সুন্দরবনের জলদস্যু খোকাবাবু বাহিনীর আত্মসমর্পন

মোংলা থেকে মোঃ নূর আলমঃ সুন্দরবনের দুর্ধর্ষ জলদস্যু খোকা বাবু বাহিনীর ১২ সদস্য সোমবার সকালে বরিশালের রুপাতলীতে র‌্যাব-৮ এর কমপ্লেক্সে স্বরাস্ট্র মন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল’র কাছে অস্ত্র ও গুলি জমা দিয়ে আনুষ্ঠানিক ভাবে আত্মসমর্পন করে। জলদস্যু আত্মসমর্পন অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ ও র‌্যাবের মহাপরিচালক বেনজীর আহমেদ। আত্মসর্মন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন র‌্যাব-৮ অধিনায়ক লেঃ কর্নেল মোঃ ইফতেখারুল মাবুদ। খোকা বাবু বাহিনীর সদস্যরা ২২টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র ও ১ হাজার ৩ রাউন্ড গুলি জমা দেয়।
র‌্যাব-৮ এর উপ-অধিনায়ক মেজর আদনান জানান সুন্দরবনের শরণখোলা এবং চাঁদপাই রেঞ্জে ২৫ নভেম্বর ২০১৬ তারিখ হতে জলদস্যু/বনদস্যু বিরোধী বিশেষ অভিযান আরম্ভ করে। ২৭ নভেম্বর ২০১৬ তারিখ সুন্দরবন এর আওতাভুক্ত চাঁদপাই রেঞ্জের অন্তর্গত পশুর নদীতে আভিযানিক কার্যক্রম পরিচালনাকালে জলদস্যু/ডাকাত “খোকাবাবু বাহিনীর’’ সদস্যগণ বিশ্বস্ত সূত্র এর মাধ্যমে আভিযানিক দলের কমান্ডারের সাথে যোগাযোগ করে এবং মৌখালী খালের ভিতর গহীন জংগলে তাদের অবস্থান নিশ্চিত করে। জলদস্যু বাহিনী প্রধান এ সময় বিশ্বস্ত সূত্র মারফত জানায় উক্ত চলমান অভিযানে তারা কোনঠাসা অবস্থায় পড়ে গেছে এমতাবস্থায় তারা র‌্যাবের নিকট নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করতে চায়। আভিযানিক দলটি ২৭ নভেম্বর ২০১৬ তারিখ আনুমানিক সাড়ে ৩টায় মৌখালী খালের নিকট পৌঁছালে খালের প্রবেশ মুখ হতে অনুমান ২০০ গজ পূর্ব দিকে উত্তর পাড়ে কয়েকজন লোককে দাড়িয়ে থাকতে দেখে এগিয়ে যায়। দাড়িয়ে থাকা লোকদের নিকট পৌঁছালে তারা বনের ভিতর থেকে বেরিয়ে এসে আভিযানিক দলের সামনে হাত উঁচু করে করে দাঁড়িয়ে থাকে এবং নিজেদেরকে বনদস্যু/ডাকাত কথিত “খোকাবাবু বাহিনীর’’ জলদস্যু (১) মোঃ কবিরুল ইসলাম ওরফে খোকাবাবু(৩৩), পিতাঃ মোঃ নজরুল গাজী, সাং- চাঁদনীমুখা (২) মোঃ আমিনুর ইসলাম(৩২), পিতাঃ মোঃ কুদ্দুস মোল্লা, সাং- ৯নং শরা, (৩) মোঃ শাহজাহান গাজী(৩০), পিতাঃ সাখায়েত গাজী, সাং- ৯নং শরা (৪) মোঃ আব্দুল আজিজ(৪৪), পিতাঃ মৃতঃ মানদার গাজী, সাং- কালিঞ্চি (৫) মোঃ মিজানুর রহমান(৩৬), পিতাঃ মোঃ কুদ্দুস মোল্লা, সাং- ৯নং শরা (৬) মোঃ রবিউল ইসলাম(২৫), পিতাঃ মৃতঃ মোফাজ্জল গাজী, সাং- পাইস্যাখালী (৭) মোঃ ওসমান গনি(৩৩), পিতাঃ মৃতঃ জব্বার মোল্লা, সাং- পাতাখালী (৮) মোঃ রফিকুল গাজী(৩৩), পিতাঃ মৃতঃ মোফাজ্জল গাজী, সাং- পাইস্যাখালী (৯) মোঃ ইয়াছিন আলী গাজী(২৫), পিতাঃ মোঃ কাওছার গাজী, সাং- পাইস্যাখালী সর্ব থানাঃ শ্যামনগর, জেলাঃ সাতক্ষীরা (১০) মোঃ মহিদুল ইসলাম(৩৩), পিতাঃ মোঃ মোবারক আলী, সাং- শ্রীরামপুর (১১) মোঃ মজিবর রহমান(৩৮), পিতাঃ মৃতঃ মোঃ আকবর আলী, সাং- ৭নং মাউথপুর (১২) মোঃ কালাম(৩৫), পিতাঃ মৃতঃ ইয়ার আলী, সাং- তুজলপুর, সর্ব থানাঃ সদর, জেলাঃ সাতক্ষীরা বলে পরিচয় প্রদান করে। তারা আভিযানিক দলকে জানায় যে, তাদের ব্যবহৃত কিছু অস্ত্র ও গোলাবারুদ বনের ভিতর লুকানো আছে যা তারা র‌্যাবের নিকট হস্থান্তর করতে চায়।

আভিযানিক দলটি জলদস্যুদের গ্রেফতার করে ঘটনাস্থলে উপস্থিত মাঝিদের নিয়ে অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধারের লক্ষ্যে বনের মধ্যে তল্লাশী শুরু করে। তল্লাশীর এক পর্যায়ে খালের পাড় হতে বনের মধ্যে অনুমান ১০০-১৫০ গজ ভিতরে লুকানো অবস্থায় একাধিক বস্তা, প্লাস্টিকের ব্যাগের ভিতরে ভরা অবস্থায় অস্ত্র-গুলি পাওয়া যায়। সকল ব্যাগ ও বস্তা থেকে সর্বমোট ২২টি দেশী-বিদেশী আগ্নেয়াস্ত্র এবং সকল প্রকার অস্ত্রের প্রায় ১০০৩ রাউন্ড তাঁজা গুলি উদ্ধার করা হয়।
২৭ নভেম্বর ২০১৬ তারিখ ৬টা নাগাদ অভিযানের সমাপ্তি ঘোষনা করা হয় এবং সাড়ে ৬টায় আত্মসমর্পনকারী দস্যু ও উদ্ধারকৃত অস্ত্র সরঞ্জামসহ র‌্যাব-৮ এর কার্য্যালয় বরিশালের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা হয়। ২৫ নভেম্বর ২০১৬ তারিখ হতে ২৭ নভেম্বর ২০১৬ তারিখ পর্যšত অভিযানে “খোকাবাবু বাহিনীর’’ ১২জন জলদস্যু র‌্যাব-৮ এর নিকট আত্মসমর্পন করে এবং ০৬টি বিদেশী একনালা বন্দুক, ০৪টি বিদেশী দোনালা বন্দুক, ০১টি .২২ বোর বিদেশী এয়ার রাইফেল, ০৬টি সাটারগান, ০২টি এয়ারগান, ০২টি ওয়ান শুটারগান এবং ০১টি বিদেশী কাটা রাইফেলসহ সর্বমোট ২২টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং সর্বমোট ১০০৩ রাউন্ড বিভিন্ন প্রকার গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়।

‘‘খোকাবাবু বাহিনী’’ সাম্প্রতিক সময়ে সুন্দরবনের অন্যতম সংগঠিত এবং সক্রিয় জলদস্যু বাহিনী। এই বাহিনী সকল অস্ত্র-গোলাবারুদসহ সদলবলে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নিকট আত্মসমর্পন এর ফলে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন ও তৎসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের উপকূলীয় অঞ্চলে নিরবিচ্ছিন্ন মৎস্য আহরণ সম্ভবপর হবে। বনজীবি এবং মৎস্যজীবি সাধারণ মানুষের মধ্যে এর ফলে ব্যাপক আশার সঞ্চার হবে এবং দস্যুবৃত্তিতে নিয়োজিত অন্যান্য বনদস্যু/জলদস্যুরাও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে দারুনভাবে উৎসাহিত হবে বলে মনে করেন র‌্যাব-৮ অধিনায়ক কর্নেল ফরিদুল আলম।