সময়ের আবর্তনে প্রেমের বিবর্তন!!

333

ইঞ্জিঃ সরদার মোঃ শাহীনঃ
প্রিয় পাঠক, শুভ নববর্ষ! নতুন বছর আপনাদের জন্যে হোক কল্যাণময়। পূরো বছরই তো নানা জটিল বিষয় নিয়ে লিখে আপনাদের মন ঝালাপালা করি। আনন্দের এই ক্ষনে এমন করা ঠিক হবে না। তাই ভাবছিলাম বাংলা নববর্ষে কী নিয়ে লিখবো! চারদিকেই দেখছি এলাহী কান্ড; নববর্ষ নিয়ে অনেক আয়োজন, অনেক ব্যস্ততা। একে অপরকে নানা ভাবে শুভেচ্ছা জানাবার ধুম পড়ে গেছে। মোবাইল আর ফেসবুকে শুভেচ্ছা জানাবার সে কী ছড়াছড়ি! এ সব শুভেচ্ছার ভাষা যত না নতুন বছরকে নিয়ে, তার চেয়ে ঢের বেশী প্রেম, ভালবাসা নিয়ে। নতুন বছরের আগমনের ছুঁতোয় মনের নিভৃত গহীনের ভালবাসা আদান প্রদানের সুযোগটা কেউই মিস করতে চাচ্ছে না। হোক বা সেটা প্রকৃত, হোক না হয় মেকি!
তাই সুযোগটা আমিও নিলাম। নববর্ষে পাঠককুল নিশ্চয়ই খোশ মেজাজে আছে। এমনি খোশ মেজাজে খোশ গল্প করাই উত্তম হবে। ভালবাসার চেয়ে খোশ গল্প আর কিইবা এমন আছে! ভালবাসা বিষয়টি মারাত্মক বিষয়। এর সাথে মান-অভিমান, সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বিরহ, হাসি-কান্না, রাগ-অনুরাগ সবই জড়িত। ভালবাসায় পড়েনি এমন মানুষ নেই। কিন্তু, পড়েও স্বীকার করেনা এমন মানুষ আছে; মেলা আছে। হয়ত শরমের কারনেই স্বীকার করে না। আসলে ভালবাসা একটি মারাত্মক (!) শরমের ব্যাপার; লজ্জার বিষয়। এটা নিয়ে যত ঘাটাঘাটি করা হবে, ভিতর থেকে ততই লজ্জা বের হবে।
ভালবাসা কিংবা প্রেম নিয়ে অজ¯্র প্রবন্ধ, কাব্য, মহাকাব্য, গীতিকাব্য লেখা হয়েছে। কেউ না কেউ নিত্যদিন লিখছেন; লিখেই চলেছেন। তবুও লেখা শেষ হয় না; অনুভূতি পূরোপুরি প্রকাশ পায় না। অনুভূতি প্রকাশের যেমনি অনেক রকমভেদ আছে, তেমনি এই প্রেমেরও অনেক ধরন আছে। মানব প্রেম, সাহিত্য প্রেম, দেশ প্রেম, প্রকৃতি প্রেম, পশু প্রেম; আরো কত প্রেম!
প্রেম যত ধরনেরই হোক, সময়ের আবর্তনে সব ধরনের প্রেমেই বিবর্তন হয়েছে। মোটামুটি ভাবে ১৯ শতকের শুরু বা বিংশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত প্রেমের বিবর্তন হতো বেশ সময় নিয়ে। এ সময়ের সকল ধরনের প্রেম ছিল অমরপ্রেম টাইপের। এসবের প্রেমিক প্রেমিকারা প্রেমের রাজ্যে নিজেদেরকে অমর করে রেখেছেন। আজো মানুষের মুখে মুখে ফেরে তাঁদের নাম। তাঁদের প্রেম সময়কে জয় করেছে।
সবচেয়ে জটিল প্রেম হলো মানব প্রেম। অমর মানবপ্রেমিক হিসেবে ইউসুফ-জুলেখা, লাইলী-মজনু, শিরী-ফরহাদের নাম উলে−খযোগ্য।গানে কিংবা কবিতায় আজো তাদের কথা বলা হয়ে থাকে। আবার সাহিত্যের অমরপ্রেমিক হিসেবে সেক্সপিয়ার, মধুসুদন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, শরৎ চন্দ্র কিংবা হালের হুমায়ুন আহমেদ আজো বেঁচে আছেন পাঠক হৃদয়ে। তাঁদের মৃত্যু নেই। আর অমর দেশপ্রেমিক হিসেবে তিতুমীর, ক্ষুদিরাম, মহাত্মা গান্ধী, নেতাজী, শের ই বাংলা, ভাসানী কিংবা বঙ্গবন্ধু চির অমর, চির অ¤−ান। বাংলাদেশের প্রতিদিনের প্রতিটি পত্রিকার পাতায় পাতায় যত না হাসিনা-খালেদার নাম আসে, তার চেয়ে ঢের বেশী আসে বঙ্গবন্ধুর নাম।
অমর প্রেমের এই ধারাটি মোটামুটি ভাবে বাংলাদেশের জন্মলগ্ন পর্যন্ত চলমান ছিল। এরপর থেকেই শুরু হলো প্রেমের বিবর্তন। অমর প্রেম বিবর্তিত হয়ে হয়ে আচমকা অবুঝ প্রেমে রূপ লাভ করলো। যে প্রেম বুঝ মানে না শাব্দিক অর্থে তাকেই বলে অবুঝ প্রেম। প্রতিটি প্রেমের ক্ষেত্রেই এই অবুঝ প্রেম চোখে পড়ার মত ছিল তখন। একটি উদাহরণ দেই।
আমার এক ভাইয়ের বয়স তখন ১৩ কি ১৪; একেবারে পিচ্চি তিনি। বাড়ীর পাশের বয়সে বড় একজন দিদির প্রেমে পড়ে গেল। কি জানি একটি বই দেয়ার উছিলায় বইয়ের ভেতরে প্রথম প্রেম পত্রখানিও দিয়ে দিল। ঠিক পত্র নয়; প্রেমের দুলাইন ছড়া। নিজের লেখা নয়, পত্রিকার পাতা থেকে ধার করা। দিদিও তার পাঠানো ছড়াখানি সামান্য প্যারোডি করে উত্তর দিলেন, প্রেমের অনির্বান শিখা চিরদিন জ্বলে, সন্ধ্যে বেলায় আইসো তুমি খেজুর গাছের তলে। আমাদের দুই বাড়ীর মাঝের খেজুর গাছ। সকাল থেকেই মন ছটফট করছে ভাইয়ের। সময় আর ফুরোয় না। অবশেষে দিদি আসলেন। ছিঃ ছিঃ, তুমি এত্ত খারাপ! এই বয়সেই এইসব! আমি তোমার চাইতে বয়সে কত্ত বড়! খাঁড়াও মাসীমারে (আমার মা) কইয়া দিমু। ভাই তো আম্মার ভয়ে কেঁদেই ফেলেছে। মাফটাফ চেয়ে একাকার। দিদি একটু বিটলা টাইপের ছিলেন। বেশ কয়েকবার কানধরে উঠবস না করিয়ে ভাইকে ছাড়েননি সেদিন।
অবুঝ মানবপ্রেমের অনেক কিসিম আছে। প্রিয়জনকেনা পেলে হুট করে আত্মহত্যা করে ফেলতো। একা একা বেঁচে থেকে কী লাভ! আবার জীবনসঙ্গী হিসেবে না পাবার সম্ভাবনা থাকলে রিস্ক নিত না; আগেভাগেই ভাগিয়ে নিয়ে বিয়ে করতো। কোন কোন ক্ষেত্রে জোর করতো; অপহরণ করতো। সবই প্রেমের অবুঝ মনের আস্ফালন। অবুঝ দেশপ্রেমও অনেকটা একই রকম ছিল। বন্দুকের নলের জোরে নির্বাচিত সরকারকে হটিয়ে ক্ষমতায় বসতো। গদিতে বসেইে জনদরদী সেজে দেশপ্রেমিক হবার চেষ্টা করতো। আর অপেক্ষায় থাকতো কখন উর্দী খুলে সিভিল ড্রেস পড়বে। ক্ষমতায় যাবার অবুঝ মন বড়ই তাড়িত হতো অবুঝ দেশপ্রেমিক সাজার।
অবুঝ প্রেমের এই পর্বটি বেশীদিন টেকেনি; বছর বিশেক ছিল। এরপর আবারও প্রেমের বিবর্তন। এর নাম তোতলা প্রেম। গত ২৫ বছর ধরে এদেশে তোতলা প্রেম চলছে। বড়ই অদ্ভুত এই প্রেম। এই প্রেমের প্রতিটি কথায় সবাই কেমন যেন তোতলামী করে। তোতলামী করা ছাড়া কেউ যেন প্রেমের প্রকাশ ঘটাতেই পারে না। তোতলামীটা ঘটে ন্যাচারালী; ইচ্ছে করে কেউ করে না।
দেশপ্রেমের কথাই ধরুন। দেশপ্রেমিকের দাবীদার যারাই সরকারে থাকে তারা সরকারে যাবার আগে গনতন্ত্র, গনতন্ত্র বলে কান্না করে। আর সরকারে গেলেই গণতন্ত্রের কথা বেমালুম ভুলে যায়। জানতে চাইলে তোতলিয়ে তোতলিয়ে গণতন্ত্রের চেয়ে উন্নয়নের উপর বেশী গুরুত্ব আরোপ করে। মজার ব্যাপার হলো তাদের দলে কোন কালেই গণতন্ত্রের দেখা কেউ পায়নি। (যেটা আছে সেটাকে বলে দেখাইন্না তন্ত্র।) কিন্তু কেউই ভাবে না, যাদের দলে গণতন্ত্র নেই, তারা সরকারে গেলে কিভাবে গণতন্ত্রের চর্চা করবে? এরপরও আমরা তাদেরকে গণতন্ত্রের ধারক এবং বাহক মনে করে মিছিলে যাই, শে−াগান দেই। জায়গা মত পেলে যখনই কেউ তাদেরকে এই অসঙ্গতি ধরিয়ে দেয়, তখনই শুরু হয় গাইগুই করে আমতা আমতা কথা বলা। মানে তোতলামী করা। তোতলামী করে তাদের স্বপক্ষে কিছু একটা বলার চেষ্টা করে মাত্র। এতে কেবল দেশের প্রতি তোতলা প্রেমই প্রকাশ পায়; আর কিছুই নয়।
আবার যারা সরকারে নেই, তারাও তোতলায়। কী করে, আর কী বলে নিজেরাও জানে না। তারাও গণতন্ত্র, গণতন্ত্র বলে কান্না করে। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সরকার পক্ষের অধিকাংশ এমপি নির্বাচিত হলে মনে করে উহা অগণতান্ত্রিক। ভোটারগন ভোট দিতে পারে নাই। আবার নিজের দলের কাউন্সিলে চেয়ারপারসন, ভাইস চেয়ারম্যান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলে বলে, তারা গণতান্ত্রিক ভাবেই নির্বাচিত। এখানেও যে দলের কাউন্সিলরগন ভোট দিতে পারেন নাই, সেটা বেমালুম চেপে যান। এরা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্যে অগণতান্ত্রিক আন্দোলনও করে। গাড়ী পোড়ায়, মানুষ পোড়ায়; নিজেরা কখনো পোড়ে না। সাধারণ মানুষ মারে, কিন্তু নিজেরা মরে না। আন্দোলনের ডাক দিয়ে নিজেরাই মাঠে থাকে না। সারাদিন ঘুমিয়ে বিকেলে জেগে মেকআপ নিয়ে ক্যামেরার সামনে হাজির হয়ে আন্দোলন সফল করার জন্যে দেশবাসীকে ধন্যবাদ দেয়। কিন্তু যেই না কেউ জায়গা মত হাত দেয়, অমনি গলা নীচে নেমে আসে; শুরু হয় তোতলামী। তোতলাতে তোতলাতে বলে, এমন সন্ত্রাসী কাজ আমরা করতে পারি না; আমাদের দলে সরকারী অনুচর ঢুকেছে। উহা তাদেরই কাজ।
তোতলামীর প্রবেশ বাদ থাকেনি মানবপ্রেমের ভিতরেও। অবুঝ প্রেমের আমলে প্রেমের পার্টনার মোটে একজন থাকলেও তোতলা প্রেমের এই আমলে একাধিক পার্টনার যত্রতত্র দেখা যায়। ফেসবুক, কিংবা মোবাইলের সুযোগে সহজেই গোপন প্রেম চালিয়ে যায়। গোপন প্রেম, গোপন পার্টনার; যেমন মজার, তেমন যাতনার! এই আমলে পরকীয়ার ছড়াছড়ি, অসৎকামে বাড়াবাড়ি; আবার ধরাও খায় তাড়াতাড়ি। ধরা খেলেই তোতলামী শুরু; আরে তু…তু…তুমি ভু….ভুল বোজতেছো। খা….খা….খারাপ কিছু না, আমি অফিস কলিগের সাথে ক….ক….কথা বলছিলাম। তবে এই তোতলামোতে কাজ হয় না। সর্বনাশ যা হবার হয়ে যায়। সংসারেরও হয়, দেশেরও হয়। এসবে সর্বনাশকারীদের কিচ্ছু হয় না!
প্রিয় পাঠক, আশাহত হবেন না! সব তোতলা প্রেমই সর্বনাশের প্রতীক হয় না; অসৎ হয় না। সত্যিকার নির্ভেজাল প্রেমের প্রকাশও তোতলামী করেই হয়। ছোট্ট সন্তানকে কোলে নিয়ে মা যখন আদর করে তখন তোতলামী করেই তো করে; আলে বাবা লে! আমাল বাবুটা কি কলে লে? আমাল ছোনাতা লাগ কলেছে লে!!!-লেখকঃ উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা