সরকারের খাদ্যশস্য মজুদ নেমেছে অর্ধেকে; সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ এবং গুদামের অপ্রতুলতা দূর করা জরুরি

রফিকুল ইসলাম জাহিদঃ
দেশে খাদ্যশস্যের মজুদ গত বছরের তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। সরকারি কর্মকর্তারা বলছে, বিভিন্ন কর্মসূচিতে খাদ্যশস্য দেয়ায় ওই পরিমাণ খাদ্যশস্য সংগ্রহ করা হয়নি। এজন্য মজুদ কমে গেছে। উল্লেখ্য, খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্য পরিকল্পনা ও পরিধারণ ইউনিটের (এফপিএমইউ) তথ্য অনুযায়ী, ১৫ নভেম্বর-২০১৬ সরকারিভাবে দেশে খাদ্যশস্যের মোট মজুদ ৮ লাখ টনের মতো। এরমধ্যে চাল ৫ লাখ ৪২ হাজার টন ও গম ২ লাখ ৬৫ হাজার টন। গত বছর একই সময়ে এ মজুদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ লাখ টন। এরমধ্যে ১২ লাখ ৩৭ হাজার মে. টন চাল ও ৩ লাখ ৬২ হাজার টন গম ছিল। খাদ্যশস্যের মজুদের পরিমাণ এতটাই কমে গেছে যে গত কয়েক বছরের মধ্যে তা সর্বনিম্ন। প্রধান খাদ্যশস্য চালের উৎপাদন, বণ্টন, বিপণনসহ সার্বিক তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে বেশ কিছুদিন ধরে সরকার দেশকে খাদ্যে স্বয়ংস¤পূর্ণ দাবি করে আসছে। সরকারি হিসাবে, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সারা দেশে বোরো ধান উৎপাদিত হয়েছে ৩ কোটি টনের বেশি, যা লক্ষ্যমাত্রা ছাপিয়ে গেছে। বিশ্বখাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) বাংলাদেশের খাদ্য পরিস্থিতি নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। কিন্তু মাত্র কয়েক মাসের ব্যবধানেই দেখা যাচ্ছে, সরকারি খাদ্য মজুদ পরিস্থিতি নাজুক অবস্থায় নেমে এসেছে। বোরো সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ারও শঙ্কা দেখা দিয়েছে। সরকারের খাদ্যশস্য মজুদ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে জানা গেছে, সরকার খাদ্যশস্য সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি। এছাড়া বিভিন্ন কর্মসূচিতে খাদ্যশস্য দেয়া হয়েছে কিন্তু সে পরিমাণে সংগ্রহ হয়নি। আর এই সংগ্রহ না হওয়ার আরেকটি
কারণ হলো গুদাম সঙ্কট। সরকার ও নীতি নির্ধারকদের অদূরদর্শিতা ও উদাসীনতার কারণে গড়ে তোলা হয়নি চাহিদানুযায়ী খাদ্য গুদাম। সরকারি খাদ্য বিশেষজ্ঞরা বলছে, বর্তমানে দেশে ২০ কোটি মানুষের খাদ্য চাহিদা প্রায় ৫ কোটি ৭০ লাখ টন। জনসংখ্যানুপাতে চাহিদার অন্তত ১০ শতাংশ অর্থাৎ প্রায় ৪০ লাখ টন খাদ্যশস্য মজুদ রাখা প্রয়োজন। বর্তমানে দেশের খাদ্যগুদামগুলোর ধারণক্ষমতা ২০ লাখ টন। গুদামের অভাবে আপদকালীন খাদ্যশস্য মজুদ গড়ে তোলা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দেশের খাদ্য ব্যবস্থাপনা ঝুঁকির মুখে রয়েছে। পাশাপাশি এবার ধান ও চাল একসাথে সংগ্রহ শুরু না করে ধান সংগ্রহ শেষ করার পর চাল সংগ্রহ শুরু করা হয়েছে। তাছাড়া ধান-চাল রাখার জায়গারও অভাব রয়েছে। ফলে সব কিছু মিলিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চাল সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, যে কোনো রাষ্ট্রের নাগরিকদের জন্য খাদ্য নিরাপত্তায় সরকারিভাবে কমপক্ষে ৬০ দিনের খাদ্য মজুদ রাখা প্রয়োজন। আমাদের মোট জনগোষ্ঠীর একদিনের খাদ্য চাহিদা প্রায় ৪৬ হাজার মেঃ টন। সে হিসেবে আমাদের দেশের ৬০ দিনের জন্য খাদ্য মজুদ রাখার কথা সাড়ে ২৭ লক্ষ মেঃ টন। কিন্তু আমাদের দেশে কখনোই গড়ে ১৬/১৭ লক্ষ মেঃ টনের উপর খাদ্য শস্য মজুদ থাকে না এবং বর্তমানে সেটারও অর্ধেকে নেমে এসেছে। এমতাবস্থায় নিশ্চিত করেই বলা যায়, আমাদের দেশে বর্তমানে খাদ্য মজুদ পরিস্থিতি কোনোভাবেই নিরাপদ জায়গায় নেই।
বলাবাহুল্য, বাংলাদেশে খাদ্যশস্য সংরক্ষণে গুদাম ও হিমাগারের যথেষ্ট অপ্রতুলতা রয়েছে। গুদাম ও হিমাগার সঙ্কটের কারণে প্রতি বছর টনকে টন খাদ্যশস্য নষ্ট হয়। এছাড়া হিমাগার সঙ্কটের কারণে তা কৃষকদের কাছ থেকেও সংরক্ষণ করা সম্ভব হয় না। বাংলাদেশের কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের অধীনে হিমাগার রয়েছে মাত্র ২১টি। দেশের মানুষের মৌলিক অধিকারগুলোর মধ্যে খাদ্য অন্যতম। কারণ বেঁচে থাকতে হলে মানুষের খাদ্য গ্রহণের কোনো বিকল্প নেই। যা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের।