সরকারী জাহাজ নির্ভীক ব্যর্থ হলেও; সফল বেসরকারী মদিনা সালভেট

131

কল্যাণ কুমার চন্দ,বরিশাল থেকেঃ সকল প্রকার সরঞ্জামাদি থাকা সত্বেও কীর্তনখোলা নদীতে নৌ-দুর্ঘটনায় বিআইডব্লিউটি’র উদ্ধারকারী জাহাজ নির্ভীকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের অদক্ষতায় অর্ধনিমজ্জিত গ্রীণ লাইন উদ্ধারে ব্যর্থ হলেও সেখানে উদ্ধার কাজের মাধ্যমে সফলতার পরিচয় দিয়েছে বেসরকারী মালিকাধীন উদ্ধারকারী জাহাজ মদিনা সালভেট। ব্যর্থ হওয়া উদ্ধারকারী সরকারী জাহাজ ও সফলভাবে উদ্ধার কাজ সম্পন্নকারী মালিকানাধীন জাহাজের একই ধারণ ক্ষমতা হওয়া সত্বেও শুধুমাত্র অভিজ্ঞতার অভাবে সরকারী জাহাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে বলে জানিয়েছেন সচেতন মহল। উভয় উদ্ধারকারী জাহাজের ধারণ ক্ষমতা ২৫০টন।
নির্ভীকের ব্যর্থতার পর গ্রীণ লাইন-২ ওয়াটার ওয়েজটি গত ২৬ এপ্রিল উদ্ধার করেছে মালিকাধীন উদ্ধারকারী জাহাজ মদিনা সালভেট। এ উদ্ধারকারী জাহাজের সুপারভাইজার মোঃ মাঈনউদ্দিন বলেন, কাগজপত্রে গ্রীণ লাইন-২ ওয়াটার ওয়েজটির ওজন দেখা যায় ৫৫০টন, ভিতরে পানি ছিল প্রায় ২ শ’ টন সমতুল্য, সর্বমোট প্রায় ৭৫০টন। যেহেতু ওয়াটার ওয়েজটি অর্ধনিমজ্জিত ছিলো তার ওজন হবে ৩৫০টন। ব্যাখা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, যেকোন বস্তুর ওজন পানিতে অর্ধেক হয়। সেহেতু গ্রীণ লাইন ওয়াটার ওয়েজটি উদ্ধার করতে ১৭৫টন ধারণক্ষমতার যেকোন উদ্ধারকারী জাহাজই যথেষ্ট। তবে এক্ষেত্রে বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কৌশল থাকা প্রয়োজন। মোঃ মাঈনুদ্দিন আরও বলেন, আমাদের উদ্ধারকারী জাহাজের ধারণ ক্ষমতা ২৫০টন আর সরকারী উদ্ধারকারী জাহাজ নির্ভীকেরও ধারণ ক্ষমতা ২৫০টন। সেক্ষেত্রে নির্ভীক জাহাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও কৌশল জানা না থাকার কারণেই তারা ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন।
বিআইডব্লিউটিএ থেকে অবসরগ্রহণ করা ডুবুরি আব্দুল হাকিম জানান, নির্ভীক জাহজের সুপারভাইজার নুর মোহাম্মদ ও বিআইডব্লিউটিএ’র উপ-পরিচালক রফিকুল ইসলামের উদ্ধার কাজে তেমন কোন অভিজ্ঞতা না থাকার কারণেই গ্রীণ লাইন-২ ও কার্গো মামুন মাসুম-১ উদ্ধারে ব্যর্থ হয়েছে নির্ভীক। তার (হাকিম) পূর্ব অভিজ্ঞতার কৌশল থেকে তিনি বলেন, গ্রীণ লাইন-২ অর্ধডুবি অবস্থায় নদীর তীরে থাকায় গ্রীণ লাইনের পিছনে ক্রেন বেঁধে হালকা উপরে উঠিয়ে পানি কমালে এমনিতেই গ্রীণ লাইন ওয়াটার ওয়েজটি ভেসে উঠবে। তিনি আরও বলেন, নির্ভীক জাহাজের বর্তমান সুপারভাইজারের বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকার কারণেই তিনি ওজনের সমস্যা দেখিয়ে এড়িয়ে গেছেন। একই কৌশল অবলম্বন করে গ্রীণ লাইন-২ ওয়াটার ওয়েজটি মালিকাধীন জাহাজ মদিনা সালভেট উদ্ধারকরার পর ডক ইয়ার্ডে নেয়া হয়েছে।
এ ব্যাপারে শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবের সভাপতি কাজী নাসির উদ্দিন বাবুল বলেন, বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণ দিয়ে আনা ডুবুরিদের কাজে না লাগিয়ে অদক্ষতার প্রমাণ দিয়েছে সরকারী উদ্ধারকারী জাহাজ নির্ভীকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা। তাদের উচিৎ ছিলো প্রশিক্ষিত ডুবুরিদের সাথে পরামর্শ করে কাজে লাগানো। এ দূর্ঘটনায় জেলা প্রশাসন কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির প্রধান ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোঃ জাকির হোসেন সরকারী কাজে ঢাকায় থাকলেও মোবাইল ফোনে বলেন, যেখানে নির্ভীক ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে, সেখানে কৌশলের মাধ্যমে এভাবে যে গ্রীণ লাইন-২ উদ্ধার করা হয়েছে তা সত্যি অবিশ্বাস্য ঘটনা। বিষয়টি তিনি তদন্ত প্রতিবেদনের সাথে যুক্ত করবেন বলেও উল্লেখ করেন।
উদ্ধারকারী জাহাজ নির্ভীকের কমান্ডার ও বিআইডব্লিউটিএ’র ডেপুটি ডিরেক্টর মোঃ রফিকুল ইসলাম বলেন, উদ্ধারকারী জাহাজ নির্ভীকের সর্বোচ্চ ধারন ক্ষমতা ২৫০ টন কিন্ত আমরা কাগজপত্র পর্যালোচনা করে দেখেছি সবমিলিয়ে গ্রীণ লাইনের ওজন দ্বিগুন। তাই নির্ভীকের দ্বারা এ নৌ-যান তোলা সম্ভব হয়নি। নির্ভীক জাহাজের সুপারভাইজার নুর মোহাম্মদ বলেন, আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে নৌযান উদ্ধার করে রুট সচল করা। গ্রীণ লাইন নদীর এক পাশে থাকায় ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে নৌযান চলাচলে কোন সমস্যা হয়না সুতরাং এটা আমাদের কাজের মধ্যে পরেনা। বরিশাল বিআডিবিব্লউটিএ’র নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের উপ-পরিচালক আজমল হুদা মিঠু জানান, নিমজ্জিত কার্গোটির স্থান নিশ্চিত হওয়ার পর রশি দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে।
উল্লেখ্য, গত ২২ এপ্রিল বিকেলে বরিশাল সদর উপজেলার চরবাড়িয়া এলাকা সংলগ্ন কীর্তনখোলা নদীতে গ্রীণ লাইন-২ ও কার্গোর মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। কার্গোটি ঢাকা থেকে বরিশালের উদ্দেশ্যে আসছিল। অপরদিকে বরিশাল থেকে যাত্রী নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে যাচ্ছিল যাত্রীবাহি নৌ-যান এমভি গ্রীণ লাইন-২। এটি চরবাড়িয়ার ভাঙন কবলিত এলাকা অতিক্রমকালে বিপরীতদিক থেকে আসা কার্গোটির সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে কার্গোটি মুহুর্তের মধ্যে ডুবে যায়। সংঘর্ষে গ্রীণ লাইনের সামনের অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে তলা ফেটে অর্ধনিমজ্জিত হয়। ওইদিন সন্ধ্যায় ডুবে যাওয়া কার্গো ও অর্ধনিমজ্জিত গ্রীণ লাইন উদ্ধার আসে সরকারী উদ্ধারকারী জাহাজ নির্ভীক। ধারন ক্ষমতার চেয়ে অধিক ওজন হওয়ার অজুহাত দেখিয়ে উদ্ধার অভিযানে না নেমেই পরেরদিন ফিরে যায় সরকারী এ উদ্ধারকারী জাহাজটি। ফলে গ্রীণ লাইন কর্তৃপক্ষ মালিকানাধীন বেসরকারী ২৫০ টন ধারন ক্ষমতা সম্পন্ন উদ্ধারকারী জাহাজ মদিনা সালভেট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করে মাত্র দুইদিনের মধ্যে গত ২৬ এপ্রিল অর্ধনিমজ্জিত গ্রীণ লাইন-২ উদ্ধার করে ঢাকার ডক ইয়ার্ডে নিয়ে যায়।