সরকারের আচরণে ‘নমনীয়তা’ দেখছে না বিএনপি

যুগবার্তা ডেস্কঃ বিএনপির ব্যাপারে সরকারের কঠোর অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হয়নি, ভবিষ্যতে সরকার আরও কঠোর হবে—এমনটাই মনে করছেন দলটির নেতারা। তাঁদের মতে, বিএনপি যতই নমনীয় হোক বা গণতান্ত্রিক রাজনীতি করুক না কেন, সরকারের আচরণে শিগগির কোনো পরিবর্তন আসবে না।
চলতি বছরের ৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ উপলক্ষে বিএনপির নেওয়া কর্মসূচি ঘিরে সরকারের আচরণের পর দেশের অন্যতম প্রধান এই রাজনৈতিক দলের নেতারা এমনটাই মনে করছেন।
দলটির নেতারা বলছেন, এখন সে অর্থে বিএনপির কোনো কর্মসূচি নেই। তবু তাদের দিবসভিত্তিক কর্মসূচিও পালন করতে দেওয়া হচ্ছে না। সরকার বিএনপিকে আবারও সহিংসতার দিকে নিয়ে যেতে চাইছে। কিন্তু বিএনপি এখনই হরতাল-অবরোধের মতো রাজপথের কর্মসূচিতে নামার চিন্তা করছে না।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান বলেন, বিএনপি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় থাকতে চায়। সরকারের আচরণে কোনো নমনীয়তা লক্ষ করা যাচ্ছে না। ৫ জানুয়ারি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সঙ্গে আচরণ, ওই দিন দেশের বিভিন্ন জায়গায় কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া, ৭ জানুয়ারি সমাবেশ করতে না দেওয়া এসবের মাধ্যমে বোঝা যায়, বিএনপি যতই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় থাকতে চাক না কেন, সরকার স্বৈরাচারী আচরণ করেই যাবে। যেহেতু এই সরকার স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বিশ্বাস রাখছে না, তাই সবার মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠন, নির্বাচনকালীন সরকার গঠন বা সুষ্ঠু নির্বাচন এসব আশা করা যায় না।
৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তিতে সমাবেশ করতে না পেরে টানা অবরোধের ডাক দিয়েছিল বিএনপি। তিন মাস সে কর্মসূচি চলেছিল। কিন্তু সরকার পতন হয়নি। পরবর্তী সময়ে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি ঘোষণা না দিলেও কর্মসূচি থেকে ফিরে আসে। গত বছর ৫ জানুয়ারির দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিতে সমাবেশ করতে পেরেছিল বিএনপি। সেদিন দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বলেছিলেন, আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তিনি সমাধান চান।
সরকারের এই আচরণকে উসকানি হিসেবে দেখছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ৫ জানুয়ারি বিভিন্ন জায়গায় বিএনপির কর্মসূচিতে বাধা দেওয়ার নিন্দা জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেছিলেন, সরকার উসকানি দিয়ে বিএনপিকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে চাইছে। তবে বিএনপি সংঘাতের রাজনীতিতে বিশ্বাস করে না। বিএনপি ভোটের মাধ্যমে ক্ষমতা পরিবর্তনে বিশ্বাসী।
বিএনপি নেতারা বলছেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের প্রথম বর্ষপূর্তি থেকে হরতাল-অবরোধে গেলেও পরবর্তী সময়ে সে ধরনের কর্মসূচিতে না গিয়ে বিএনপি ‘ইতিবাচক’ রাজনীতিতে থাকার দিকে জোর দেয়। এরই অংশ হিসেবে গত বছর দলের কাউন্সিলে একটি রূপকল্প তুলে ধরা হয়। পাশাপাশি জঙ্গিবাদ ইস্যুতে জাতীয় ঐক্যের আহ্বান, রামপালে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ নিয়ে দলের অবস্থান তুলে ধরা এবং নির্বাচন কমিশন গঠন নিয়ে প্রস্তাব দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশন নিয়ে আলোচনার জন্য রাষ্ট্রপতির উদ্যোগ ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের পর কিছুটা আশাবাদী হয়েছিল বিএনপি। কিন্তু নির্বাচনের তৃতীয় বর্ষপূর্তিতে এসে সরকার বিএনপিকে সমাবেশ করতে দেয়নি। দেশের বিভিন্ন জায়গায় দলীয় কর্মসূচিতে বাধা এসেছে। দলটির নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন, বিএনপির এই নমনীয়তাকে সরকার দুর্বলতা মনে করছে। তবে এটাও তারা মানছেন, সরকারবিরোধী ব্যাপক আন্দোলন গড়ে তোলার মতো সাংগঠনিক শক্তি এখন বিএনপির নেই। সরকার বিএনপিকে এখন কোনো সুযোগ দিতে চায় না বলে তাঁরা মনে করছেন।
দলের নেতারা মনে করছেন, সরকার বিএনপিকে সভা-সমাবেশ করতে না দেওয়ায় সরকার ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এতে সরকারের কর্তৃত্ববাদী চরিত্র মানুষের কাছে আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। বিএনপি যে সরকারকে ফ্যাসিবাদী বলে আসছে, তা প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। এই অবস্থায় বিএনপি এখনই হরতাল-অবরোধের মতো কঠোর কর্মসূচিতে গিয়ে শক্তি ক্ষয় করতে চায় না। তারা চায় দল গোছানোর পাশাপাশি সভা-সমাবেশের মতো কর্মসূচি দিয়ে মাঠে থেকে নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করতে।
জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠনকে সামনে রেখে বিএনপি নতুন করে সমঝোতার একটি উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু সরকারের আচরণে মনে হচ্ছে, তারা মনে করছে, বিএনপিকে কোনোভাবেই ‘স্পেস’ দেওয়া উচিত হবে না। আওয়ামী লীগ নিজেরা সমাবেশ করেছে, জাতীয় পার্টি সমাবেশ করেছে, কিন্তু বিএনপিকে সমাবেশ করতে দেওয়া হলো না। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক। সরকারের উচিত ছিল বিএনপিকে স্পেস দেওয়া, কারণ সমাবেশ করা রাজনৈতিক দলের অধিকার। -প্রথম আলো