সামুদ্রিক সম্পদ জলজ ও স্তন্যপায়ী প্রাণী অস্তিত্ব হুমকির মুখে।। উদ্বিগ্ন বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীরা

কলাপাড়া(পটুয়াখালী)প্রতিনিধি: বঙ্গোপসাগরে সামুদ্রিক সম্পদ জলজ ও স্তন্যপায়ী প্রাণী অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়েছে। একের পর এক মারা যাচ্ছে জলজ স্তন্যপায়ী প্রাণী ডলফিন, শুশুক আর কচ্ছপ। রবিবার সকালে জালে পেচানো অবস্থায় একটি জীবিত ডলফিন তীরে আসলেও পরে এটি মারা যায়। এ ডলফিনটি নিয়ে এবছর মোট ১০টি মৃত ডলফিন ও ১১ টি কচ্ছপ কুয়াকাটার সৈকতে ভেসে আসে। এর মধ্যে দু’টি জীবিত কচ্ছপ উদ্ধার করে সমুদ্রে অবমুক্ত করা হয়েছে। কোনটার শরীরের আঘাতে চিহৃ রয়েছে। কোনটার উপরিভাগের চামড়া উঠে গেছে। আবার কোনটা অর্ধগলিত। মৃত ডলফিন ও কচ্ছপগুলো যাতে গন্ধ না ছড়ায় সে জন্য মাটি চাপা দেওয়া হয়েছে। এর আগে একাধিক মৃত প্রানীর শরীর থেকে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হলেও মৃত্যুর সঠিক কারণ জানা যায়নি। তবে বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশকর্মীদের ধারণা, আবাসস্থলের চরম বিপত্তির কারণ, জেলেদের জালে আটকে পড়ে, ট্রলিং ফিসিং এর কারনে কিংবা জাহাজের সাথে ধাক্কা খেয়ে এসব বিরল প্রজাতির সামুদ্রিক সম্পদ মারা যেতে পারে।
ইউ এস এইডি এর অর্থায়নে পরিচালিত আান্তর্জাতিক গবেষনা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ফিশ, ইকোফিশ-২ তথ্যমতে এবছর এ পর্যন্ত কুয়াকাটা সৈকতে ১০ টি মৃত ডলফিন ভেসে এসেছে। এর মধ্যে জানুয়ারি মাসে ১টি, ফেব্রুয়ারিতে ১ টি, মার্চে ২ টি, এপ্রিলে ২ টি ও চলতি মে মাসে ৪ টি মৃত ডলফিন কুয়াকাটার সৈকতে ভেসে আসে। গত বছর সর্বমোট ১৮ টি মৃত ডলফিন সৈকতে ভেসে এসেছে। এছাড়া এ বছর কুয়াকাটা সৈকতে ১১ টি কচ্ছপ কুয়াকাটার সৈকতে ভেসে আসে। এপ্রিলে ৪ টি মৃত ও একটি জীবিত এবং মার্চ মাসে ৪টি। সর্বশেষে মে মাসে দু’টি সামুদ্রিক কচ্ছপ ভেসে আসে। এর মধ্যে একটি মৃত, অপরটি জীবিত। মৃত কচ্ছপ গুলোকে উদ্ধার করে মাটি চাপা দেয়া হয়েছে। আর জীবিত কচ্ছপ দু’টিকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে সাগরে অবমুক্ত করা হয়। এসব সামুদ্রিক প্রাণী একের পর এক মৃত অবস্থায় ভেসে আসার খবরে উদ্বিগ্ন পরিবেশবীদ ও সামুদ্রিক প্রাণী বিশেষজ্ঞরা।
একটি সূত্র জানায়, বঙ্গোপসাগরে জেলেদের ব্যবহার করা অবৈধ ট্রলিং জালে (ধ্বংসাত্মক বেহুন্দি জাল প্রকৃতির) সামুদ্রিক কচ্ছপ, ডলফিনসহ অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে। এ ছাড়া কচ্ছপ যখন ডিম পাড়ার জন্য বালিয়ারিতে চলে আসে, সে সময় হয়তো সমুদ্রে মাছ ধরারত জেলেদের জালে আটকা পড়ে, আবার ট্রলারের পাখায় কাটা পড়ে মারা যেতে পারে।
ব্লু-গার্ড সদস্য পান্না মিয়া বলেন, শনিবার সকাল আটটার দিকে পর্যটন কেন্দ্র কুয়াকাটার গঙ্গামতি সৈকতের সানরাইজ পয়েন্টে জালে পেঁচানো অবস্থায় জীবিত সমুদ্রিক কচ্ছপ উদ্ধার করা হয়েছে। এটির ওজন প্রায় ৪০ কেজি। সাগরে ভাটার টানে এটি বালুচরে আটকে পড়ে। দীর্ঘক্ষণ জালে পেঁচানো থাকায় কচ্ছপটির পেটের নিচের অংশ, পাখা ও পায়ে কিছুটা ক্ষত সৃষ্টি হয়েছে। এছাড়া দু’দিন আগে বৃহস্পতিবার (১৯ মে) সকালে রাবনাবাদ চ্যানেলে আরো একটি ৩৫ কেজি ওজনের একটি মৃত কচ্ছপ ভেসে আসে। এটিকে উদ্ধার করে মাটি চাপা দেয়া হয়েছে বলে তিনি জানিয়েছেন। কুয়াকাটা ডলফিন রক্ষা কমিটি টিম লিডার রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, দিন দিন সামুদ্রিক বন্ধু প্রাণী ডলফিনের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এতে সামুদ্রিক পরিবেশের চরম ক্ষতি হচ্ছে। তবে ডলফিনের মৃত্যুর সঠিক কারন খুঁজে বের করে জীববৈচিত্র্য রক্ষা জরুরী হয়ে পড়েছে।
ইউ এস এইডি এর অর্থায়নে পরিচালিত আান্তর্জাতিক গবেষনা প্রতিষ্ঠান ওয়ার্ল্ড ফিশ, ইকোফিশ-২ প্রকল্পের সহযোগী গবেষক সাগরিকা স্মৃতি বলেন, কুয়াকাটা সৈকতে একের পর এক মৃত ডলফিন, কচ্ছপ ভেসে আসছে তা নয়। এর আগের বছরগুলোতেও মৃত ডলফিন সৈকতে ভেসে এসেছিল। এ নিয়ে আমরা প্রতিনিয়ত বলে আসছি, এসব সামুদ্রিক প্রাণী কেন মারা যাচ্ছে, তার সঠিক কারণ খুঁজে বের করতে উদ্যোগ নেয়া দরকার বলে তিনি জানিয়েছেন।
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো.সাজেদুল হক বলেন, ডলফিন ও কচ্ছপকে সমুদ্রের অলংকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তন ও সামুদ্রিক দূষন (প্লাস্টিক ও অব্যবহৃত পরিত্যাক্ত জাল),সামুদ্রিক পরিবেশে পানির লবনাক্ততা, জৈব ও ভৌত গুনাগুনের পরিবর্তন এবং আবাসস্থলের চরম বিপত্তির কারনে ডলফিন ও কচ্ছপ মারা যাতে পারে বলে তিনি মনে করেন। তবে ডলফিন ও কচ্ছপ মরে উপকূলে ভেসে আসার বিষয় নিয়ে পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিশারিজ টেকনোলজি বিভাগ গবেষণা শুরু করেছে।
পটুয়াখালীর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, বন বিভাগ থেকেও ডলফিন, কচ্ছপসহ সামুদ্রিক প্রাণী রক্ষায় একটি গবেষণা প্রকল্প তৈরির কাজ চলছে। তাছাড়া আমরাও জেলেসহ মৎস্য সম্পদের সাথে জড়িত লোকদের সচেতনতায় কাজ করছেন বলে তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন।