সরকার নড়েচড়ে বসেছে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়নে

172

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ
আমার বড় মামা এসেছিলেন চিকিৎসা নিতে। আজকাল খুব একটা আসেন না ঢাকায়। অবসরে গেছেন কয়েক বছর হলো। এরপর থেকে খুব না ঠেকলে আর ঢাকামুখী হন না। উপজেলা শহরেই তাঁর খুঁটি গেড়েছেন। নিদেনপক্ষে এলাকা ছাড়েন না। এবার রোগে এমনভাবে কাহিল হয়েছিলেন যে আর থাকতে পারেননি। শরীর যখন আর চলে না, চোখ যখন খোলে না, আর মন যখন মেলে না তখন উপায়ই বা কি! সব ছেড়েছুড়ে প্রচন্ড দূর্বলতা নিয়ে খুব ভোরে যখন আমাদের বাসায় পৌঁছালেন, দেখে তো আমি অবাক; মহা অবাক। তবে ডাক্তার অবাক হয়েছিলেন আরো বেশী।
অবশ্য সঠিক চিকিৎসা শরীরে বইতে সময় লাগেনি তেমন। ঔষধে তড়িৎ কাজ হয়েছে। শরীর রেসপন্স করেছে দ্রুত। আস্তে আস্তে তিনি সুস্থ্য হতে শুরু করেছেন। তাঁর সুস্থ্যতা বোঝার সহজ সিম্পটম হলো কথা বলা বেড়ে যাওয়া। সারাক্ষন অনর্গল কথা বলা মানুষটি যখন পারতপক্ষে কথাই বলতেন না, আমাদের সকলের কপালে চিন্তার বলিরেখা তখন ফুটে উঠেছিল। দিন পাঁচেক যেতেই তিনি কথা বলা বাড়িয়ে দিচ্ছিলেন। কথা বলা মানে গল্প বলা; সব পূরানো দিনের গল্প। বলার ধরনও আলাদা। একই গল্প একই দিনে বেশ কবার রিপিট করাই তাঁর ধরন। তাঁর গল্পের একমাত্র বিষয়বস্তু কেবল শিক্ষা আর দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। পারিবারিক ব্যবসার পাশাপাশি তিনি দাপটের সাথে শিক্ষকতাও করেছেন। মেধায় তাঁর তুলনা তিনি নিজেই। তিনি সুপার-ডুপার মেধাবী দেলোয়ার হোসেন মিঞা।
মামার ঢাকায় থাকাকালীন শিক্ষার মানোন্নয়ন নিয়ে একটি সংবাদ আমাদের সাপ্তাহিকে ছাপা হয়েছিল। সংবাদটি তাঁর মনে ধরেছিল ভীষন। আর যায় কোথায়! দেশের বাড়ীতে ফিরে যাবার আগ পর্যন্ত এটাকেই চর্বিত চবন করেছেন আর সুযোগ পেলেই আমাকে বলেছেন বিষয়টি নিয়ে লিখতে। শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে তাঁর ভাবনা অসাধারণ। সনাতন পদ্ধতির শিক্ষাব্যবস্থার তিনি ঘোরতর বিরোধী। বাচ্চাদের এত পড়ার চাপ তিনি কিছুতেই সহ্য করতে পারেন না। তাই এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর কথাগুলো তাঁর খুবই মনে ধরেছে; তিনি মহা খুশী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, শিশুদের জন্য শিক্ষা হতে হবে আনন্দময়। প্রথম শ্রেণীতেই শিক্ষার্থীদের ওপর বই আর পড়ার বোঝা চাপিয়ে দেয়া যাবে না। এমন কোন পাঠ্যসূচী নেয়া ঠিক হবে না, যা শিশুদের মধ্যে ভীতির সৃষ্টি করে। বইয়ের বোঝায় শিক্ষার প্রতি তাদের যাতে অনীহা সৃষ্টি না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
তিনি বলেন, যেমন বইয়ের বোঝা, তেমন পড়ার বোঝা এবং হোম ওয়ার্ক। এত বেশি হোম ওয়ার্ক দেয়া হয় যেদিন স্কুলে ঢুকল তারপরই স্কুল সম্পর্কে শিশুদের একটা ভীতি সৃষ্টি হয়ে যায়। এটা করা যাবে না। একটা বাচ্চা ৫ বছর বয়সে স্কুলে গেল, তখনই তাকে সব বিদ্যা শিক্ষা দিতে হবে তা নয়। বাচ্চারা তাড়াতাড়ি শিখে কিন্তু আগেই যদি বোঝা চাপিয়ে দেয়া হয় তাহলে ধীরে ধীরে পড়াশুনার প্রতি একটা অনীহা সৃষ্টি হয়ে যেতে পারে। তাই খেলাধুলাসহ অন্য যেভাবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ সৃষ্টি হয় সে ধরনের উদ্যোগও তাদের জন্য নিতে হবে। শিক্ষক ও স্কুলের প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ সৃষ্টি করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্কুলে যাওয়ার বয়স হলেই সব শিশু যাতে ভর্তি হতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। ছাপানো প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা দিয়ে ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হবে কেন? যখনই একটা শিশুর ভর্তির বয়স হবে তখনই তাকে ভর্তি নিতে হবে। শিক্ষা তার মৌলিক অধিকারগুলোর একটি। শেখ হাসিনা প্রশ্ন রাখেন, সে যদি ছাপানো প্রশ্নপত্র পড়ার মতো জ্ঞানই অর্জন করে থাকে, তাহলে আর তাকে পড়াবে কী স্কুলে?
আমার মামা বার বার শিক্ষক প্রশিক্ষনের কথা বলেছেন। বলেছেন, সবচেয়ে বড় ঘাটতি প্রশিক্ষনে। কেউ শিক্ষক হয়ে জন্ম নেয় না; শিক্ষক বানাতে হয়। সারাজীবন শিক্ষকতা করেছেন বলে এসব হাড়ে হাড়ে উপলব্ধি করেন। আর প্রশিক্ষনের তেমন ব্যবস্থা নেই বলে খুবই আপসোসও করেন। খুশীর বিষয় হলো সরকার এদিকটাতেও নজর দিয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষকদের প্রশিক্ষনের মাধ্যমে আরও দক্ষ করে তুলতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। লক্ষ্য শিক্ষকদের দক্ষতা
বৃদ্ধির মাধ্যমে শ্রেণীকক্ষের শিক্ষাদান প্রক্রিয়াকে উন্নত করে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা।
এটা খুবই ভাল লক্ষন। এভাবে আস্তে আস্তে সব কিছুতেই সরকারকে হাত দিতে হবে। তবে শিক্ষার মানোন্নয়নে সবচেয়ে সুদূরপ্রসারী জায়গাটিতে সরকার ইতিমধ্যেই হাত দিয়েছে। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এখন থেকে এমপিওভুক্ত বেসরকারী কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পরিষদ আর শিক্ষক কর্মচারী নিয়োগ দিতে পারবে না। এ ব্যাপারে তাদের কোন ভূমিকাই থাকবে না। পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মত নতুন কোন কমিশন হবে বেসরকারী শিক্ষক নিয়োগের জন্যে। মূলত নিয়োগ বানিজ্য বন্ধ আর ভাল শিক্ষক নিয়োগের জন্যে সরকার এই যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারকে সাধুবাদ জানাতেই হয়।
কিন্তু যেই না সরকার গতবছর অক্টোবরের ২২ তারিখ পরিপত্র জারি করেছে অমনি দেশজুড়ে শুরু হয়েছিল তেলেসমাতি কান্ড। চাকুরী কমিশন করতে কয়েকমাস সময় লাগবে। এটাই হলো সুযোগ। এই সুযোগে দেশের প্রায় সব বেসরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের হিড়িক পড়ে যায়। অর্থাৎ এখনই শিক্ষকের প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক, কমিশন হবার আগেই যেখানে যত সুযোগ আছে, সে সব কাজে লাগাতে সবাই উঠে পড়ে লাগলো। পত্রপত্রিকায় কেবল নিয়োগ আর নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি। বিশেষ করে মফস্বলের আধাচলা পত্রিকাগুলো ভরে গেল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে। মনে হলো শিক্ষক নিয়োগ ছাড়া প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিদের আর কোন কাজকর্ম নেই।
এসব দেখে সরকার বসে থাকেনি। মহা দূর্নীতি ঠেকাতে এবং প্রকৃত মেধাবীদের নিয়োগ দিতে সরকার কঠোর হয় এবং নতুন পরিপত্র জারি করে অবৈধ নিয়োগ বন্ধ করে দেয়। এই নিয়োগ বন্ধের কারণ হিসেবে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ জানিয়েছেন, মেধাবী শিক্ষকদের তুলে আনার জন্যই নিয়োগ বন্ধ রাখা হয়েছে। শিক্ষার গুনগতমান ও মেধার ভিত্তিতেই মেধাবী শিক্ষকদের তুলে আনা হবে। এটা করা না গেলে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো যাবে না। অনেকের ভাগ্যের উন্নয়নের চেয়ে শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরী। উনি ঠিকই বলেছেন; শিক্ষার মানোন্নয়নে ভাল শিক্ষক তৈরীর বিকল্প নেই।
এসব দেখে দূর্নীতিবাজদের তো মাথায় হাত। টুপাইস কামানোর সুযোগ শেষ। এখন তারা কেবল মাথা চুলকিয়ে হাপিস হুপিস করছে। এক চালানে মোটা টাকা কামানোর সুযোগ হাতছাড়া হয়ে গেল। বছরের পর বছর ধরে চলা মোটা মাল কামানোর সুযোগ শেষ। এও কি মানা যায়! ইতিমধ্যেই যারা লেনদেন সেরে ফেলেছে তাদের অবস্থা আরো করুণ। টাকা ফেরতের আশা খুবই ক্ষীণ। যারা এসব করেছে তারা পড়েছে মহা অস্বস্তিতে। তবে সমগ্র জাতি ফেলেছে স্বস্তির নিঃশ্বাস। সরকার জাতিকে স্বস্তি দিয়েছে। সরকার চাইলে যে ভাল কিছু করতে পারে এটা তার উদাহরণ।
একজন লেখক চাইলে কিন্তু ভাল কিছু লিখতে পারেনা। ছেলেবেলায় মোটামুটি বছর দুই লাগে লেখালেখি শিখতে। কিন্তু লেখক হতে, মানে, কী লেখা উচিত আর কী উচিত নয় তা শিখতে সারা জীবন লাগে। শিক্ষা নিয়ে আমার কীইবা এমন যোগ্যতা যে আমি লিখবো। তবুও মনে হয় শিক্ষাখাতে সরকারের আরো অনেক কিছু করার আছে। পূরো শিক্ষা ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে আনতে হবে। শিক্ষকদেরকে আধুনিক ব্যবস্থায় প্রশিক্ষন দিয়ে মানসম্মতভাবে তৈরী করতে হবে। যতটা সম্ভব তাড়াতাড়ি সকল পাবলিক পরীক্ষা কেন্দ্রীয়ভাবে নেয়া থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ছাত্র যার, পরীক্ষা নেবার অধিকার তার। নিজের ছাত্রের পরীক্ষা নেবার অধিকার শিক্ষককে দিতে হবে।
শিক্ষককে বিশ্বাস করতে হবে। ৪৫ বছর তো গেল। বিশ্বাস করতে আর বেশী দিন সময় নেয়া ঠিক নয়। বিশ্বাস একটা ছোট শব্দ। এটা পড়তে আধা সেকেন্ড, লিখতে এক সেকেন্ড লাগে। আর ভাবতে লাগে কয়েক মিনিট। তবে বুঝতে কয়েক দিন লাগে। কিন্তু প্রমান করতে লেগে যায় পূরো জীবন। সরকারের কাছে অনুরোধ, আমাদের শিক্ষকদের বিশ্বাস করতে পূরোটা জীবন লাগাবেন না পি−জ!! আমাদের তো কেবল একটিই ছোট্ট জীবন, তাইনা!!! -লেখকঃ যুগবার্তা, উপদেষ্টা সম্পাদক