সিজার করেন ফার্মাসিস্ট ॥ দুই নবজাতকের মৃত্যু

100

কল্যাণ কুমার চন্দ,বরিশালঃ বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্রের ফার্মাসিস্ট হেদায়েত উল্লাহ নিজেই সিজারিয়ান ও এনেসথেসিয়ার মত স্পর্স কাতর রোগেরে স্ব ঘোষিত চিকিৎসক সেজে প্রতারিত করছেন উজিরপুর,গৌরনদী ও বাবুগঞ্জ উপজেলার শত শত সাধারন পরিবারের । বিভিন্ন নামীদামি চিকিৎসকের নাম ব্যবহার করে প্রতারনার মাধ্যমে দীর্ঘদিন থেকে তিনি নিজের প্রতিষ্ঠিত ক্লিনিকে সিজারিয়ান অপারশেন করাতে গিয়ে এবার জনতার হাতে ধরা পরেছেন।
ভুক্তভোগী ও নাম ভাঙ্গানো ডাক্তারদের অভিযোগে জানাগেছে, গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে হেদায়েত উল্লাহর ভুল অপারেশনে দুই নবজাতকের মৃত্যুর পর প্রতারনার বিষয়টি জনসম্মুখে চলে আসে। এরইমধ্যে গত ৭ জুন ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে তার একটি ক্লিনিক সিলগালা করে দেয়া হয়। এনিয়ে বিশেষ অনুসন্ধানে বেড়িয়ে আসতে থাকে হেদায়েত উল্লাহর ক্লিনিকের নানা অপর্কম ও প্রতারনার বিষয়গুলো। সম্প্রতি সময়ে ফার্মাসিস্ট হেদায়েত উল্লাহর কর্মস্থল বাবুগঞ্জের বীরশ্রেষ্ঠ জাহাঙ্গীরনগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান কেন্দ্রে, তার নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে অপসারনের দাবিতে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছেন ভূক্তভোগী এলাকাবাসী।
সূত্রমতে, বরিশাল-ঢাকা মহাসড়কের গৌরনদী উপজেলার তাঁত বোর্ড অফিস সংলগ্ন দক্ষিণ পালরদী এলাকায় দীর্ঘ কয়েক বছর পূর্বে হেদায়েত উল্লাহ সুরম্য অট্টালিকা ভবন নির্মান করে আনোয়ারা ক্লিনিক এ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার নামের একটি চিকিৎসা কেন্দ্র খুলে বসেন। গৌরনদীর কটকস্থল গ্রামের শওকত হোসেন অভিযোগ করেন, তার অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী সুমি বেগমের প্রসব বেদনা শুরু হলে গত ২ জুন তাকে গৌরনদীর আনোয়ারা ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ভর্তি করা হয়। পরবর্তীতে কোন ডাক্তারে সিজার অপারেশন করবে সে বিষয়ে জানতে চাইলে ক্লিনিকের স্টাফ শাওন জানান, উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ ফিরোজ হাসান অপারেশন করবে। শওকত আরও জানান, এর কিছুক্ষণ পর তার স্ত্রী সুমি বেগমকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে হেদায়েত উল্লাহ ও তার সহোযোগী শাওন সিজার অপারেশন করেন। ভুল সিজারে তার নবজাত শিশুর শরীরের বিভিন্নস্থানে আঘাতপ্রাপ্ত হয়ে মারা যায়। অপরদিকে প্রসূতি সুমি বেগমকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ তড়িঘড়ি করে বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে প্রেরণ করেন। সূত্রে আরও জানা গেছে, বিষয়টি ধামাচাঁপা দেয়ার জন্য স্থানীয় কতিপয় ক্লিনিকের দালালের সমন্ময়ে বুধবার মধ্যরাতে নিহত নবজাতকের স্বজনদের নিয়ে সমাধান বৈঠকে বসা হয়েছিলো।
গৌরনদী পৌর এলাকার বাসিন্দা হাজী মোঃ লিটন অভিযোগ করেন, তার অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রীকে গত ৩ জুন আনোয়ারা ক্লিনিকে ভর্তি করিয়ে তিনি জানতে চান, কোন ডাক্তার সিজার অপারেশন করবে। এসময় তাকেও জানানো হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ ফিরোজ হাসান এসেই অপারেশন করবেন। হাজী লিটন আরও অভিযোগ করেন, তাদের ক্লিনিকের রুমের বাহিরে বের করে দিয়ে তার স্ত্রীকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয়। বেশ কিছু সময় পর তিনি অপারেশন থিয়েটারে নবজাতকের চিৎকার শুনে এগিয়ে গিয়ে দেখতে পান উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ ফিরোজ হাসান নয়; ক্লিনিকের মালিক হেদায়েত উল্লাহ ও তার সহযোগী শাওন তার স্ত্রীর সিজার অপারেশন করেছেন। গৌরনদী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাঃ ফিরোজ হাসান বলেন, আমি কখনও আনোয়ারা ক্লিনিকে গিয়ে কোন অপারেশন করিনি। আমার নাম ব্যবহার করে কোন অপকর্ম করা মারাত্মক অপরাধ।
সূত্রমতে, আনোয়ারা ক্লিনিক এ্যান্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নেই কোন টেকনোলজিস্ট ও রোগ নির্নয়ের ব্যবস্থা। রোগীদের দেয়া হয়না কোন ব্যবস্থাপত্র। কতিপয় দালালের ছত্রছায়ায় গ্রামের রোগীদের সরলতার সুযোগ নিয়ে প্রতারনার করে নিরাপত্তা চুক্তির মাধ্যমে স্টোর কিপার হেদায়েত উল্লাহ দীর্ঘদিন থেকে দাপটের সাথে সিজার অপারেশন করে আসছেন। বিষয়টি যেন দেখার কেউ নেই। স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ক্লিনিক প্রতিষ্ঠার পর কয়েক বছর বিভিন্ন হাসপাতালের নামিদামী এমবিবিএস চিকিৎসকেরা এখানে কলে আসতেন। সম্প্রতি সময়ে হাসপাতালের কতিপয় নার্সের সাথে চিকিৎসকসহ ক্লিনিকের স্টাফদের অনৈতিক কর্মকান্ডের কথা ফাঁস হওয়ায় দীর্ঘদিন এখানে আর কোন নামিদামী এমবিবিএস চিকিৎসকেরা আসেননা। ফলে পূর্বের চিকিৎসকদের সিজার অপারেশনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে ক্লিনিক মালিক হেদায়েত উল্লাহ রোগী ও তাদের স্বজনদের সাথে প্রতারনা করে নিজেই এখন সিজার অপারেশন করে আসছেন।
উপজেলার নলচিড়া ইউনিয়নের কুতুবপুর গ্রামের সিদ্দিক সিকদারের পুত্র জুয়েল সিকদার অভিযোগ করেন, তার অন্তঃস্বত্ত্বা স্ত্রী রহিমা বেগমকে গত ৩ জুন হেদায়েত উল্লাহর মালিকানাধীন গৌরনদীর হোসনাবাদ লঞ্চঘাট এলাকার মাতৃসেবা ক্লিনিকে ভর্তি করা হয়। সেখানে গত ৫ জুন দুপুরে ডাক্তার হেদায়েত উল্লাহ তার স্ত্রীর সিজার অপারেশন করার পর পরই ভুল সিজারে তার নবজাতক শিশু অসুস্থ্য হয়ে পরে। জুয়েল আরও অভিযোগ করেন, তাৎক্ষনিক তিনি তার নবজাতক শিশুকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বরিশাল শেবাচিম হাসপাতালে নিয়ে যেতে চাইলেও ক্লিনিকের স্টাফ শাহানাজ বেগম অর্থের লোভে ভাল চিকিৎসার কথা বলে ক্লিনিকেই নবজাতককে রেখে দেন। এ ঘটনার পর পরই নবজাতক শিশুটি মারা যাওয়ার পর ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ নবজাতককে বরিশালে নিয়ে যেতে বলেন।
উল্লেখিত অভিযোগের ব্যাপারে হেদায়েত উল্লাহর সাথে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিফ না করার তার কোন বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে গৌরনদী মডেল থানার ওসি মোঃ ফিরোজ কবির জানান, মাতৃসেবা ক্লিনিকে ভুল চিকিৎসায় নবজাতকের মৃত্যুর অভিযোগ পেয়ে বুধবার সকালে উপজেলা ভ্রাম্যমান আদালতের বিচারক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) শরীফ আহম্মেদের নেতৃত্বে অভিযান পরিচালিত হয়। এসময় ক্লিনিকের অনুমোদনের কোন কাগজপত্র না থাকায় মাতৃসেবা ক্লিনিক কর্তৃপক্ষকে ৫০ হাজার, ওই এলাকার নিউ পপুলার ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালিককে ৩০ হাজার ও হোসনাবাদ ডায়াগনস্টিক চেম্বারের মালিককে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। একই সাথে মাতৃসেবা ক্লিনিক ও নিউ পপুলার ক্লিনিক এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টার সিলগালা করে দেয়া হয়েছে। উপজেলা ভ্রাম্যমান আদালতের বিচারক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) শরীফ আহম্মেদ জানান, আনোয়ারা ক্লিনিক ও হেদায়েত উল্লাহর অপারেশন করার কোন বৈধ কাগজপত্র রয়েছে কিনা সে ব্যাপারেও অভিযান পরিচালিত হবে।