সেই লাশের কথা স্মরণ করে আজো আতঁকে ওঠেন ওসি ফারুক

136

কল্যাণ কুমার চন্দ,বরিশাল ॥
দূর থেকে ট্রাকের সামনে মাটির তৈরি মানুষের পোড়া মুর্তির মতো কি যেন একটা দেখা যাচ্ছিলো। ভেবেছিলাম হয়তো ভস্মিভূত ট্রাকের কোন একটি অংশ। তখনও ভাবতে পারিনি এটা কোন জীবন্ত মানুষের পোড়া নিথর দেহ। কাছাকাছি গিয়ে যখন দেখতে ও জানতে পারলাম পুড়ে কয়লা হয়ে যাওয়া এ দেহটি ট্রাকের হেলপারের। তখন আর নিজেকে সামাল দিতে পারলাম না। একজন মানুষ হিসেবে সেদিন অনেক কেঁদেছি। জীবন্ত মানুষকে যে এভাবে পুড়িয়ে কয়লা বানিয়ে হত্যা করা হতে পারে তা আমার জানা ছিলোনা। সেই বিভৎস দৃশ্য আজো চোখের সামনে ভেসে বেড়ায়। একবছর পরেও সেই লাশের কথা মনে পরলেই আতঁকে উঠি। রবিবার সকালে আবেগআপ্লুত হয়ে কথাগুলো বলছিলেন, বরিশালের উজিরপুর থানার ওসি (তদন্ত) মো. ফারুক খান।
সূত্রমতে, বিএনপি-জামায়াতের ডাকা অবরোধ চলাকালীন সময় গত বছরের (২০১৫সালের) ১৮ জানুয়ারি ভোররাতে বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের উজিরপুরের সানুহার নামক এলাকায় ট্রাকে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে অবরোধকারীরা। এতে ঘটনাস্থলেই অগ্নিদগ্ধ হয়ে পুড়ে অঙ্গার হয়ে মৃত্যুবরন করে ট্রাকের হেলপার সোহাগ হাওলাদার (১৯)। অগ্নিদ্বগ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয় ট্রাক চালক রিপন শেখ (২৯)। নিহত সোহাগ ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার শংকরপাশা গ্রামের মৃত সাগর হাওলাদারের পুত্র। তার মা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছিলো সোহাগ। তার বাবা কোন ভূমি রেখে যেতে পারেননি। তাই সোহাগ তার অন্ধ মাকে নিয়ে শংকরপাশা গ্রামের মামা বাড়িতে থাকতেন। ট্রাক চালক রিপন শেখ একই এলাকার মীরের গ্রামের আব্দুল লতিফ শেখের পুত্র।
সূত্রে আরও জানা গেছে, পিতৃহীন পরিবার ও দৃষ্টিহীন মায়ের সংসারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সোহাগ হাওলাদার অভাবী সংসারের হাল ধরতে ভাইবোন পরিবহনের (ফরিদপুর ট-১১-০১৮৯) ট্রাকে হেলপার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করে। অন্যান্যদিনের ন্যায় ১৮ জানুয়ারি (রবিবার) ভোররাতে ফরিদপুর থেকে বরিশাল নগরীতে কাঁচামাল নামিয়ে দিয়ে ফের ফরিদপুরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হওয়া ট্রাকটি ভোর সাড়ে ছয়টার দিকে সানুহারের নিরবিচ্ছিন্ন এলাকা অতিক্রমকালে অবরোধকারীরা ট্রাককে লক্ষ্য করে পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে। এতে অগ্নিদ্বগ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই পুড়ে অঙ্গার হয়ে মারা যায় হেলপার সোহাগ। চালক রিপন শেখ গুরুতর আহত হয়। খবর পেয়ে থানা পুলিশসহ স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে ছুঁটে এসে সোহাগের পুড়ে অঙ্গার হওয়া নিথর দেহ দেখে অনেকেই সেদিন কান্নায় ভেঙ্গে পরেছিলেন। দীর্ঘদিন ফরিদপুর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ্য হন অগ্নিদ্বগ্ধ ট্রাক চালক রিপন শেখ।
উজিরপুর মডেল থানার ওসি মো. নুরুল ইসলাম পিপিএম জানান, উল্লেখিত ঘটনায় ওইদিন বিকেলে থানার এস.আই মো. শহিদুর রহমান বাদি হয়ে ৫০ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ২০ জনকে আসামি করে মামলা দায়ের করেন। একইদিন সন্ধ্যায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে ঘটনার সাথে জড়িত থাকার সন্দেহে শহীদুল ইসলাম খান, শফিকুল ইসলাম শাহীন, সেলিম রাঢ়ী ও সেলিম মৃধাকে গ্রেফতার করে। একইবছরের ৮ ফেব্রুয়ারি দুপুরে মামলার প্রধান আসামি উপজেলার হস্তিশুন্ড গ্রামের রহমান বেপারীর পুত্র সাইদুল বেপারীকে মানিকগঞ্জের বরংঙ্গাইল এলাকা থেকে গ্রেফতার করা হয়। ওসি নুরুল ইসলাম আরও জানান, মামলার তদন্তকারী অফিসার থানার ওসি (তদন্ত) মো. ফারুক খান সম্প্রতি সময়ে ওই মামলায় ৫৫জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে চার্জশীট দাখিল করেন।
অপরএকটি সূত্রে জানা গেছে, মামলার আরেক অন্যতম আসামি উপজেলার মোড়াকাঠী গ্রামের দুর্ধর্ষ সর্বহারা নেতা জিয়া আমীন রাঢ়ী ঘটনার পর পরই আত্মগোপনে থেকে সাউথ আফ্রিকায় পাড়ি জমিয়েছে। সূত্রটি আরও জানিয়েছেন, মামলার চার্জশীট দেয়ার পর গ্রেফতার ও দেশের মধ্যে আত্মগোপনে থাকা সকল আসামিরা আইনের ফাঁকফোঁকর পেরিয়ে জামিনে বের হয়ে গেছেন। যেকারণে এ মামলার ভবিষ্যত নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ ব্যাপারে বরিশাল বারের সাবেক সভাপতি ও জেলা আ’লীগের সাধারন সম্পাদক এ্যাডভোকেট তালুকদার মো. ইউনুস এমপি বলেন, নির্ধারিত কার্যদিবসের মধ্যেই মামলার বিচার নিস্ফত্তি হবে।