সময়টা ভাল যাচ্ছে না!

71

ইঞ্জি: সরদার মো: শাহীনঃ সম্পাদকীয় লিখতে বসলে মানুষটার কথা মনে না রেখে পারতাম না। কারন তিনিও যে এই লেখাটা পড়বেন। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে পড়বেন। তাই তাঁর কথা মাথায় আসতোই। লেখায় সাবধানীও ছিলাম তাঁর জন্যেই। তিনি জ্ঞানী মানুষ। ভুল পেলে কষ্ট পাবেন। সাহিত্যে ওনার দারুন দখল। যে কোন কথাকেই ছন্দ দিয়ে প্রকাশ করা তাঁর জন্যে পানিভাত। প্রতিটি লাইন শুরু করেন গদ্যের আঙ্গিকে, আর শেষ হয় পদ্য হয়ে। এ রকম কবি কমই আছে। তিনি খুব বড় মাপের একজন লেখক। লিখেছেনও প্রচুর। বেশ কয়েকটি বই ও কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। আরো কয়েকটি প্রকাশের অপেক্ষায়।
তিনি কবি শেখ লুৎফর রহমান! তাঁর অনেক কবিতাই পড়েছি। যে কোন বিষয়কে কবিতার ভাষায় ছন্দের তালে উপস্থাপনে তাঁর জুড়িমেলা ভার। কবিতাগুলোর প্রতিটি বাক্য চয়নে, শব্দ প্রয়োগে সাবধানী অথচ অত্যন্ত কৌশলী তিনি। বাংলা ভাষা এবং সাহিত্য নিয়ে সার্বক্ষনিক তাঁর নিজের বিনোদিত হওয়া এবং অন্যকে বিনোদিত করার প্রক্রিয়াটি আমি সব সময় খুব উপভোগ করি। তিনি বঙ্গবন্ধুর জীবনী নিয়ে কাব্য রচনা করেছেন, করেছেন নজরুলকে নিয়েও। পছন্দের অনেককে নিয়েই লিখেছেন। আবার লিখেছেন আমার মত একেবারেই সাধারন স্নেহাস্পদকে নিয়েও।
গেল ২৪শে মে রাতে আমার শোনিমকে নিয়ে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। পরদিন ওর ইয়ার ফাইনালের শেষ পরীক্ষা। পরীক্ষা শেষে কী কী করবে বাপবেটা মিলে তার লিষ্ট হচ্ছিল। এরই মাঝে সেই মানুষটির হঠাৎ মৃত্যু সংবাদ! প্রথমত আমি থ হয়ে গেলাম! মেনে নিতে পারছিলাম না। আমার ভীষন পছন্দের মানুষ শেখ লুৎফর রহমান। অবসরপ্রাপ্ত আমলা হলেও চেহারায় তার ছিটেফোঁটাও নেই। আপাদমস্তক একজন নিরেট ভাল মানুষ। সহজ সরল খাঁটি মানুষ!
মাঝরাতে খবরটি আমায় দেন হাফিজ ভাই। ফোনে তাঁর ভারী কন্ঠে বিচলিত ছিলাম বটে। কিন্তু লুৎফর রহমানের চির প্রস্থানের খবরের জন্যে মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। তিনিও ছিলেন না। মুক্তিযোদ্ধা হাফিজ ভাই আমার কাছে মিডিয়া সেন্টারের মত। সবার সব খবর তিনি সবার আগে পান। তিনি সবার খবর সব সময় রাখেন বলেই তাঁর কাছে সব খবর সবার আগেই আসে। লুৎফর রহমান ভাইয়ের সাথে আমার যোগাযোগ সব সময় ছিল। তাঁর খবরাখবর আমি এবং আমরা সব সময় রাখলেও গেল বেশ অনেকগুলো মাস তাঁর সাথে দেখা করে উঠতে পারিনি। যাই যাই করেও যাওয়া হয়নি।
শেষ একবার তাঁকে ময়মনসিংহের ধলায় সিমেক ফাউন্ডেশনের একটি প্রোগ্রামে নিয়ে গিয়েছিলাম। তখনই কিছুটা দূর্বল লাগাতে পরে আর কোন প্রোগ্রামে তাঁকে কষ্ট দেইনি। আমরা একই স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র। বয়সের ব্যবধান অনেক হলেও আমাদের সম্পর্কের সূত্রটা এখানেই। আশির দশকে আমাদের ধলা হাই স্কুলের জন্যে তিনি তাঁর সাধ্য দিয়ে অনেক কিছু করেছেন। আপাদমস্তক তিনি ছিলেন স্কুলের হিতাকাঙ্খী এবং একজন প্রকৃত শিক্ষানুরাগী মানুষ। ধলা থেকে ফেরার সময় আলাপে আলাপে নিজ আঞ্চলিক ভাষায় বলছিলেন, খালি আমরার স্কুলডাই না, পুরা দেশটারে খাইলো ভেজাইল্যা পলিটিকসে। নীতিহীন এই নোংরা পলিটকস সব জায়গায় জ্যাম লাগাইয়া দিছে। জ্যাম নাই কোন হানে? পুরো দেশটাই তো জ্যামে আটকা পড়ছে। ঘরে জ্যাম, বাইরে জ্যাম; রাষ্ট্রে জ্যাম, রাস্তায় জ্যাম।
ঢাকার মোহাম্মদপুরে তাঁর বাসার কাছের মসজিদে নামাজে জানাজা। উত্তরা থেকে দুঘন্টা সময় হাতে নিয়ে বের হয়েছি। রাস্তায় ভালই জ্যাম। উত্তরা থেকে ত্রিশাল যাওয়া যায় দু’ঘন্টায়; মোহাম্মদপুর যাওয়া যায় না। তাই জানাজা পাবো কি না জানি না; টেনশানে আছি। ইদানীং সব কাজেই টেনশান। সময়টা আসলে ভাল যাচ্ছে না। চারদিকে কেবল জ্যাম আর জ্যাম। মনের ভাবনায় জ্যাম, রাস্তায় জ্যাম। রাষ্ট্র চালনায়ও কোথায় যেন জ্যাম লেগে যাচ্ছে। স্থিরতা নেই, কেবলই সবখানে অস্থিরতা।
অথচ দেশের রাজনীতিতে কোন অস্থিরতা নেই। আন্দোলন নেই, বিরোধীদল নেই। তবুও সরকার যেন স্বস্তিতে নেই। কেমন যেন অস্থিরতার প্রহর গুনছে। অস্থিরতার কেন্দ্রবিন্দু আদালত পাড়া। টিভিতে দেখলাম হাতকড়া পড়িয়ে জোর কদমে পুলিশ নারায়ণগঞ্জের সেই লাঞ্চিত প্রধান শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে কারাভ্যানে তুলছে। শিক্ষককে লাঞ্চনার ঘটনায় সেলিম ওসমানকে স্থায়ীভাবে জামিন দিয়ে, ঘুষ নেয়ার অভিযোগে শ্যামল কান্তি ভক্তকে কারাগারে পাঠানোর ঘটনায় ঝড় বইছে দেশজুড়ে। যেন অপরাধী নয়; যে অপরাধের স্বীকার হলো তার বিচার হয়েছে। শ্যামল কান্তি ঘুষ নিয়েছিল, কি না নিয়েছিল এটা অবশ্যই একটা বিতর্ক। তবে কান ধরার ঘটনাটা না ঘটলে কি এই ঘুষ নেওয়ার কাহিনী বা বাস্তবতা সামনে আসত? তো ঘুষ দেওয়ার অপরাধটা বিবেচনায় আনা হলো না কেন? ঘুষ যদি অপরাধই হয়, তো যিনি দেন তিনি কি নিরপরাধ?
শিক্ষককে কানে ধরে ওঠবস করালেন সাংসদ, ক্ষোভে ফেটে পড়ল দেশের সাধারণ মানুষ। অথচ উদ্ধত সাংসদকে নয়, অবিশ্বাস্য খুচরো অভিযোগে বিদ্যানুরাগী শিক্ষককে কারাগারে পাঠাল। কতলোক ঘুষ খায়, কিচ্ছু হয় না; কিন্তু অভিযোগ মাত্রই শিক্ষক শ্যামল কান্তিকে জেলে ঢুকানো হলো। কী চমৎকার! লাঞ্চিত থাকে কারাগারে, লাঞ্চনাকারী পায় জামিন।
জনগণ এসবে ভাল ইঙ্গিত পায় না। সরকারের বিরুদ্ধে জনগণের মনকে বিষিয়ে তোলার কিংবা উসকে তোলার কোন খেলা কি না কে জানে। একদিকে সারাদেশে বিদ্যুতের ব্যাপক লোডশেডিং, অন্যদিকে জৈষ্ঠের প্রচন্ড তাপদাহ। এমনিতেই নাগরিকগণের জীবন অতিষ্ট প্রায়। খুবই বিরূপ আচরণ করছে প্রকৃতি। প্রকৃতি ভীষণ গরম।
গরম আদালত পাড়ার বড় বড় আইনজীবিগণও। তাদের মাথা গরম, কথাও গরম। রাজনীতির মাঠের ঠান্ডা খেলোয়ার ডঃ কামাল। বলা নেই, কওয়া নেই; সেদিন তিনি মাথা গরম করে ফেললেন। হঠাৎ করে সুপ্রীম কোর্টে প্রধান বিচারপতির সামনে সরকারের প্রধান আইন কর্মকর্তা এ্যাটর্নী জেনারেলকে বাস্টার্ড বলে একখানা গালি দিয়ে দিলেন।
পরে অবশ্য ক্ষমা চেয়েছেন। কিন্তু মুখ দিয়ে যা বের হবার তাতো বেরিয়েই গেছে। ক্ষমা চাইলেই কি বিষয়টি শেষ হয়ে যায়? কাউকে আঘাত করে ক্ষমা চাইলেই যদি শেষ হয়ে যায়, তাহলে সবাই অপরাধ করেই এজলাশে দাঁড়িয়ে ক্ষমা চাওয়া শুরু করবে। তাই নিন্দুকেরা বলছে অন্য কথা। তারা গালি দেবার অন্য কারন খুঁজছে। রাস্তাঘাটে বসে তো আর এই গালি তিনি দেননি। মাঠে ময়দানের বক্তৃতায়ও দেননি। দিয়েছেন প্রধান বিচারপতির এজলাশে আপিল বিভাগের সাতজন বিচারপতির সামনে। সকল বিচারপতিও নিশ্চয়ই এতে বিব্রত হয়েছেন।
আর তিনি তো যেনতেন কেউ নন। তিনি ডঃ কামাল! তাঁর নামটি লিখতে গেলে “প্রথিতযশা” কথাটিও মিডিয়া সব সময় লিখে। যদিও এর অর্থ অনেক পাঠকই জানে না। তিনি বড় মানুষ, তাঁর বড় নাম। অবশ্য নামে ভারী হলে কি হবে; কামে তিনি ততটা নন। বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতা হিসেবে তিনি অত্যন্ত সম্মানিত ব্যক্তি। কিন্তু সম্মানের এই ভার বুঝে তিনি চলেননি। ৭৫ পরবর্তী সময়ে দেশে বিদেশে আইনপেশায় ব্যস্ত থাকা, দেশের সমস্যায় চুপচাপ বিদেশে পড়ে থাকা, আর বার বার নির্বাচনে যারতার কাছে হেরে যাওয়া ছাড়া বাংলাদেশের রাজনীতিতে তাঁর আর কোন ভূমিকা জনগণ কখনোই দেখেনি। বছরে দু একবার হাম্বিতাম্বি দেন বটে, কিন্তু পরদিনই পাড়ি দেন বিদেশে। আর ফেরেন না। ২৭ বছর আগে মিরপুরের হারুন মোল্লার সাথে নির্বাচনে হেরে আর নির্বাচনমুখী হননি। ওটাই ছিল তাঁর শেষ নির্বাচন।
এসব ভাবতে ভাবতে আমারও টানা দু’ঘন্টার জার্নি শেষ। জ্যাম পেরিয়ে অবশেষে মোহাম্মদপুরে এসে গেছি এবং সময় মতই জোহরের নামাজ শেষে লুৎফর রহমান ভাইয়ের জানাজায় শরীক হতে পেরেছি। বড় কষ্ট হচ্ছিল মনে। খুব একা একা লাগছিল। কাফন খুলে মুখটা দেখলাম। অবিকল সেই মুখ! সেই মায়া! বড় শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন। তাঁর এত কাছে আমি; অথচ আমায় একটি বারও দেখলেন না। হেসে দিয়ে বললেন না, তুমি আইছো!
তিনি চির নির্জীব হয়ে গেছেন। কোন দিন আর কিছু বলবেন না। লিখবেন না কোন কবিতা! মসজিদের পাশঘেষা কবরস্থানে চিরতরে তাঁকে শুইয়ে রেখে এসেছি সহধর্মিনীর কবরে, আরো অনেক কবরের মাঝে। রমজান শুরু হতে তখনও তিনদিন বাকী। রমজান মাস কবরবাসীর জন্য শান্তির মাস, শান্তিতে নিদ্রার মাস। দোয়া করি, শুধু এই রমজান নয়, মাহে রমজানের বরকতের উছিলায় আল্লাহ পাক তাঁকে চির নিদ্রায় চির শান্তিতে রাখুন অনন্ত অসীমকাল!!!!-লেখক: উপদেষ্টা সম্পাদক, যুগবার্তা