা, এমনকি হাওরের স্বাভাবিক মাছ বা হাওরের পানি সবজি-ফল না খাওয়া এবং যথাসম্ভব হাওর ও নদীর পানির ব্যাবহার এড়িয়ে চলা প্রয়োজন বিবেচিত হয়।
অধিকন্ত, মহামান্য রাষ্ট্রপতির মূল্যবান প্রতিশ্ররুতির পর অকাল বন্যা ও ফসলহানীতে বিপর্যস্ত পরি¯ি’তি মোকাবেলায় আসন্ন সরকারি সহায়তা ও সম্পদ বন্টনের ন্যায্যতা নিশ্চিত করণের জন্য সামাজিক জবাবদিহিতা কৌশল – যেমন , নাগরিক সাংবাদিকতা এবং সোসাল মিডিয়া ও অনলাইন রিপোরটিং, দুর্নীতিবিরোধী অব্যাহত তরুণ আন্দোলন ও বণ্টন ব্যবস্থাপনায় অংশগ্রহণমূলক পর্যবেক্ষণ, এবং মিডিয়া পর্যবেক্ষণ ও নিয়মিত প্রতিবেদন –এর উপর আলোকপাত করা যেতে পারে। সুনামগঞ্জের প্রত্যেক থানায় যুবকদের সেচছাসেবক-মনিটরিং কমিটি গঠন করতে হবে।
প্রত্যাশিত সরকারি সহায়তা হতে পারে জরুরি ত্রাণ, অনুদান, পুনর্বাসন, ভর্তুকিকৃত সরকারী দামে পর্যাপ্ত খাদ্য সরবরাহ, এবং পর্যাপ্ত কৃষি ও সাধারণ ঋণ। জেলার সকল কৃষকের ও দ্ররিদ্র মানুষের ভর্তুকিকৃত সরকারী দামে পর্যাপ্ত খাদ্য ক্রয়ের অধিকার বছরব্যাপী নিশ্চত করতে হবে। পর্যাপ্ত ডিলার প্রয়োজন যাতে মধ্যবিত্ত লম্বা লাইনে বিব্রত না হয়। বণ্টন নীতিমালা ন্যায্য ভিত্তিক হওয়া এবং যথাযথভাবে অনুসৃত হওয়া প্রয়োজন। স্লোগান হোক এতে ‘ন্যায্য বন্টন ব্যবস্থাপনা চাই’ এবং যেকোন স্তরে যেকোন প্রকার ‘দুর্নীতির জন্য জিরো টলারেন্স’।
এনজিও ঋণের কিস্তি মওকুপের বা স্তগিতের জন্য এনজিও নির্বাহী প্রধানদের বরাবর স্মারকলিপি প্রধান করতে হবে। জরুরি সহায়তার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় বেসরকারি উন্নয়ন প্রতিষ্ঠান ব্রাকের চ্যায়ারপারসন এবং সিলেট অঞ্চলের কৃতি সন্তান জনাব ফজলে হাসান আবেদের সাথে স্মারক লিপিসহ দেখা করা যেতে পারে। পাশাপাশি দুর্নীতিবিরোধী মুভমেন্ট অব্যাহত রাখতে হবে। যারা দুর্নীতি করেছে আর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে যারা দুর্নীতিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছে বা জবাদিহি নিশ্চিত না করে দায়িত্বে অবহেলা করেছে সবার বিরুদ্দে দুর্নীতিবিরোধী শ্লোগান ও মুভমেন্ট অব্যাহত রাখতে হবে।
বাঁধ সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি ও পরিবেশবান্ধব সমাধানের জন্য শীঘ্রই পানি ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ প্রফেসার ড. আইনুন নিশাত এবং পরিবেশ ও সুশাসন বিশেষজ্ঞ প্রফেসার ড. নিয়াজ আহমেদ খানের সাথে পরামর্শ করে কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হবে। তাদের দুজনেরই সুনামগঞ্জের জন্য বিশেষ দরদ আছে, কারণ দুজনই ভিন্ন ভিন্ন সময়ে প্রকৃতি সংরক্ষণের জন্য আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন (International Union for Conservation of Nature) এর বাংলাদেশ চ্যাপ্টার এর প্রধান ছিলেন এবং সেইসূত্রে টাংগুয়ার হাওরের নান্দনিকতা ও তার জীব-বৈচিত্র সুরক্ষার দায়িত্বে ছিলেন।
চেষ্টা করা হবে তাদেরকে সুনামগঞ্জে নিয়ে আসতে, যাতে করে আমাদের সাথে মতবিনিময় করে পর্যবেক্ষণমুলক পরামর্শ তারা প্রদান করতে পারেন। অতঃপর চলবে স্থায়ি সমাধানের কৌশলপত্র নিয়ে কৃষক, ছাত্র, যুবক, সংবাদ কর্মী, আইনজীবী, কবি-কলাম লেখকদের সম্মিলিত আন্দোলন। অধিকার আদায় না হওয়া পর্যন্ত মুভমেন্ট চলবে। প্রয়োজন হলে সচিবালয়, মন্ত্রণালয়, কেবিনেট ডিভিশন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সব জাগায় যাওয়া হবে। সাথে চলবে মিডিয়া প্রতিবেদন ও নির্বাচিত প্রবন্ধ।
যে অঞ্চলে দেশের সবচেয়ে বেশি সম্পদ সেই অঞ্চলই সবচেয়ে অবহেলিত, অনুন্নত ও সমস্যা জর্জরিত। এটা এই অঞ্চলের জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি, বিশেষ করে সাংসদদের অদক্ষতা এবং সামাজিক জবাবদিহিতা ও দায়বদ্ধতার অভাব, এমনকি ক্ষেত্রবিশেষে কারও কারো ব্যাপক ভিত্তিক দুর্নীতিসম্পৃক্ততা ও স্বার্থের সংঘাত (যেমন, নিজ নির্বাচনী এলাকায় নামে-বেনামে ঠিকাদারি করা, হাওর-বিল, পাথর-বালির দখল) ইত্যাদি বড় কারণ। প্রতিদিনই সুনামগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলায় ও জেলা সদরে ছাত্র, যুবক, আইনজীবী ও সংবাদ কর্মীদের দাবি আদায়ের শ্লোগান ও প্রতিবাদী মুভমেন্টের প্রতিবেদন দেখছি। যেখানে এমন বিপ্লবি সোনার ছেলেরা আছে সেখানে এরূপ অন্যায়-অবিচার, সীমাহীন দুর্নীতি ও লূটপাঠের রাজত্ব আর চলতে পারে না । এটা হোক প্রজন্মের প্রতিশ্রুতি ও দায়বদ্ধতা।।

লেখক শাসনব্যবস্থা ও উন্নয়ন অর্থনীতি বিষয়ক গবেষক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক পোস্ট গ্রাজুয়েট কার্যনির্বাহী কমিটির চেয়ারপার্সন, জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন প্রতিষ্ঠান (নিডা),ব্যাংকক। বাড়িঃ ধর্মপাশা-সুনামগঞ্জ। ইমেইল: rafiqul.talukdar@gmail.com