সোমবার ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন

23

যুগবার্তা ডেস্কঃ রাত পোহালেই ভারতের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন। রাজধানী নয়াদিল্লির সংসদ ভবন ও দেশের রাজ্য বিধানসভাগুলোতে লোকসভা, রাজ্যসভা ও বিধানসভার সদস্যরা কাল সোমবার ভোট দিয়ে ভারতের চতুর্দশ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করবেন।
এবারের লড়াই দ্বিমুখী। বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএর প্রার্থী রামনাথ কোবিন্দ, যিনি প্রার্থী মনোনীত হওয়ার আগে পর্যন্ত বিহারের রাজ্যপাল ছিলেন। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউপিএর প্রার্থী লোকসভার সাবেক স্পিকার মীরা কুমার। ভোট গণনা ২০ জুলাই। দেশের প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২৪ জুলাই। নতুন রাষ্ট্রপতি শপথ নেবেন ২৫ তারিখ। একই দিন শপথের পর প্রথা অনুযায়ী বিদায়ী রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জিকে রাজাজি মার্গে তাঁর সরকারি আবাসে পৌঁছে দিয়ে আসবেন নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি।
সাধারণ নির্বাচনের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফাত রয়েছে। সাধারণ নির্বাচনে একটি ভোটের মূল্য এক। কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটদাতাদের ভোটের মূল্য এক জটিল পদ্ধতিতে নির্ধারিত হয়। লোকসভা ও রাজ্যসভার সদস্য যাঁরা, তাঁদের একেকজনের ভোটের মূল্য ৭০৮। রাজ্য বিধানসভার সদস্যদের ভোটের মূল্য নির্ধারিত হয় সেই রাজ্যের বিধানসভার মোট আসন ও জনসংখ্যার নিরিখে। সবচেয়ে বেশি ভোট মূল্য উত্তর প্রদেশের বিধায়কদের ২০৮। সবচেয়ে কম সিকিম ও অরুণাচল প্রদেশের বিধায়কদের, এটি ৮। এবারের ভোটে সাংসদেরা ভোট দেবেন সবুজ ব্যালটে। বিধায়কদের ব্যালটের রং গোলাপি। সংসদে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত সদস্যরা এই ভোটে অংশ নিতে পারেন না। এবারের ভোটে অংশ নেবেন লোকসভার ৫৪৩ ও রাজ্যসভার ২৩৩ জন সদস্য এবং দেশের মোট ২৯টি রাজ্য এবং দিল্লি ও পুডুচেরি দুই কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের মোট ৪ হাজার ১২০ জন বিধায়ক।
সব ভোটদাতার ভোট ধরলে এবারের নির্বাচনে মোট ভোট মূল্য ১০ লাখ ৯৮ হাজার ৯০৩। এর মধ্যে সাংসদদের ভোট মূল্য ৫ লাখ ৪৯ হাজার ৪০৮, বিধায়কদের ৫ লাখ ৪৯ হাজার ৪৯৫।
প্রণব মুখার্জিকে দ্বিতীয় দফার জন্য রাষ্ট্রপতি করার যে প্রস্তাব কোনো কোনো বিরোধী দল দিয়েছিল, বিজেপি তা মানেনি। স্বাধীনতার পর এই প্রথম বিজেপি তাদের নীতি ও আদর্শে বিশ্বাসী কাউকে রাষ্ট্রপতি করার সুযোগ পেয়েছে। সেই সুযোগ হারাতে তারা রাজি হয়নি। ভারতের প্রথম রাষ্ট্রপতি বাবু রাজেন্দ্র প্রসাদই একমাত্র দুই দফায় (১৯৫০-১৯৬২) রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
এনডিএ ও ইউপিএর এই মুহূর্তে যা ভাগাভাগি, তাতে বিজেপি প্রার্থী রামনাথ কোবিন্দ ৭০ শতাংশ ভোট পেয়ে জয়ী হতে পারেন। দুই জোটের বাইরে যে দলগুলো রয়েছে, যেমন বিজু জনতা দল, তেলেঙ্গানা রাষ্ট্রীয় সমিতি, ওয়াই এস আর কংগ্রেস, এআইএডিএমকের দুই শিবির এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলের ছোট ছোট আঞ্চলিক দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সমর্থন বিজেপি আদায় করে নিয়েছে। ইউপিএ শিবিরে থাকলেও জনতা দল সংযুক্ত সমর্থন করছে রামনাথ কোবিন্দকে। পরাজয় যে নিশ্চিত, কংগ্রেস প্রার্থী মীরা কুমার তা মেনেই নিয়েছেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিনি বলেছেন, ‘এটা দুই নীতির লড়াই। তাই নির্বাচন থেকে সরার প্রশ্ন নেই।’
প্রথম বাঙালি রাষ্ট্রপতি গত পাঁচ বছরে রাইসিনা হিলসে কী ছাপ রেখে গেলেন? ভারতীয় সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী করলেও রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণব মুখার্জি কি স্বকীয়তার নিদর্শন রাখেননি? খুব সহজে এই দুই প্রশ্নের উত্তরে বলা যায়, প্রতিভা পাতিলের মতো ‘রাবার স্ট্যাম্প’ কিংবা আবদুল কালামের মতো ‘বিক্ষুব্ধ জনতার রাষ্ট্রপতি’ কোনোটাই তিনি হতে চাননি। পাঁচটি বছর সাংবিধানিক আওতায় নিজেকে আবদ্ধ রেখেও প্রয়োজনের সময় উপযুক্ত পরামর্শ তিনি সরকারকে দিয়ে গেছেন। ইসরায়েল ও প্যালেস্টাইনের স্পর্শকাতরতাকে একই সময়ে পিঠেপিঠি সফরে তিনি যেভাবে সামলেছিলেন তাতে তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞারই পরিচয় মেলে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় না চাইলেও তিনি এই দুই দেশ একই সঙ্গে নিজের সফরসূচিতে রেখেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজেই বলেছেন, প্রণববাবু সব সময় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে তাঁকে সৎ পরামর্শ দিয়ে গেছেন। বিভিন্ন সময়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে তিনি রাষ্ট্রপতি ভবনে গিয়েছেন। প্রধানত দুটি ক্ষেত্রে তিনি সব সময় পরামর্শ নিয়েছেন। সংবিধান ও পররাষ্ট্রনীতি। কিন্তু তাই বলে এমন নয় যে এই পাঁচ বছরে শাসক দলের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির মতপার্থক্য বা মতানৈক্য ঘটেনি। সংসদকে এড়িয়ে জমি অধিগ্রহণের অর্ডিন্যান্স আনতে চেয়েছিল মোদি সরকার। প্রণববাবু বিরোধিতা করেছিলেন।
কাশ্মীর নিয়ে মোদি সরকারের কট্টরবাদিতায় সামাল দিতে চেয়েছেন। বারবার বলেছেন, হুরিয়ত নেতাদের সঙ্গে আলোচনার রাস্তা একেবারে বন্ধ করে দেওয়া উচিত হবে না। অসহিষ্ণুতার মাথাচাড়া দেওয়ার বিরুদ্ধে মুখ খুলেছেন প্রকাশ্যেই। সরকারসহ সবাইকে মনে করিয়ে দিয়েছেন বহুত্ববাদী ভারতের চরিত্র রক্ষার কথা। যে অভিন্ন কর ও পণ্য পরিষেবাকে (জিএসটি) মোদি সরকার তার মুকুটের ঝলমলে পালক হিসেবে গণ্য করছে, সেই আইনের খসড়া অর্থমন্ত্রী থাকাকালে যে তাঁরই তৈরি, মনে করিয়ে দিতে ভোলেননি তা। সে সময় যে রাজ্যগুলো বিরোধিতা করেছিল, গুজরাট ছিল তাদের অন্যতম। মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন নরেন্দ্র মোদি।
রাষ্ট্রপতি হিসেবে প্রণব মুখার্জির সবচেয়ে বড় সুবিধা ছিল তাঁর দীর্ঘ অবিতর্কিত রাজনৈতিক জীবন, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, মেধা, ক্ষুরধার রাজনৈতিক বুদ্ধি, দেশপ্রেম, মর্যাদাবোধ, সাংবিধানিক জ্ঞান ও ভারতীয় বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা। এতটাই স্মৃতিধর তিনি যে সব সময় সরকারকে অতীতের উদাহরণ দিয়ে সজাগ করে দিয়েছেন। এই সবকিছুই তাঁকে সব দলের কাছে পেতে দিয়েছিল এক অনন্য আসন। ছোটখাটো চেহারা সত্ত্বেও এমনই ছিল তাঁর ব্যক্তিত্ব যে তাঁর পরামর্শকে সবাই নির্দেশ বলে মেনে এসেছেন। প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছেও তিনি ছিলেন প্রণম্য। বাংলাদেশের রাজনীতিকদের কাছে তিনি ছিলেন অভিভাবকের মতো।
গত পাঁচ বছরে রাষ্ট্রপতি ভবন জনতার কাছে উন্মুক্ত হয়েছে। রাষ্ট্রপতি ভবনের গ্রন্থাগার জ্ঞান ও ইতিহাসের আকর। সেই লাইব্রেরির আমূল সংস্কার করেছেন প্রণববাবু। সুবিশাল এই ভবনে প্রকৃতির কোলে কিছুদিন থেকে সাহিত্যিক, শিল্পী, সংগীতজ্ঞ, চারুকলার দিকপাল ও জীবনের সর্বক্ষেত্রের ‘ক্রিয়েটিভ’ মানুষদের কাজ করার সুযোগ তাঁরই সৃষ্টি করে দেওয়া। গত পাঁচটি বছরে রাষ্ট্রপতি ভবনের মান ও মর্যাদাকে প্রণব মুখার্জি এভারেস্টের উচ্চতায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর বিদায়বেলায় এই আশঙ্কাই বড় হয়ে উঠছে, রাইসিনা হিলস আরও একবার রাজনৈতিক দলের রাবার স্ট্যাম্প সর্বস্ব শাখা অফিসে পরিণত না হয়।
অতঃপর তাঁর নির্ভার জীবনের সঙ্গী হবে অগুনতি বই। বহু বছর আগে এই প্রতিবেদককে তিনি বলেছিলেন, কিছু একটা না পড়লে রাতে তাঁর ঘুম আসে না। হাতের কাছে কিছু না পেলে অগত্যা পঞ্জিকার পাতা ওল্টান তিনি। রাষ্ট্রপতি হিসেবে পাওনা সব কিছুই তিনি রাষ্ট্রের জন্য রেখে আসছেন। নিয়ে যাবেন শুধু উপহার পাওয়া বই। আত্মজীবনীর তৃতীয় খণ্ডটি এই অবসরে শেষ করার পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর।
জীবনটা তাঁর অবশ্যই পাল্টে যাবে। এই বদলের সঙ্গে বদলাবে এত বছরের একটা প্রিয় অভ্যাস। শীত-গ্রীষ্ম-বর্ষায় কাকভোরে উঠে রাষ্ট্রপতি ভবনের আদিগন্ত চরাচরে হনহন করে হাঁটায় এবার রাশ টানতে হবে। রাজাজি মার্গের সরকারি আবাসের আঙিনা আর যাই হোক রাইসিনা হিলস নয়।- প্রথম আলো