হাই কোর্টে তারেক রহমানের ৭ বছর কারাদণ্ড

34

যুগবার্তা ডেস্কঃ মুদ্রা পাচার মামলায় নিম্ন আদালতের খালাসের রায় বাতিল করে বিএনপি নেতা তারেক রহমানকে সাত বছরের কারাদণ্ড ও ২০ কোটি টাকার অর্থদণ্ড দিয়েছে হাই কোর্ট।
সেই সঙ্গে তারেকের বন্ধু ও ব্যবসায়িক অংশীদর গিয়াসউদ্দিন আল মামুনের সাত বছরের কারাদণ্ডও বহাল রাখা হয়েছে। তবে তাকে বিচারিক আদালতের দেওয়া ৪০ কোটি টাকা অর্থদণ্ড কমিয়ে ২০ কোটি টাকা করা হয়েছে।
মামুনের আপিল খারিজ এবং দুদকের আপিল মঞ্জুর করে বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি আমির হোসেনের হাই কোর্ট বেঞ্চ বৃহস্পতিবার আলোচিত এ মামলার রায় ঘোষণা করে।
ঘুষ হিসেবে আদায়ের পর ২০ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগে করা এ মামলার রায়ে ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ মো. মোতাহার হোসেন ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর তারেককে বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন। আর গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে দেওয়া হয়েছিল সাত বছর কারাদণ্ড এবং ৪০ কোটি টাকা জরিমানা।
খালেদা জিয়ার ছেলে বিএনপির জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক বিভিন্ন মামলা মাথায় নিয়ে ২০০৮ সাল থেকে যুক্তরাজ্যে রয়েছেন। শেখ হাসিনা হত্যাচেষ্টাসহ আরও দুর্নীতি, রাষ্ট্রদ্রোহ ও মানহানীর অভিযোগে কয়েক ডজন মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
আর জরুরি অবস্থার মধ্যে ২০০৭ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে গিয়াসউদ্দিন আল মামুন কারাগারেই আছেন।
বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোও মুদ্রা পাচারের আরেকটি মামলায় দণ্ডিত হয়েছিলেন। কারাদণ্ডাদেশ মাথায় নিয়ে বিদেশে অবস্থানরত অবস্থায় গতবছর তার মৃত্যু হয়।
রায়ে হাই কোর্ট তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সাজা পরোয়ানা জারির নির্দেশ দিয়েছে বিচারিক আদালতকে।
পলতক তারেক রহমান আত্মসমর্পণ করলে বা তাকে গ্রেপ্তার করা গেলে সেই সময় থেকে তার দণ্ড কার্যকর হবে বলে হাই কোর্ট জানিয়েছে।
জজ আদালতের রায়ে বলা হয়, ওই টাকা খরচ করার কথা তারেক রহমান অস্বীকার করেননি। ২০০৭ সালে দুদকে দাখিল করা তারেকের হিসাব বিবরণীতে তার উল্লেখ রয়ছে। তিনি যে মানি লন্ডারিং আইনে অপরাধ করেছেন তা প্রমাণ হয়নি।
ওই রায় বাতিল করে হাই কোর্ট বলেছে, “এটা ফাইনানশিয়াল ক্রাইম। দুর্নীতির উদ্দেশ্যে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপে এ ধরনের অর্থ পাচার টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে বাধা। সময় এসেছে এসব অপরাধ বন্ধ করার।”
‘স্তম্ভিত, হতবাক’
রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় তারেকের অন্যতম আইনজীবী মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, “আমরা স্তম্ভিত, হতবাক।” তিনি জানান, গিয়াসউদ্দিন আল মামুন আপিল করবেন। আপিলে ‘পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার’ মিলবে বলে তারা আশা করছেন।
‘কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়’
রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় খুরশীদ আলম খান বলেন, “এই রায়ে প্রমাণিত হল- কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। যে যত বড়ই হোক না কেন, আইন অমান্য করলে তাকে আইনের আওতায় আসতে হবে।”
রায় থেকে উদ্ধৃত করে এই আইনজীবী বলেন, “আদালত বলেছেন, এখন সময় এসেছে নতুন করে চিন্তা ভাবনা করার। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও অর্থ পাচার অঙ্গাঙ্গী দুটি ব্যাপার। এ ব্যাপারে সচেতন হতে হবে।”
খুরশীদ আলম খান বলেন, তারেক-মামুন যে অপরাধ করেছেন, তা ঘটানো হয়েছে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে।
২০০২ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৫০টি মুদ্রাপাচার মামলা দুদক পরিচালনা করে আসছে, যার মধ্যে এই প্রথম হাই কোর্টে কোনো মামরায় সাজার রায় হল বলে জানান এই আইনজীবী।
তারেকের আপিল
আসামিপক্ষের অপর কৌঁসুলি জালালউদ্দিন বলেছেন, তারেক রহমান দেশের বাইরে থাকায় তিনি আপিল করবেন কি না, সে সিদ্ধান্ত জানানো হবে পরে। আমরা আইন দেখব, তার সঙ্গে আলোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেব। তবে নিয়ম অনুযায়ী আপিল করতে হলে তারেককে আত্মসমর্পণ করতে হবে বলে জানিয়েছেন দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। তিনি বলেন, “সে পলাতক, আপিল করতে হলে আগে তাকে আত্মসমর্পণ করতে হবে। আপিল করার জন্য ৩০ দিন সময় পাবেন।”
মামলা বৃত্তান্ত
ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থানায় ২০০৯ সালের ২৬ অক্টোবর দায়ের করা এ মামলায় তারেক-মামুনের বিচার শুরু হয় ২০১১ সালের ৬ জুলাই।
মামলায় অভিযোগ করা হয়, টঙ্গীতে প্রস্তাবিত ৮০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের কাজ নির্মাণ কনস্ট্রাকশনস নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে পাইয়ে দেয়ার আশ্বাস দিয়ে ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার টাকা ঘুষ নেন মামুন।
২০০৩ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন পন্থায় ২০ কোটি ৪১ লাখ ২৫ হাজার ৮৪৩ টাকা সিঙ্গাপুরের সিটি ব্যাংকে মামুনের হিসাবে পাচার করা হয়, যার মধ্যে ৩ কোটি ৭৮ লাখ টাকা তারেক খরচ করেন বলে অভিযোগপত্রে বলা হয়।
ঢাকার তৃতীয় বিশেষ জজ মো. মোতাহার হোসেন ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর এ মামলার রায় ঘোষণা করে তারেককে বেকসুর খালাস দেন।
আর তার বন্ধু গিয়াসউদ্দিন আল মামুনকে দেওয়া হয় সাত বছর কারাদণ্ড এবং ৪০ কোটি টাকা জরিমানা।
তারেকের রায়ের বিরুদ্ধে দুদক ওই বছর ৫ ডিসেম্বর আপিলের আবেদন করে। শুনানি শেষে ২০১৪ সালের ১৯ জানুয়ারি হাই কোর্ট দুদকের আপিল গ্রহণ করে আসামি তারেককে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেয়। পরে তাকে পলাতক দেখিয়েই আপিল শুনানি চলে।
তারেকের খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে দুদক ২০১৩ সালের ৫ ডিসেম্বর আপিলের আবেদন করে। শুনানি শেষে ২০১৪ সালের ১৯ জানুয়ারি হাই কোর্ট দুদকের আপিল গ্রহণ করে আসামি তারেককে আত্মসমর্পণ করতে নির্দেশ দেয়।
লন্ডনপ্রবাসী তারেক না ফেরায় তার বিরুদ্ধে সমন জারি করে তা তার লন্ডনের ঠিকানায় পাঠানো হয়।কিন্তু তাতেও খালেদা জিয়ার বড় ছেলের সাড়া মেলেনি।
দুদকের করা ওই আপিলের সঙ্গে সাজার রায়ের বিরুদ্ধে মামুনের করা আপিলও শুনানির জন্য তালিকায় আসে। এরপর হাই কোর্টে ৪ মে আপিলের ওপর শুনানি শুরু হয়ে শেষ হয় ১৬ জুন।
মামলাটি দায়ের থেকে শুরু করে পুরো বিচার প্রক্রিয়ার সময় তারেক রহমান ‘পলাতক’ থাকায় তার পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না বলে খুরশীদ আলম খান জানান।
শেখ হাসিনা হত্যাচেষ্টা মামলায় হুলিয়া জারির পর তোরেকের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিসও জারি করা হয়েছিল। তবে পরে ইন্টারপোল তা সরিয়ে নেয়।
অবশ্য তারেকের দাল বিএনপির দাবি, ২০০৪ সালে ২১ অগাস্ট গ্রেনেড হামলায় ২২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় তারেকের বিরুদ্ধে মামলাটি ‘রাজনৈতিক হয়রানিমূলক’।