হঠাৎ থেমে গেছে জালালের সচেতনতা ‘বিতরণ’

রাজশাহী অফিসঃ রণাঙ্গনের বীরমুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন। মাস্টার্স করেছেন দুটি বিষয়ে। বড় চাকরি পেয়েছিলেন। যোগদান করেননি। মাকে বলেছিলেন, ‘তোমার অন্য ছেলে-মেয়েরা চাকরি করুক, আমাকে দেশের কাজের জন্য ছেড়ে দাও।’ মা তাই করেছেন। গত ৩৮ বছর ধরে জালাল উদ্দিন পায়ে হেঁটে হেঁটে রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের মধ্যে সচেতনতা ‘বিতরণ’ করে আসছেন। তার লক্ষ্য, মানুষের ভেতর সুস্থ রাজনীতির আলো জলে উঠুক।

কিন্তু হঠাৎ এক দুর্ঘটনায় পড়ে থেমে গেছে মুক্তিযোদ্ধা জালালের এই সচেতনতা ‘বিতরণের’ কার্যক্রম। গত ২৫ সেপ্টেম্বর পড়ে গিয়ে ভেঙে গেছে তার ডান পা। ওই দিন থেকে তিনি রাজশাহী মহানগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। ডা. দেবাশীষ রায় তার চিকিৎসা করছেন। এই চিকিৎসক জানিয়েছেন, জালালের পুরোপুরি সেরে উঠতে সময় লাগবে আরও কিছু দিন।

১৯৬৮ সালে জালাল উদ্দিন ছাত্র ইউনিয়ন থেকে রাজশাহী নিউ গভ. ডিগ্রি কলেজের ছাত্র সংসদের প্রথম ভিপি নির্বাচিত হন। উনসত্তরের আইয়ুব বিরোধী গণঅভ্যুত্থানে রাজশাহীতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্ব দেন তিনি। একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি ৯ নম্বর সেক্টরে মেজর আবু ওসমান ও ক্যাপ্টেন আজম চৌধুরীর কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চুয়াডাঙ্গা, কুষ্টিয়া ও মেহেরপুরের বিভিন্ন এলাকায় যুদ্ধ করেন। একাত্তরের ৬ ডিসেম্বর চুয়াডাঙ্গার ভি.জে স্কুলে তিনিই প্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করে চুয়াডাঙ্গাকে হানাদার মুক্ত ঘোষণা করেন।
দেশ স্বাধীনের পর মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন মাওলানা ভাষানীর ন্যাপে যোগ দেন। ১৯৭৭ সালে তিনি রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যান পদে নির্বাচন করেন। ১৯৯১ ও ২০০১ সালে তিনি রাজশাহী-২ (সদর) আসনে সংসদ সদস্য পদেও নির্বাচন করেন। জালাল উদ্দিন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে আর সবার মতো তিনি কর্মজীবন শুরু করেননি। পড়াশোনা শেষ করেই ঘুরে বেড়াচ্ছেন পথে-প্রান্তরে। মানুষকে সচেতন করে আসছেন রাজনীতি বিষয়ে। বয়সের ভারে কিছুটা ভারাক্রান্ত হলেও দুর্ঘটনার আগে থেমে যায়নি তার এই কার্যক্রম।

এই মহান ব্রত পালন করতে গিয়ে জালাল উদ্দিন ভুলে গেছেন বিয়ে ও ঘর-সংসারের কথা। পথে-প্রান্তরে ঘোরার খরচ জোগাড় করতে নিজের জায়গা-জমি বিক্রি করেছেন। এখন নিজের ঘরবাড়ি বলতে কিছু নেই তার। রাজশাহী মহানগরীর রানীবাজার এলাকায় থাকেন বোনের বাড়িতে। তার বয়স এখন ৬৮ বছর।

বুধবার দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে কথা হয় মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, শিক্ষাজীবন শেষের পর থেকেই মানুষকে সচেতন করে তোলার তার এই কাজ শুরু হয়। প্রতিদিন তিনি নতুন পাঁচজন মানুষকে রাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞান দান করেন। তাদের সচেতন করে তোলার চেষ্টা করেন। দীর্ঘ এই জীবনে তিনি কোন কোন মানুষকে রাজনীতি সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান দিয়েছেন, তা তার ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করা আছে।

জালালের বড় বোন মনোয়ারা তাজ বলেন, জালাল উদ্দিন বাইসাইকেল চালিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘুরেছেন। তার লক্ষ্য, মানুষকে রাজনীতির সঠিক জ্ঞান দান করা। মানুষকে সচেতন করে তোলা। মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করা। প্রতিদিনই নতুন নতুন মানুষকে খুঁজে বের করেন তিনি। এ জন্য কখনও কখনও সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বাড়ির বাইরে থাকতে হয় তাকে।

নিজের এই প্রচেষ্টায় সফলতা কতো দূর, জানতে চাইলে জালাল উদ্দিন বলেন, ‘সফলতা তো অবশ্যই আছে। মানুষের মধ্যে দেশপ্রেম জাগ্রত করাটাও একজন দেশপ্রেমিকের দায়িত্ব। আমি সেই দায়িত্ব পালন করি। তবে যান্ত্রিক জীবনে কর্মব্যস্ত মানুষগুলো কখনও কখনও সময় দিতে চান না। এক দিন না পারলে অন্যদিন তার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করি।’

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে মুক্তিযোদ্ধা জালাল উদ্দিন বলেন, বর্তমান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ধৈর্যশীলতার অভাব। রাজনৈতিক নেতাদের আরও বেশি ধৈর্য্যশীল হতে হবে। তা না হলে দেশে অস্থিরতা দেখা দেবে। দেশে শান্তি থাকবে না।

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার অবশ্যই হতে হবে। কোনো অপরাধের বিচার না করার মানে, আরেকজনকে সেই ধরনের অপরাধ করতে উৎসাহিত করা। তাই যুদ্ধাপরাধীদের আদালতের মাধ্যমেই সঠিক সাজা দেয়া দরকার। কারণ, তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী নয়।

জালাল উদ্দিন বলেছেন, রাজনৈতিক সচেতনতা ‘বিতরণের’ জন্যই তিনি চিরকুমার থেকেছেন। তাই জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি মানুষকে সচেতন করে তোলার কাজ করে যেতে চান। ভাঙা পা দ্রুত সেরে উঠে তিনি যেন আবার রাস্তায় নামতে পারেন, এ জন্য সবার কাছে দোয়াও কামনা করেন তিনি।