সুলতানা কামাল ইস্যু- দ্য নেক্সট হট টপিক?

62

ননযায়নুদ্দিন সানী : মাঝে মাঝে এমন হয়, লেখার জন্য এক গাদা টপিক, অথচ লিখতে ইচ্ছে করছে না। আবার উল্টোটাও হয়। লিখতে চাইছি, কিন্তু কোনো টপিকই টানছে না। যাকে বলে রাইটার্স ব্লক। দেশের বর্তমান অবস্থা নিয়ে আমার এখন ‘রাইটার্স ব্লক’ টাইপ ব্যাপার হয়েছে আর কি। বাট, এ কথা বলবার উপায় নেই। পক্ষ একটা নিতেই হবে। বাজারের এখন যা চল, তাতে আপনি বুঝেন আর না বুঝেন, সব বিষয়ে আপনাকে একটা মতামত দিতেই হবে। অ্যাট লিস্ট আপনি যদি নিজেকে বুদ্ধিজীবী বা ফেসবুকার প্রমাণ করতে চান। সো, আপনার গলিতে কুত্তা মরে পড়ে থাক আর দেশে কাকের সংখ্যা বৃদ্ধি পাক, আপনাকে মতামত দিতেই হবে। কেন? কারণ, সব্বাই অপেক্ষা করে আছে। বিশ্বাস হচ্ছে না? ওকে, ডিটেইলসে বলছি।
রিসেন্ট ঘটনাগুলোর লিস্টটার দিকে একটু তাকাই। গজামের মিছিল, ‘কুত্তার মতো পিটামু’, ইমরানের বিরুদ্ধে মামলা, হেফাজত, সুলতানা কামাল, লংগদু, বাজেট. . . বাকি থাকল কিছু? ও, ব্রিটেনের নির্বাচন, প্যারিস ক্লাইমেট ইস্যু, ট্রাম্পের প্রত্যাহার। কিছু বাদ পড়লে সরি। যাই হোক, এসব নিয়ে ফেসবুক ভেসে যাচ্ছে বিভিন্ন পক্ষের লোকের বিপ্লবী সব স্ট্যাটাসে। ব্যাংকে টাকা রাখা জায়েজ না নাজায়েজ তা নিয়ে ফেসবুকে চলছে বিভিন্ন ফতোয়া। কেউ কেউ লিখছেন, এত কিছু না করে ‘ফেসবুকের লাইক, শেয়ার আর কমেন্টের ওপর ভ্যাট দিলেই বাজেটের টাকা উঠে যেত’।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমার নিজেরও কেন লেখা উচিত। সহজ উত্তর হছে, বর্তমান বাজারে আপনার ফেসবুক একাউন্ট আছে মানেই আপনি একজন বুদ্ধিজীবী। আর দেশ-বিদেশের যাবতীয় টপিক নিয়ে ইনিয়ে-বিনিয়ে দুকলম লিখে সবাইকে আপনার জানান দিতে হবে, ‘আমিও বুদ্ধিজীবী দৌড়ে আছি’। সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হওয়া জরুরি না, তবে মতামত দেওয়া জরুরি।
দেশ কিংবা বিদেশের হট টপিকগুলোতে লেখালেখির আরও একটা কারণ আছে। বিশেষ করে বিতর্কিত বিষয়গুলোতে। কারণটা হচ্ছে, দেশের যেকোনো বিতর্কিত বিষয়ে আপনাকে একটা পক্ষ নিতেই হবে। পাবলিকের জন্য এটা বেশি জরুরি। আপনি কি বলছেন, তা দিয়ে আপনাকে যাচাই করা হবে না। আপনাকে সমর্থন করবে, না গালি দিবে, নির্ভর করছে এই তকমার ওপর। শুধু বুদ্ধিজীবী হলে, পাবলিকের সমস্যা হয়, ঠিক করতে পারে না গালি দিবে না লাইক করবে। কোনো এক পক্ষে ঘেঁষে গেলে, ওদেরও সুবিধা, আপনারও। ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলি। যেমন ধরুন ‘থেমিস’। ওটাকে মূর্তি বললে, আপনি হেফাজত, আর ভাস্কর্য বললে, লীগ বা বাম। এরপরের প্রশ্ন হচ্ছে, মূর্তি সামনে থাকবে না পেছনে? আপনার পক্ষ ঠিক করুন। সামনের পক্ষে থাকলে আপনি বাম, পেছনের পক্ষে হলে আপনি লীগ। আর যদি একেবারেই না রাখতে চান, তবে হেফাজত। আর কিছুই যদি না বলেন? ‘লিখতে ইচ্ছে করছে না’ বলবেন? শালা ধান্ধাবাজ, সব দিকেই তাল মিলায়। ওটা হবে না। টপিক যতই বস্তাপচা হোক, পক্ষ আপনাকে নিতেই হবে।
আসলে ফেসবুকের বাজারে আপনার লেখার যেমন একটা উপস্থিতি আছে, না লেখারও আছে। আপনি যতই ঢাক ঢোল পিটান, আপনাকে কেউই নিরপেক্ষ ভাববে না। হয় লীগ ভাববে আর নয়তো বিএনপি। বাম আজকাল আর কেউ ভাবে না, ভাবে লীগের বি টিম। সেই তুলনায়, অনেকে হেফাজত ভাবে, কারণ অনেকের ধারণা, বিরোধী দলের ফাঁকা জায়গায় অচিরেই আসছে হেফাজত। সো, ইদানিং, ‘হেফাজতপন্থী’’ টাগের একটা আলাদা চলন শুরু হয়েছে। সারাংশ হচ্ছে, আপনি যে লিখছেন, সব্বাই এ ব্যাপারে নিশ্চিত, পেছনে আসলে কোনো ধান্ধা আছে। হয় এখন মালাই খাচ্ছেন, নয়তো ভবিষ্যতে মালাই খাওয়ার অগ্রিম ব্যবস্থা করছেন। কোনো ধান্ধা ছাড়া লেখালেখি করছেন? অসম্ভব।
সো, ফেসবুকিং করেন আর বুদ্ধিজীবীগিরিই করেন, আপনার আসলে একটা পক্ষ আছে, উপপাদ্যটি প্রমাণিত। এবার আসুন সেই পক্ষের হয় আপনার করণীয় কি। সেই পক্ষ ভাল কিছু করলে তো কথাই নেই, আপনার কাজ তখন বিভিন্ন উপায়ে গুণগান করা। সমস্যা হয়ে যায়, আপনার পক্ষ যখন খারাপ কিছু করে ফেলে। তখন আপনার প্রথম কাজ, বাতাস আঁচ করা। নেত্রী আসলে কি চায়? যদি দেখেন কাজটায় নেত্রী নাখোশ, তাহলে সমালোচনায় ঝাঁপিয়ে পড়ুন। সাপও মরবে লাঠিও ভাঙবে না। নিজেকে নিরপেক্ষও দেখান হবে, আবার নেত্রীর কাছে এসিআরের নম্বরও কমবে না। বিদেশ যাত্রায় ডাক পেতেও পারেন। এক্সট্রা অ্যাডভান্টেজ হচ্ছে, এই লেখাগুলো পরে উদাহরণ হিসেবে ব্যবহার করতে পারবেন। বলতে পারবেন, ‘বিবেক বিক্রি করিনিব্লা ব্লা ব্লা’।
সমস্যা হয়ে যায় যখন নেত্রী নিজেই এমন কিছু করেন, যা আপনি সমর্থন করতে পারছেন না। এবার? তখন আপনার সামনে দুটো রাস্তা, ‘বর্তমান বিরোধী দল (নকলটা না, আসল) যখন সরকারি দল ছিল তখন কি করেছে, এই বক্তব্য নিয়ে মাঠে নামতে পারেন’। ইনফ্যাক্ট এটাই এখন ট্রেন্ড। লোডশেডিং বাড়লে, সাধারণত এই লাইনে বক্তব্য রাখা হয়। আরও কিছু ফর্মূলা আছে। উদ্ভট কোনো টপিক হাজির করা, ‘দেশে এখন আর সাঁতার শেখার জায়গা নাই’ টাইপ কিছু। আর একটা হচ্ছে স্পিকটি নট। ইনফ্যাক্ট, যদি মনের কোণায় সন্দেহ থাকে, ভবিষ্যতে পালটি মারবার দরকার পড়তে পারে, তবে এটাই বেস্ট অপশান।
ব্যাপারটা ফুলপ্রুফ সলিউশান না হলেও, কাজে দিচ্ছিল। আর তাই, ধান্ধাবাজ, হবু পালটিবাজ গ্রুপগুলো এভাবেই চালাচ্ছিল। অন্তত কিছুদিন আগে পর্যন্তও। তবে সবসময় যে পার পাচ্ছিল, এমন না। বুদ্ধিমান পাঠক ধরে ফেলছিলেন। সো, বুদ্ধিজীবীগিরি করবেন আর বিতর্কিত টপিকে চুপ থেকে পার পেয়ে যাবেন, এমনটা যদি ভেবে থাকেন, তবে সেই গুড়ে বালি। ‘দান্তে’ একটা ডায়ালগ আছে না? ‘দোজখের সবচেয়ে অন্ধকার যায়গাটা তার জন্য বরাদ্দ, যে চুপ থাকে’- এই টাইপ কিছু একটা। সেটা তখন বাজারে দাপিয়ে বেড়াবে। আর আপনি হয়ে যাবেন, সেই জন। সো? চুপ থেকেও পার পাচ্ছেন না। স্পেশালি বাজারে যখন এত্ত এত্ত বিতর্কিত টপিক। পক্ষ আপনাকে নিতেই হবে।
লেটস স্টার্ট। এক এক করে আসি। প্রথম টপিক হচ্ছে ‘থেমিস’। থেমিসকে ভাস্কর্য মনে করেন না মূর্তি? একটা পক্ষ আপনার থাকতেই হবে। ঠিক করেছেন? ওকে। এরপরে সিদ্ধান্ত নিন, ওটা সামনে রাখবেন? না পেছনে? সরকার সিদ্ধান্ত নিল, পেছনে রাখবে। এখন ঠিক করেন কোন দিকে যাবেন, ‘ছি ছি’ বলবেন? না ‘কুত্তার মতো পিটামু’ বলবেন। পক্ষ আরেকটা আছে। সামনে থেকে সরানোর জন্য ধন্যবাদ দিবেন কি না? সিদ্ধান্ত নিন, আমি ততক্ষণ অন্য টপিকে যাই।
‘লংগদু’ নিয়ে তেমন বিতর্ক নেই। তবে বেশি কিছু বললে আরেকটা সমস্যা হতে পারে, ‘দেশদ্রোহী’। হালকা নিন্দা সূচক কিছু লিখতে পারেন, জায়েজ। বরং না লিখলেই সমস্যা, ‘অমানবিক’ তকমা লেগে যেতে পারে। তবে সাবধান। উচ্ছাস কন্ট্রোলে রাখতে হবে। বেশি উচ্ছাস রিস্কি, তখন আবার বরাদ্দ হবে ‘রাজাকার’ টাইপ তকমা, দেশের বিরুদ্ধে কথা বলা। ওদিকে লীগের নেতা মরেছে, সো, সম্ভাবনা আছে ব্যাপারটায় ছাত্রলীগ ইনভল্ভড। আর তেমনটা সত্যিই হয়ে থাকলে, বি কেয়ারফুল। বেশি কিছু বললে আবার নেত্রী মাইন্ড করতে পারেন। বটম লাইন ইজ, ‘লংগদুতে যা হলো, কাজটা ভাল হলো না, তবে ছাত্রলীগ নেতা হত্যা না হলে এমনটা হতো না। তাইৃ।‘ এমন একটা লেজেগোবরে মতামত দেওয়াটাই সেফ।
বাকি সব টপিক কেমন যেন পাতানো মনে হচ্ছে। বাজেট প্রতিক্রিয়া? ভ্যাট ফ্যাট মার্কা টপিকগুলো নিয়ে প্রতিক্রিয়াগুলো তো অনেকটাই রুটিন মাফিক। বাজেটে কিছু কিছু টপিক দেওয়াই হয়েছে, ‘দাও গালি’ উৎসাহিত করার জন্য। বিরোধী দলকে ঘ্যান ঘ্যান করতে দেওয়ার জন্য। আপন জুয়েলার্স? আপাতত ওটা ঘুষ খাওয়ার মেশিন। যে যেভাবে পারছেৃ। ফরেনসিক রিপোর্ট এসেছে, কিছু পাওয়া যায়নি। গাজীপুরের সেই পিতা কন্যার আত্মহত্যা মনে আছে? আততায়ী ধরা পড়েছে। যেহেতু এই মুহূর্তে এসবের কোনোটাই আর টপিক না, তাই ওনিয়ে কিছু না বললেও চলবে। চিকিৎসক পেটানো? দূর।
মৃণাল সাহেবের মাতৃবিয়োগের কান্নাকাটি? এটা টপিক হয়েছিল, তবে এত বেশি মেলোড্রামা যে কমেডি ফ্লেভার চলে এসেছিল। নাট্যকার ভাল না হলে যা হয়। পচা নাট্যকারের পাল্লায় পড়ে মৃণাল সাহেবের কান্নাকাটি টিপিক্যাল বাংলা সিনেমার দুঃখিনী নায়িকার গল্প দাঁড়িয়েছিল। গজামের মিছিল কিংবা ‘ছি ছি ’ (মামলা খাওয়ার ভয়ে বাকিটা বললাম না) টাইপ স্লোগানটাও পাতানো মনে হচ্ছে, তবে কিছুটা ভাল নাট্যকারের কাজ। তবে এক্ষেত্রে প্রশ্নটা হচ্ছে ‘কেন’? ইমরানকে আবার নেতা বানাবার চেষ্টা কেন? ‘প্রগতিশীল বিরোধী দল টাইপ’ কিছু বানাবার কোন প্রোজেক্ট?’ পুরো নাটক না দেখে মতামত দেওয়া যাচ্ছে না।
সবশেষ টপিকও তো ঘুরে ফিরে থেমিস। এবার ‘সুলতানা কামাল’ ফর্মে। সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে একটু এগ্রেসিভ হেফাজত। আর কিছু সম্পর্কে মতামত দেন আর না দেন, এ বিষয়ে দিতেই হবে। প্রমাণ করতে হবে আপনি প্রগতিশীল না প্রতিক্রিয়াশীল। এই টপিকটা এখন সবকিছু ছাপিয়ে উপরে উঠে আসছে। দেশ থেকে বিতাড়ন ফতোয়া এসে গেছে। ফলে লেজে লেজে তসলিমা নাসরিনও প্রসঙ্গ এসে গেছে। সো, টপিকটা হিট হওয়া এখন সময়ের ব্যাপার। লীগ তার অবস্থান এখনো ক্লিয়ার করেনি। তবে সুলতানা কামাল যেহেতু ওই পক্ষ ঘেঁষা, তাই কাহিনী বেশিদূর এগোতে দেওয়া হবে না বলেই আমার বিশ্বাস। বাম দলগুলো অবশ্য চাইছে, এই নিয়ে তিড়িং বিরিং হোক। সম্মলিত সাংস্কৃতিক জোট মিউ মিউ শুরু করেছে, তবে গলায় জোর বেশ কম, বিশ্বাসযোগ্যতা তার চেয়েও কম। সব মিলিয়ে বলা যায়, এটা এখন মোটামুটি হিট টপিক, আর সম্ভাবনা আছে, সুপার হিট টপিক হওয়ার।

আসলে টপিকটা সবচেয়ে সমস্যায় ফেলবে লীগঘেঁষা বুদ্ধিজীবীদেরকে। না পারবে উনার পক্ষে থাকতে। না পারবে বিপক্ষে যেতে। মাঝামাঝি ফর্মূলা হচ্ছে, ‘উনার বক্তব্য বিকৃত করে প্রকাশ করা হচ্ছে।’ ওদিকে হেফাজতও সুযোগ ছাড়তে নারাজ। উত্তপ্ত ডায়ালগবাজি শুরু হয়েছে। অনেকে চাইছেন রাশ টেনে ধরতে। অবস্থা বেশ এক্সাইটিং রূপ নিতে যাচ্ছে। এদিকে চ্যাম্পিয়ান্স ট্রফি, বাংলাদেশ খেলছে। সব মিলিয়ে কাহিনী কতটা জমবে, বলা যাচ্ছে না। তবে জমতে না দেওয়ার চেষ্টা সরকারের তরফ থেকে থাকবে বলেই মনে হচ্ছে। হেফাজতের সঙ্গে সমঝোতা সম্ভাবনা রয়েছে। আর তেমনটা হলে, বামদের চিল্লাপাল্লা হবে দেখার মতো। এনিওয়ে, যে টপিকটায় কারোরই আর চুপ থাকবার অপশান থাকবে না, সেটা হচ্ছে, সুলতানা কামালকে দেশছাড়া করাবার ইস্যু। দেখা যাক।-+লেখক: চিকিৎসক ও কলামিস্ট