স্ত্রীকে উত্যক্তের প্রতিবাদ করায় স্বামীকে হত্যা

কল্যাণ কুমার চন্দ,বরিশালঃ “মোর অবুঝ মাইয়ায় (একমাস ১৬দিন বয়সের কন্যা) জীবনে কোনদিন কেউরে বাবা কইয়া ডাক দিতে পারবেনা, মোর মাইয়াগো কেমন কইরা বাঁচামু, এই দুঃখ মুই কার ধারে কমু। ও আল্লাহ এইয়ার চাইয়া তুমি ক্যান মোরে লইয়া গ্যালানা”। বিলাপ করে কথাগুলো বলছিলেন স্বামীহারা দুই কন্যা সন্তানের জননী আইরিন আক্তার দিশা (২৬)।
সূত্রমতে, জেলার গৌরনদী উপজেলার মাহিলাড়া ইউনিয়নের পূর্ব শরিফাবাদ গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা মরহুম হারুন-অর রশিদ ওরফে গেরিলা হারুনের একমাত্র পুত্র লালন হাওলাদারের স্ত্রী আইরিন আক্তার দিশাকে দীর্ঘদিন থেকে মোবাইল ফোনে উত্যক্ত করে আসছিলো একই গ্রামের লাল মিয়া হাওলাদারের পুত্র সৌদিপ্রবাসী জসিম হাওলাদার। লালনের প্রতিবেশী কালাই ফকিরের পুত্র ইউসুফের সহযোগীতায় জসিমের অব্যাহত যৌণ হয়রানীতে অতিষ্ঠ হয়ে পরে গৃহবধূ আইরিন আক্তার। উপায়অন্তুর না পেয়ে বিষয়টি ওইগৃহবধূ তার স্বামীর কাছে জানানোর পর ছুটিতে দেশে ফেরা জসিম ও প্রতিবেশী ইউসুফকে ডেকে লালন হাওলাদার (৩৫) শ্বাসিয়ে দেয়। এসময় উভয়ের মধ্যে বাগবিতন্ডার একপর্যায়ে ইউসুফকে মারধর করে লালন। গৃহবধূ আইরিন আক্তার দিশা অভিযোগ করেন, ওই ঘটনার জেরধরেই তার স্বামী লালন হাওলাদারকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়। তিনি সঠিক তদন্তের মাধ্যমে তার স্বামীর হত্যাকারীদের চিহ্নিত করে গ্রেফতারপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি করেন।
নিহত লালনের বোন সুলতানা আক্তার জানান, তার ভাইয়ের সাথে প্রতিবেশী রাধেশ্যাম বিশ্বাসের পুত্র তপনের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্বের সম্পর্ক ছিলো। ঘটনারদিন গত ৫ মার্চ সন্ধ্যায় তপন তার ভাইকে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে ঘর থেকে ডেকে নিয়ে যায়। এরপর বাড়ির সামনে থেকে জসিম ও তপন একটি মোটরসাইকেলযোগে লালনকে নিয়ে যায়। এ ঘটনার কিছু সময় পর থেকেই তার ভাইয়ের মোবাইল নাম্বার বন্ধ পেয়ে তারা বিভিন্নস্থানে খোঁজাখুজি শুরু করেন। সুলতানা অভিযোগ করেন, তার ভাইয়ের নিখোঁজের পর তপন বিশ্বাসকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করে তা বন্ধ করে রাখেন। প্রায় ঘন্টাখানের পর তাদের (সুলতানা) বাড়ির সামনে তপনের মাছের ঘেরের পারে তপনকে দেখে তার কাছে তিনি (সুলতানা) নিখোঁজ লালনের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করলে তপন নানা তালবাহানা শুরু করে। একপর্যায়ে রাত সাড়ে আটটার দিকে ঘেরের পারে খুঁজতে যেতে চাইলে তপন তাদের বাঁধা প্রদান করে। তার বাঁধা উপেক্ষা করে খুঁজতে গিয়ে ঘেরের পারে অস্থায়ীভাবে নির্মিত খুঁপড়ি ঘরের সামনের ধানের জমি থেকে নিখোঁজ লালনকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরিবারের লোকজনে তাৎক্ষনিক তাকে (লালন) গৌরনদী হাসপাতালে নিয়ে আসলে চিকিৎসকেরা লালনকে মৃত বলে ঘোষণা করেন।
সুলতানা জানান, তার ভাই লালনকে উদ্ধারের সময় তার গলায় গুনার (জিআই তার) ও বিদ্যুতের তার পেঁচানো ছিলো। তবে ওইসময় বিদ্যুতের তারে কোন সংযোগ ছিলোনা। কিন্তু লালনের বুকের ওপর পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুতের শর্ট দিয়ে হত্যা করার একটি ক্ষত চিহ্ন ছিলো। খবর পেয়ে পুলিশ নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে প্রেরণ করেন। এ ঘটনায় থানায় একটি লিখিত অভিযোগও দায়ের করা হয়।
সুলতানার অভিযোগে আরও জানা গেছে, জসিম ও ইউসুফের সাথে পূর্ব শত্রুতার জেরধরেই তপনের সহযোগীতায় তার ভাই লালনকে পরিকল্পিতভাবে বিদ্যুতের শর্ট দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। যে কারনেই ঘটনার পর থেকে তারা তিনজনেই এলাকা ছেড়ে আত্মগোপন করেছে। এরইমধ্যে ঘটনার মূলহোতা জসিম হাওলাদার অতিগোপনে সৌদিআরবে পাড়ি জমিয়েছে।
মুক্তিযোদ্ধার পুত্র লালন হাওলাদারের অসহায় স্ত্রী আইরিন আক্তার দিশা জানান, তার স্বামীর হত্যাকারী মূলহোতা জসিম হাওলাদারকে সৌদি আরব থেকে ফিরিয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেই হত্যার প্রকৃত রহস্য বেরিয়ে আসবে। তিনি (দিশা) জসিমকে সৌদি থেকে ফিরিয়ে আনাসহ আত্মগোপনে থাকা অপর দুইজনকে গ্রেফতারের জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়সহ প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অভিযুক্ত জসিম হাওলাদার পালিয়ে সৌদি আরবে গমন, তপন বিশ্বাস ও ইউসুফ ফকির আত্মগোপনে থাকায় তাদের কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তাদের পরিবারগুলোর সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা পরিকল্পিত এ হত্যাকান্ডের ব্যাপারে কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি।
এ ব্যাপারে গৌরনদী মডেল থানার ওসি (তদন্ত) মোঃ আফজাল হোসেন বলেন, এখনও ময়নাতদন্তের রিপোর্ট হাতে পাওয়া যায়নি। রিপোর্ট পেলেই হত্যার মূলরহস্য বেরিয়ে আসবে। তিনি আরও বলেন, সন্দেহভাজন অভিযুক্তদের আটকের জন্য পুলিশের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।