সাজানো সিঙ্গাপুর, গোছানো সিঙ্গাপুর

63

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ আমার বহু চেনা জানা সিঙ্গাপুরের চাঙ্গী এয়ারপোর্ট। কতবার যে এই পোর্ট ব্যবহার করেছি তার ইয়ত্বা নেই। কেবলই ট্রানজিট হিসেবে নয়, কাজের প্রয়োজনেও বারবার আসতে হয়েছে সিঙ্গাপুর। একটি সময় ছিল, মাসের প্রায় তিনভাগের একভাগ সময় সিঙ্গাপুরে থাকতে হতো। দুপুরে টোকিও থেকে রওনা দিয়ে সন্ধ্যায় সিঙ্গাপুর। আইটি স্পেশালিস্ট হিসেবে এভাবে টোকিও-সিঙ্গাপুর আসা যাওয়া করেছি একটানা প্রায় পাঁচ বছর। খুবই ছোট একটি দেশ; এক পাশ থেকে অন্য পাশে যেতে ত্রিশ মিনিটও লাগে না। তবুও তো দেশ। সাজানো গোছানো চমৎকার পরিপাটি একটি সুন্দর এবং আধুনিকতম দেশ।
ভোরের আলো ফোটবার অনেক আগেই ইমিগ্রেশন ক্রস করে লাগেজ নিয়ে বেরিয়ে এসেছি। প্রায় বারো বছর পরে এলাম এই দেশে। আগে যখন আসতাম, একাই আসতাম। মাঝে মধ্যে শোনিমের আম্মু সাথে থাকতো। এই প্রথম আমার শোনিমও আছে। মূলত ওর জন্যেই এখানে আসা। লাগেজের ট্রলি ওর হাতেই। ও বড় হয়েছে। এখন আর আমাকে ট্রলি ঠেলতে হয় না। খুবই আনন্দ চিত্তে কাজটি শোনিমই করে। শোনিম হাঁটছে আর আশেপাশে নামাজের ঘর খুঁজছে। হাঁটতে হাঁটতে এক পর্যায়ে পেয়েও গেল। বাপবেটা দু’জনে এক সাথে ফজরের নামাজ সেরে নিলাম।
কেবল নামাজের ঘরই নয়, একটি আধুনিক এয়ারপোর্টে যা যা থাকা দরকার তার সবটাই আছে এই এয়ারপোর্টে। বাইরে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছে একটির পর একটি ট্যাক্সি। কোন হুড়াহুড়ি নেই, দরাদরি নেই; দালালদের কাড়াকাড়ি নেই, পাড়াপাড়ি নেই। টাউটারি বাটপারির তো প্রশ্নই উঠে না। কিন্তু আমার মনে এমন প্রশ্নের উদয় হয়! উদয় হয়, কারন আমি বাংলাদেশী। ওসব দেখে দেখেই তো বড় হয়েছি। আজ একুশটি বছর ধরে সারাটি পৃথিবী একা একা ঘুরে বেড়াচ্ছি। কোন দেশের এয়ারপোর্টে আমার সহযোগীতার জন্যে কাউকে লাগে না। একা একাই আসতে পারি, যেতে পারি। কেবল পারি না নিজ দেশে। কেবল মাত্র এই একটি দেশে পারি না। রাত নেই, দিন নেই, যখনই আসি, সাথে লোকবল নিয়ে আসতে হয়; গাড়ী নিয়ে আসতে হয়। না হলে বলা যায় না, কখন কী হয়!! এখানে এসবের সম্ভাবনা নেই মোটেও। সিঙ্গাপুরকে বলা হয় কঠিন নিরাপত্তার দেশ। গার্ডেন সিটিও বলে। এক সিটি, এক দেশ। ছোট্ট এই দেশে ভোরের আলো ফোটেছে কেবল। বড় বড় কৃঞ্চচুড়ায় ঢাকা হাইওয়ে দিয়ে ট্যাক্সি করে হোটেলের দিকে যাচ্ছি। এবারের হোটেল নিয়েছি মাঝ শহরে। শহরে প্রবেশ করতে করতে বুঝতে পারছিলাম ১২ বছর আগে দেখে যাওয়া এই দেশ ইতিমধ্যে আমুল বদলে গেছে। কেবল সারি সারি সুউচ্চ ভবনের মেলা। কমার্শিয়াল এরিয়ার সাথে ইউরোপ আমেরিকার কোন তফাৎ নেই। বরং ওসবকেও ছাড়িয়ে গেছে। রাস্তাঘাট আরো ঝকঝকে, তকতকে হয়েছে। বাগানে ভরে গেছে পূরো দেশ। নগরবিদদের নিপুন হাত পড়েনি এমন এক ইঞ্চি জায়গাও অবশিষ্ট নেই।
সিঙ্গাপুরের সরকার বহু বছর আগে আইন করেছিল যত্রতত্র ময়লা ফেলা যাবে না দেশের কোথায়ও। ফেললেই নগদ ৫০ ডলার জরিমানা। পৃথিবীতে এমনি কোন আইন সর্বপ্রথম এই দেশের সরকারই করেছিল। অবশ্য হাঁড়ে হাঁড়ে এর সুফলও পেয়েছে এই জাতি। এ দেশের রাস্তাঘাটে ময়লা খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিনই বটে। ফেলার সাহস দেখাবে কে? সিঙ্গাপুরের পুলিশ যে কতটা কড়া, তা, যে ধরা না খেয়েছে সে বুঝবে না। দেখতে, শুনতে এবং সাইজে খুব ছোট গড়নের এমনি পুলিশ। কিন্তু কথা, কর্মে এবং ধর্মে মিলিটারিকেও হার মানায়।
কঠিন ভাবে এগিয়েছে এদের অর্থনৈতিক সব সূচক। বিশ্ববাসী এখানে এসে তাদের অফিস খুলেছে বহু আগে থেকেই। পর্যটনখাত কতটা এগিয়েছে তা বোঝার জন্যে এদেশের ভুরি ভুরি ফাইভস্টার হোটেল দেখলেই বোঝা যায়। হোটেলের শহর সিঙ্গাপুর। ভ্রমন পিপাসুরা সারা পৃথিবী থেকে এখানে ছুটে আসে বিনোদনের আশায়। নিরাপত্তার কোন ঘাটতি নেই এদেশে। কেবল সামাজিক নিরাপত্তাই নয়, স্বাস্থ্য নিরাপত্তার দেশও সিঙ্গাপুর। সিঙ্গাপুরের বিশ্বসেরা হাসপাতাল এখন সবাই চেনে। আমাদের দেশের রাষ্ট্রপ্রধানসহ ভিআইপিগন হরহামেশাই এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন।
আইটি শিল্প ডানা মেলে উড়ে চলছে বিশ বছর আগ থেকেই। সাবমেরিন ক্যাবল কানেকশন নিয়েছে প্রায় ত্রিশ বছর হলো। ইন্টারনেট স্পীডে কোন দেশের সাথেই পিছিয়ে নেই। ডিজিটাল সিঙ্গাপুর ওদের স্বপ্ন নয়, বাস্তব। একসময় অবাস্তব ছিল সমুদ্র ভরাট করে দেশের আয়তন বাড়ানো। এটাও বাস্তবে হয়েছে। সমুদ্রের বিশাল জায়গা ভরাট করে সিঙ্গাপুরের স্থল সীমানা বাড়ানো হয়েছে। বারো বছর আগে যেখানে শীপে চড়ে ঘুরে বেড়িয়েছি এই আমি, সেখানে গড়ে উঠেছে সুরম্য অট্টালিকা আর নান্দনিক বোটানিক্যাল গার্ডেন।
একদিন আমরা যাচ্ছিলাম কেবলকারে করে সেনতোসা আইল্যান্ডে। বিনোদনের জন্যে বিখ্যাত সেনতোসা আইল্যান্ড। কারের একপাশে আমরা বসা। অন্যপাশে আমাদের ট্যুরগাইড। সমুদ্রের উপর দিয়ে কেবলকার যাচ্ছে। এত উঁচু যে নীচে তাকানো যায় না; ভয় করে। শোনিমের কোন ভয় নেই। ও দারুন এক্সাইটেট। শোনিমের মা এবং আমি চুপচাপ। এভাবে এত দ্রুত তোমাদের দেশের এত এত চমৎকার উন্নয়ন কিভাবে করলো, কিছুটা ভয় কাটিয়ে জানতে চাইলাম মাঝ বয়সী গাইড মহিলার কাছে। একখানা ভূবন ভোলানো হাসি দিয়ে খুব গর্ব করে তিনি বললেন, দেশটি এমনি সুন্দর করে বানিয়েছে আমাদের সরকার তথা রাজনৈতিক নেতারা।
তিনি হাসতে হাসতে আরো মজা করে বললেন, সিঙ্গাপুরের রাজনৈতিক নেতাদের মন হচ্ছে মেয়েদের মত। লক্ষ্য করে থাকবে, ছেলেরা মেয়েদেরকে ভালবাসে তাদের চেহারা দেখে। তাই না? আগে চেহারা দেখে, চেহারা মাপে। যদি চেহারা পছন্দ হয়, তারপর ভালবাসায় পড়ে। চেহারা পছন্দ হয়নি তো সব বাদ। তাই মেয়েদের কাজই হলো সারাক্ষন মেকাপ করে ছেলেদের দৃষ্টি আকর্ষন করা। তাদের লক্ষ্যই থাকে পরিপাটি সুন্দর হয়ে থাকা, যেন তাকে দেখতে সুন্দর লাগে। সিঙ্গাপুর সরকার দেশের জনগনের মনের কথা বুঝতে পারে। জনগন চায় দেশ সুন্দর হোক। তাই নেতারা সুন্দর করে বানাচ্ছে আমাদের এই দেশ। যেন জনগন সব সময় তাদের সরকারকে পছন্দ করে।
আমি হা হয়ে শুনছিলাম মহিলার কথা। মজা করে বললেও তিনি বলেছেন দারুন। তার কথায় অনুপ্রানিত হয়ে ভাবছিলাম আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে। মিলাতে পারছিলাম না কিছুতেই। এক পর্যায়ে মনে হলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতাদের মন হচ্ছে ঠিক উল্টো; ছেলেদের মত। আমিও মজা করেই ভাবা শুরু করলাম। লক্ষ্য করে থাকবেন, মেয়েরা ভালবাসে ছেলেদের কথা। তারা ছেলেদের চেহারা দেখে না, মাপে না। কেবল ছেলেদের কথা শুনে তারা ভালবাসায় পড়ে। যে যত সুন্দর কথা বলে পটাতে পারে, মেয়েরা তাদের প্রতিই আকৃষ্ট হয়। তাই মেয়েদের কাছে আকর্ষনীয় হবার জন্যে ছেলেরা কথার অনুশীলন করে। কথা যত মিথ্যে হয়, তত আকর্ষনীয় হয়; রোমান্টিক হয়। তাই ছেলেরা মিথ্যে বলা প্র্যাকটিস করে। অবলীলায় মিথ্যে বলে যায় মেয়েদেরকে।
আমাদের দেশের রাজনৈতিক নেতারা দেশের জনগনকে ভাবে মেয়েমানুষ। ভাবে, তারা তো কোয়ালিটি বোঝে না; কেবল কথাতেই পটে, কথাতেই পাগল। তাই কাজ করা লাগে না; ঘরে বাইরে সব জায়গায় কেবল গুল মেরে যায়। মহা গুল। যখন যেখানে মনে যা চায় তাই অবলীলায় বলে যায়। কারো ধার ধারে না। সকালে কিছু বলে বিকেলেই অস্বীকার করে। জবাবদিহিতার কথা স্বপ্নেও ভাবে না। কথার ফুলঝুড়িতে জনগনকে আশা দেয়, আশ্বাস দেয়। মিথ্যে স্বপ্ন দেখায় অনাগত ভবিষ্যতের। আর জনগনও আসলেই মেয়েদের মতই। তাদের কথায় বিশ্বাস করে তালি দেয়। তালি দিতে দিতে হাত ব্যথা করে ফেলে। আর অপেক্ষা করে যুগের পর যুগ। কেবলই অপেক্ষা; শত শত যুগের অপেক্ষা!!! -লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা