সিপিবি নেতার শেয়ার কেলেংকারি

581

যুগবার্তা ডেস্কঃ বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টি ( সিপিবি) নেতা রাগীব আহসান মুন্নার শেয়ার কেলেংকারিতে বিপাকে পড়েছে সাধারন বিনিয়োগকারীরা। বাংলাদেশে শেয়ার কেলেঙ্কারিতে আলোচিত কোম্পানিগুলোর মধ্যে অন্যতম জেএইচ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। জাল শেয়ারে বাজার থেকে কয়েক কোটি টাকা সংগ্রহের পর স্টক এক্সচেঞ্জ থেকে তালিকাচ্যুত হওয়া ৩৭টি কোম্পানির অন্যতম এটি। দীর্ঘ দুদশকেরও বেশি সময় ধরে লোপাট করা অর্থ ফেরত পান নি বিনিয়োগকারীরা। তারা যখন ঘুরছেন টাকার জন্য, তখন জেএইচ কেমিক্যালের চেয়ারম্যান রাগীব আহসান মুন্না দিব্যি রাজনীতি করে বেড়াচ্ছেন। তাও আবার বামপন্থি দলের নেতা হিসেবে। তিনি নিজেকে সাচ্চা বিপ্লবী বলে তত্ত্ব দিয়ে বেড়াচ্ছেন !
জে এইচ কেমিক্যাল নামের একটি কোম্পানী প্রতিষ্ঠা করেন মুন্না। তিনি এই প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান। প্রতিষ্ঠানের অন্য তিন মালিক হলেন সৈয়দ আফসার হোসেন, সুব্রত দত্ত ও দেবব্রত দত্ত। তারা জেএইচ কেমিক্যাল লিমিটেডের বহু সংখ্যক জাল শেয়ার প্রস্তুত করে তা নিরীহ বিনিয়োগকারীর মধ্যে বিক্রি করে। এভাবে কোটি কোটি টাকা তারা জালিয়াতি করে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে হাতিয়ে নেয়। সেই ঘটনা ১৯৯৮ সালের। এ সময় আরো অনেকে এই জাল শেয়ার বিক্রি করে। এর কু-প্রভাব শেয়ারবাজারের ওপর পড়ে। ফলে বিনিয়োগকারীরা প্রতারিত হন। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন তাদের নিজস্ব তদন্তে বিষয়টির সত্যতা পেয়ে একটি মামলা দায়ের করে। মামলাটি করা হয় মতিঝিল থানায়। এ মামলায় ২৯ নভেম্বর ২০১১ সালে রাগিব আহসান মুন্না ও অপর অভিযুক্ত জালিয়াতকারিরা আদালতে হাজিরাও দেয়।
জাল শেয়ার বেচাকেনার মামলায় ১২ বছর পর রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয় ২০১১ সালে। এ মামলার অন্যতম সাক্ষি সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের পরিচালক (আইন) মোঃ মাহবুবের রহমান চৌধুরী। ১৯৯৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর মতিঝিল থানায় সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন বাদী হয়ে মামলাটি করেছিল। মূল মামলায় ৮ জনকে আসামি করা হলেও সিআইডি দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০০৯ সালের ২১ জানুয়ারি অভিযুক্ত জে এইচ কেমিক্যালের রাগীব আহসান মুন্না সহ অপর তিন মালিকের বিরুদ্ধে চার্জশিট দাখিল করে।
শেয়ারবাজার নিউজ ডট কম তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ১৯৯৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩৭টি কোম্পানিকে তালিকাচ্যুত করে। এসব কোম্পানি বিভিন্ন সময়ে শেয়ার ছেড়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১৩১ কোটি টাকারও বেশি অর্থ সংগ্রহ করে। এর মধ্যে মার্ক বাংলাদেশ ৩৯ কোটি ৯০ লাখ টাকা, বেঙ্গল স্টীল ১৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা, প্যারাগন লেদার ১৬ কোটি টাকা, মেঘনা ভেজিটেবল ১০ কোটি টাকা, হাইস্পিড শিপিং ৩ কোটি ৭৩ লাখ টাকা, মিলিয়ন ট্যানারি ২ কোটি ১৬ লাখ টাকা, চাঁদ টেঙ্টাইল ৬০ লাখ টাকা, চাঁদ স্পিনিং ৬০ লাখ টাকা, ডেল্টা জুট ৫০ লাখ টাকা, গাওছিয়া জুট ১ কোটি টাকা, প্যানথার স্টীল ৯০ লাখ টাকা, আনোয়ারা জুট মিলস ১ কোটি ১০ লাখ টাকা, পেপার কনভার্টিন ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা, হাওলাদার পিভিসি ১ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, সোয়ান টেঙ্টাইল ১ কোটি ৯০ লাখ টাকা, নিউ ঢাকা রিফ্যাক্টরিজ ৪ কোটি ৩৩ লাখ টাকা, করিম পাইপ ২ কোটি ৬০ লাখ টাকা, ঢাকা ভেজিটেবল ৮ কোটি ৫০ লাখ, রূপন অয়েল ২ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, ইস্টল্যান্ড ক্যামেলিয়া ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা এবং রাগীব আহসান মুন্নার জেএইচ কেমিক্যাল ৩ কোটি ৩০ লাখ টাকা সংগ্রহ করে। এর মধ্যে তালিকাচ্যুতির আগে শুধু ইস্টল্যান্ড ক্যামেলিয়ার পরিচালকরা সাধারণ শেয়ারহোল্ডারদের কাছে থাকা সব শেয়ার কিনে নেন। বাকি ৩৫টি কোম্পানির বিনিয়োগকারীদের সব টাকাই আত্মসাত হয়ে যায়। ব্যতিক্রম নয় মুন্নার জেএইচ কেমিক্যালও।
২০০৪-২০০৫ অর্থবছরে সিকিউরিটি এক্সচেঞ্জ কমিশন তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানায়, জেএইচ কেমিক্যালের সব পরিচালকের বিরুদ্ধে সার্টিফিকেট মামলা দায়ের করা হয়েছে। থানায় দায়ের করা মামলার বাদী মাহবুবর রহমান চৌধুরী আদালতে তার জবানবন্দিতে বলেন, অভিযুক্তরা পরস্পর যোগসাজশে জেএইচ কেমিক্যাল লিমিটেডের বহু সংখ্যক জাল শেয়ার প্রস্তুত করে তা নিরীহ বিনিয়োগকারীর মধ্যে হস্তান্তর করে। যার প্রভাব শেয়ারবাজারের ওপর পড়ে। ফলে বিনিয়োগকারীরা প্রতারিত হন। সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন তাদের নিজস্ব তদন্তে বিষয়টির সত্যতা পেয়ে মামলাটি দায়ের করে।
শেয়ারবাজার নিউজ ডট কম গত মাসে তাদের এক প্রতিবেদনে জানায়, এসব মামলা দ্রুত নিষ্পত্তি না হওয়ার কারণে অভিযুক্তরা থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। প্রতিদিনই প্রতারিত এসব বিনিয়োগকারী শেয়ার হাতে টাকার জন্য ঘুরছেন। কিন্তু কারো কাছ থেকেই কোনো সমাধান পাচ্ছেন না।
বলা বাহুল্য, এর মধ্যে রাগীব আহসান মুন্নার কোম্পানিটিও রয়েছে। বিনিয়োগকারীরা যখন টাকার জন্য ঘুরছেন, তখন মুন্না দিব্যি প্রকাশ্যেই মাঠে রাজনীতি করে বেড়াচ্ছেন। বর্তমানে তিনি সিপিবির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত,দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা।